Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৩৮ অপরাহ্ণ

দুর্যোগ প্রশমনে লোকজ জ্ঞান

                                                                            দুর্যোগ প্রশমনে লোকজ জ্ঞান

১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’। এ বছরের প্রতিপাদ্য: ‘ঘর থেকেই শুরু করি, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়ি’। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো এবং বিশ্বজুড়ে জনসচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। প্রতি বছর এখানে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও খরা দেখা দেয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তন এর বড় কারণ। তবুও এ দেশের মানুষ হাল ছাড়েনি। তারা যুগের পর যুগ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে জীবন ও জীবিকা রক্ষা করে আসছে। তাই সময় এসেছে নিজের ঘর থেকে দুর্যোগ সহনশীলতার কাজটি শুরু করতে হবে। দুর্যোগের আগেই পরিবার ও এলাকাকে প্রস্তুত করতে হবে। এই প্রস্তুতির একটি বড় শক্তি হলো লোকজ জ্ঞান। আমাদের পূর্বপুরুষরা প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করে বহুবিধ কৌশল আয়ত্ত করেছে। সেই জ্ঞান আজও দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজে লাগে।

লোকজ জ্ঞান ও বিজ্ঞান: লোকজ জ্ঞান কোনো অন্ধবিশ্বাস নয়। এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জমা হওয়া অভিজ্ঞতা। মানুষ বছরের পর বছর আকাশ, নদী, সাগর ও পশুপাখিকে দেখে এই জ্ঞান তৈরি করেছে। আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এত সহজলভ্য ছিল না। তখন উপকূলের জেলে ও চরাঞ্চলের কৃষক প্রকৃতির ইশারা দেখে ঝড় বা বন্যার আগাম বার্তা পেত। এসব লোকজ অভিজ্ঞতায় লোকেমুখে জন্ম নিয়েছে খনার বচন ও লোককথা। যা পরবর্তীতে জ্ঞানের ভান্ডার হিসেবে যুগের পর যুগ টিকে আছে। পিঁপড়া ডিম মুখে নিয়ে উঁচুতে উঠলে অনেকে বোঝেন, ভারী বৃষ্টি আসতে পারে। পাখির অস্বাভাবিক ওড়াউড়ি দেখে ঝড়ের আশঙ্কা করা হয়। এসব পর্যবেক্ষণ গ্রামের মানুষকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। অনেক সময় এই সিদ্ধান্তই জীবন বাঁচায়।দুর্যোগ প্রশমনে লোকজ জ্ঞান: দুর্যোগ প্রশমন মানে হলো দুর্যোগের ক্ষতি কমানো। দুর্যোগ পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়। তবে আগে থেকে প্রস্তুতি নিলে ক্ষতি অনেক কমানো যায়। এই প্রস্তুতির জন্য ঘর, কৃষি, খাদ্য ও পরিবেশকে সুরক্ষিত করতে হয়। বন্যাপ্রবণ এলাকায় মানুষ ভিটেমাটি উঁচু করেন। তারা আগের বন্যার পানির উচ্চতা দেখে ঘরের ভিটে তৈরি করেন। ফলে সাধারণ বন্যায় ঘরে পানি ঢোকে না। ঘরবাড়ি, গোলাঘর ও গৃহপালিত পশু নিরাপদ থাকে। এটি পরিবারের সুরক্ষার প্রথম পদক্ষেপ। হাওর ও নিম্নাঞ্চলে ঘরের ভেতর মাচা বানানো হয়। কাঠ বা বাঁশ দিয়ে এই মাচা তৈরি করা হয়। পানি ঘরে ঢুকলেও চাল, বীজ, শুকনো খাবার ও জরুরি জিনিসপত্র ওপরে রাখা হয়। ফলে দুর্যোগের পরও পরিবার খাবারের সংকটে পড়ে না। উপকূলীয় এলাকায় চারচালা বা চারদিকে ঢালু ছাদের ঘর তৈরি করা হয়। এতে ঝড়ের বাতাস সরাসরি ঘরে আঘাত করতে পারে না। বাতাসের চাপ ছড়িয়ে যায়। ফলে ঘর ভাঙার ঝুঁকি কমে। এ ছাড়া কাদা, তুষ, বাঁশ ও গোলপাতা দিয়ে হালকা ঘর বানানো হয়। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কম খরচে দ্রুত ঘর আবার তৈরি করা যায়। ভাসমান কৃষি দুর্যোগ প্রশমনের আরেকটি চমৎকার উদাহরণ। কচুরিপানা ও জলজ উদ্ভিদ দিয়ে ভাসমান ক্ষেত তৈরি করা হয়। বন্যার পানি বাড়লে ক্ষেতও ভেসে ওঠে। ফলে বন্যার সময়ও সবজি ও খাবার পাওয়া যায়। এতে খাদ্যের সংকট কমে এবং পরিবার অনেকটা স্বনির্ভর থাকে। এভাবে লোকজ জ্ঞান শুধু ঘর রক্ষা করে না। এটি খাদ্য, জীবিকা ও পরিবারের নিরাপত্তাও রক্ষা করে। তাই দুর্যোগ প্রশমনে লোকজ জ্ঞানের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্যোগ প্রতিরোধে লোকজ জ্ঞান: দুর্যোগ প্রতিরোধ মানে হলো দুর্যোগ আসার আগেই ঝুঁকি কমানো। এর মূল লক্ষ্য হলো যাতে দুর্যোগ সরাসরি মানুষের জীবন ও সম্পদে আঘাত করতে না পারে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃতিকে কাজে লাগানো হয়। নদীভাঙন রোধে নদীর পাড়ে বাঁশঝাড়, ঢোলকলমি ও ছন লাগানো হয়। গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। ফলে স্রোতের আঘাতে মাটি সহজে ধসে পড়ে না। এতে নদীভাঙন কমে এবং ঘরবাড়ি ও ফসল রক্ষা পায়। উপকূলীয় এলাকায় কেওড়া, গোলপাতা ও হেঁতাল গাছ লাগানো হয়। এই গাছগুলো একসঙ্গে একটি সবুজ বেষ্টনী তৈরি করে। এই বেষ্টনী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের গতি কমায়। ফলে ঢেউয়ের আঘাত কমে এবং ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হ্রাস পায়। বাড়ির পাশে সুপারি, নারকেল বা তাল গাছ লাগানোর রেওয়াজ আছে। এসব লম্বা গাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমায়। ঝড়ের সময় ঘরকে কিছুটা আড়াল করে রাখে। এছাড়া এই গাছগুলো থেকে ফল, ছায়া ও কাঠও পাওয়া যায়। উপকূলের জেলেরা সাগরে যাওয়ার আগে জোয়ার-ভাটা ও চাঁদের তিথি দেখেন। তারা মরা কোটাল ও ভরা কোটালের সময় সাবধানে নৌকা চালান। তারা উজান-ভাটির টানও হিসাব করেন। এতে ঝড়ো সময়ে সাগরে যাওয়া এড়ানো যায়। ফলে নৌ দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে। নদীর মোহনায় বাঁশ ও ডালপালা দিয়ে বাঘার বা জাঁক তৈরি করা হয়। এটি মাছের প্রজননে সাহায্য করে। পাশাপাশি স্রোতের আঘাত কমিয়ে নদীভাঙন রোধ করে। এই পদ্ধতি জীবিকা ও পরিবেশ-দুটোই রক্ষা করে। সুতরাং দুর্যোগ প্রতিরোধে লোকজ জ্ঞান আমাদের প্রথম প্রতিরক্ষা। এটি কম খরচে ঝুঁকি কমায়। একই সঙ্গে পরিবেশকে সুস্থ ও টেকসই রাখে।

