সহকারী অধ্যাপক
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ণ
দাম্পত্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, ধৈর্য ও ইতিবাচক মনোভাব : সুস্থ পরিবার ও সুন্দর প্রজন্ম গঠনের ভিত্তি মোঃ মুজিবুর রহমান সহকারী অধ্যাপক
|
|
দাম্পত্যে পারস্পরিক বিশ্বাস, ধৈর্য ও ইতিবাচক মনোভাব : সুস্থ পরিবার ও সুন্দর প্রজন্ম গঠনের ভিত্তি
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
পরিবার মানুষের জীবনের প্রথম শিক্ষালয়, ভালোবাসার আশ্রয় এবং নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গঠনের প্রধান ক্ষেত্র। একটি শিশুর জীবনে বাবা-মা শুধু অভিভাবক নন; তাঁরা তার প্রথম আদর্শ, প্রথম শিক্ষক এবং নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। বাবা-মায়ের পারস্পরিক আচরণ, কথাবার্তা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ শিশুর চিন্তাভাবনা, ব্যক্তিত্ব এবং ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। তাই দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কেবল স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়; এটি সুস্থ প্রজন্ম গঠনেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
কিন্তু যখন দাম্পত্য জীবনে অবিশ্বাস, সন্দেহ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, বকাঝকা, অপমান, চিৎকার, মারামারি কিংবা প্রতিনিয়ত ঝগড়াবিবাদ দেখা দেয়, তখন সেই অশান্তি শুধু দুজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে সন্তানের কোমল হৃদয়ে, পরিবারের সামগ্রিক পরিবেশে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশে। যে ঘরে শিশুর হাসি ও স্বস্তির পরিবেশ থাকার কথা, সেখানে যদি ভয়, কান্না ও অনিশ্চয়তা বাসা বাঁধে, তবে সেই পরিবেশ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সংসারের শান্তি রক্ষায় স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল, ইতিবাচক ও সহনশীল হওয়া প্রয়োজন।
দাম্পত্যে বিশ্বাসের গুরুত্ব
দাম্পত্য জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস। বিশ্বাস ছাড়া ভালোবাসা দুর্বল হয়ে পড়ে, আর ভালোবাসার সঙ্গে শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ না থাকলে সংসারের বন্ধন ক্রমেই শিথিল হয়। স্বামী-স্ত্রী যখন একে অপরের কথা শোনেন, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন এবং যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা বোঝার চেষ্টা করেন, তখন ভুল বোঝাবুঝি দূর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে, প্রমাণ ছাড়াই সন্দেহ করা, প্রতিটি কথায় দোষ খোঁজা, পুরোনো ভুল বারবার সামনে আনা কিংবা সঙ্গীর প্রতিটি আচরণকে নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায়।
ইসলামও পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অমূলক সন্দেহ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, “তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে বেঁচে থাকো; নিশ্চয়ই কিছু ধারণা পাপ।” (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২)।
এই নির্দেশনা আমাদের শেখায়, যাচাই না করে কোনো বিষয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। কোনো কথা বা আচরণে কষ্ট পেলে উত্তেজিত হয়ে অভিযোগ না তুলে শান্তভাবে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশ্বাস অর্জনের জন্য নিজের আচরণেও স্বচ্ছতা, সততা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখতে হবে। বিশ্বাস একদিনে গড়ে ওঠে না; এটি গড়ে ওঠে সত্যবাদিতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, পারস্পরিক সম্মান এবং ধারাবাহিক দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে।
তবে বিশ্বাসের অর্থ অন্ধভাবে সবকিছু মেনে নেওয়া নয়। বাস্তব কোনো সমস্যা থাকলে তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে, প্রয়োজন হলে যুক্তিসংগত সীমারেখা নির্ধারণ করতে হবে এবং সমাধানের জন্য আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে।
দাম্পত্য কলহ ও শিশুর মানসিক বিকাশ
শিশুরা অনেক সময় বড়দের ধারণার চেয়েও বেশি সংবেদনশীল। তারা সব কথা বুঝতে না পারলেও বাবা-মায়ের কণ্ঠস্বর, মুখের অভিব্যক্তি, আচরণের পরিবর্তন এবং ঘরের অস্বস্তিকর পরিবেশ অনুভব করতে পারে। বাবা-মায়ের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঝগড়া, চিৎকার, অপমান কিংবা শারীরিক সংঘর্ষ দেখলে শিশুর মনে ভয়, দুশ্চিন্তা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিছু শিশুর মধ্যে ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, পড়াশোনায় অনীহা, অতিরিক্ত রাগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। কেউ আবার ভয়ে চুপচাপ হয়ে যায়, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না কিংবা মনে করে যে পরিবারের অশান্তির জন্য সে নিজেই দায়ী। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব অভিজ্ঞতা তার সম্পর্কের ধরন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সমস্যা সমাধানের অভ্যাসকেও প্রভাবিত করতে পারে।