দুর্যোগ প্রশমনে ১০টি লোকজ জ্ঞান: ভিটেমাটি উঁচু করা: বন্যাপ্রবণ এলাকায় মানুষ ঘরের ভিটে উঁচু করেন। তারা আগের বন্যার পানির উচ্চতা দেখে ভিটে তৈরি করেন। ফলে সাধারণ বন্যায় ঘরে পানি ঢোকে না। এতে ঘরবাড়ি, গোলাঘর ও গৃহপালিত পশু নিরাপদ থাকে।

ঘরের ভেতর মাচা তৈরি করা: হাওর ও নিন্মাঞ্চলে কাঠ বা বাঁশ দিয়ে মাচা বানানো হয়। পানি ঘরে ঢুকলেও চাল, বীজ, শুকনো খাবার ও জরুরি জিনিসপত্র ওপরে রাখা হয়। এটি দুর্যোগের সময় পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

চারচালা বা ঢালু ছাদ: উপকূলীয় ঘরে চারদিকে ঢালু ছাদ দেওয়া হয়। এতে ঝড়ের বাতাস সরাসরি ঘরে আঘাত করতে পারে না। বাতাসের চাপ ছড়িয়ে যায়। ফলে ঘর ভাঙার ঝুঁকি কমে।

ভাসমান কৃষি বা ধাপ চাষ: কচুরিপানা ও জলজ উদ্ভিদ দিয়ে ভাসমান ক্ষেত তৈরি করা হয়। পানি বাড়লে ক্ষেতও ভেসে ওঠে। এতে বন্যার সময়ও সবজি ও খাবার পাওয়া যায়। এটি খরচ কম এবং পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি।

নদীর পাড়ে গাছ লাগানো: নদীর পাড়ে বাঁশঝাড়, ঢোলকলমি ও ছন লাগানো হয়। গাছের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে। ফলে স্রোতের আঘাতে মাটি সহজে ধসে পড়ে না। এতে নদীভাঙন কমে।

উপকূলে সবুজ বেষ্টনী: উপকূলে কেওড়া, গোলপাতা ও হেঁতাল গাছ লাগানো হয়। এই গাছগুলো ঝড়ের বাতাস ও জলোচ্ছ্বাসের গতি কমায়। ফলে ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি কমে। এটি প্রাকৃতিক একটি সুরক্ষা দেয়াল।

বাড়ির পাশে লম্বা গাছ লাগানো: সুপারি, নারকেল বা তাল গাছ লাগানোর রেওয়াজ আছে। এসব গাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমায়। ঝড়ের সময় ঘরকে কিছুটা আড়াল করে রাখে। এছাড়া এগুলো থেকে ফল, ছায়া ও কাঠও পাওয়া যায়।

জোয়ার-ভাটা ও তিথি দেখে সাগরে যাওয়া: জেলেরা চাঁদের তিথি, মরা কোটাল ও ভরা কোটাল দেখে সাগরে যান। তারা উজান-ভাটির টানও হিসাব করেন। এতে ঝড়ো সময়ে নৌকা নিয়ে সাগরে যাওয়া এড়ানো যায়। এতে নৌদুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে।

নদীর মোহনায় বাঘার বা জাঁক তৈরি: বাঁশ ও ডালপালা দিয়ে কৃত্রিম ঝোপ তৈরি করা হয়। এটি মাছের প্রজননে সাহায্য করে। পাশাপাশি স্রোতের আঘাত কমিয়ে নদীভাঙন রোধ করে। এটি জীবিকা ও পরিবেশ-দুটোই রক্ষা করে।

হালকা ও দ্রুত পুনর্নির্মাণযোগ্য ঘর: কাদা, তুষ, বাঁশ ও গোলপাতা দিয়ে ঘর বানানো হয়। এই ঘরগুলো হালকা হওয়ায় ঝড়ে প্রাণহানির ঝুঁকি কম। ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কম খরচে দ্রুত আবার তৈরি করা যায়। এটি দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান।

আধুনিক বিজ্ঞান ও লোকজ জ্ঞানের মেলবন্ধন: আধুনিক প্রযুক্তি খুব দরকারি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, সাইক্লোন শেল্টার ও বাঁধ মানুষের জীবন বাঁচায়। কিন্তু শুধু প্রযুক্তির ওপর ভরসা করলে হবে না। স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। তারা নিজের এলাকার পানি, মাটি, নদী ও ঝড় সম্পর্কে ভালো জানে। তাই বাঁধ, শেল্টার বা ঘর তৈরির সময় তাদের মতামত নেওয়া দরকার। আধুনিক বিজ্ঞান ও লোকজ জ্ঞান একসঙ্গে কাজ করলে দুর্যোগের ক্ষতি অনেক কমবে। এতে সমাধান হবে আরও বাস্তবসম্মত ও টেকসই।

চ্যালেঞ্জ ও করণীয়: জলবায়ু পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের ফলে অনেক লোকজ জ্ঞান হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম এসব জ্ঞান সম্পর্কে কম জানে। এই জ্ঞান রক্ষা করা এখন জরুরি। স্থানীয় কৌশলগুলো লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। জাতীয় দুর্যোগ নীতিতে লোকজ জ্ঞানের স্থান দিতে হবে। তরুণদের এই জ্ঞান শেখাতে হবে। তাহলে প্রতিটি পরিবার আগে থেকেই দুর্যোগের পরিকল্পনা করবে।

দুর্যোগ সহনশীলতা শুরু হয় আমাদের ঘর থেকে। লোকজ জ্ঞান আমাদের অমূল্য সম্পদ। ভিটে উঁচু করা, মাচা তৈরি, ভাসমান কৃষি, সবুজ বেষ্টনী ও জোয়ার-ভাটার হিসাব-এসব জ্ঞান আজও কার্যকর। এই জ্ঞানকে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে কাজে লাগাতে হবে। প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হবে। নিজের ঘর ও সম্প্রদায়কে প্রস্তুত করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি নিরাপদ ও দুর্যোগ-সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে পারব।

লেখক: শিক্ষক

মন্তব্য করুন

ব্লগ