অবশ্য প্রতিটি শিশুর প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না। পরিবারের দ্বন্দ্বের মাত্রা, স্থায়িত্ব, শিশুর বয়স, নিরাপদ পরিবেশের উপস্থিতি এবং বাবা-মায়ের পরবর্তী আচরণের ওপর এর প্রভাব নির্ভর করে। তবু এ কথা স্পষ্ট যে, শিশুকে নিয়মিত দাম্পত্য সংঘাতের মধ্যে রাখা তার মানসিক সুস্থতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই সন্তানের সামনে শুধু ঝগড়া না করাই যথেষ্ট নয়; তাকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে সে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সম্মান ও স্থিতিশীলতা অনুভব করতে পারে। বাবা-মায়ের মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন সন্তানের মনে আতঙ্ক ও অসহায়ত্ব তৈরি না করে, সে বিষয়ে উভয়কে সচেতন থাকতে হবে।
বকাঝকা, অপমান ও মারামারি কোনো সমাধান নয়
রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি; কিন্তু রাগের বশে অন্যকে অপমান করা, গালমন্দ করা, ভয় দেখানো কিংবা শারীরিক আঘাত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য আচরণ নয়। এসব আচরণ সমস্যার সমাধান করে না; বরং নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে। কথার আঘাত অনেক সময় দীর্ঘদিন মনে ক্ষত তৈরি করে, আর শারীরিক সহিংসতা পরিবারের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে বিপন্ন করে।
ইসলাম মানুষকে রাগ সংবরণ, ক্ষমাশীলতা এবং উত্তম আচরণের শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ বলেন, “যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রকৃত শক্তিশালী ব্যক্তির পরিচয় দিতে গিয়ে জানিয়েছেন, সে ব্যক্তি নয় যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।
এই শিক্ষা দাম্পত্য জীবনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাগের মুহূর্তে নিজেকে থামানো, কটু কথা না বলা এবং পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা স্থগিত রাখা দুর্বলতা নয়; বরং আত্মসংযম ও পরিপক্বতার পরিচয়।
তবে ধৈর্য ধারণের অর্থ নির্যাতন নীরবে সহ্য করা নয়। কোনো পক্ষ শারীরিক আঘাত, গুরুতর হুমকি বা অন্য কোনো নির্যাতনের শিকার হলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত ব্যক্তি, উপযুক্ত পেশাজীবী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে হবে। ইসলামে ধৈর্য ও ক্ষমার গুরুত্ব রয়েছে, কিন্তু জুলুমকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই।
তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ও বিচার-সালিশের সঠিক ব্যবহার
দাম্পত্য জীবনের সমস্যা কখনো কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন স্বামী-স্ত্রী নিজেরা আলোচনা করে সমাধানে আসতে পারেন না। তখন বিশ্বস্ত, বিচক্ষণ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ছোটখাটো মতপার্থক্য নিয়ে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিতজনদের জড়িয়ে ফেলা, এক পক্ষের কথা শুনে অন্য পক্ষকে দোষী সাব্যস্ত করা এবং ব্যক্তিগত বিষয়কে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্পর্কের সংকট আরও বাড়াতে পারে।
অনেক সময় তৃতীয় পক্ষের কেউ সমাধানের বদলে পক্ষপাত, উসকানি কিংবা অপমানজনক মন্তব্যের মাধ্যমে বিরোধকে তীব্র করে তোলেন। ফলে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয় এবং সন্তানও পরিবারের ভাঙন নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাই দাম্পত্য সমস্যার ক্ষেত্রে কাকে, কখন এবং কী উদ্দেশ্যে যুক্ত করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
তবে সব ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষকে এড়িয়ে চলাও সঠিক নয়। দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ, গুরুতর ভুল বোঝাবুঝি, আর্থিক জটিলতা কিংবা নিরাপত্তার সমস্যা দেখা দিলে নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হতে পারে।
পবিত্র কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা দেখা দিলে উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে একজন করে সালিস নিযুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে। (সূরা আন-নিসা, ৪:৩৫)।
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, দাম্পত্য সংকট সমাধানে ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সালিসের উদ্দেশ্য হতে হবে সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভব হলে সম্পর্কের সংশোধন; কোনো পক্ষকে অপমান করা, চাপ প্রয়োগ করা কিংবা অন্যায়ভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়।
বিশেষত, নির্যাতন বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে শুধু পারিবারিক সম্মান রক্ষার নামে বিষয়টি গোপন রাখা উচিত নয়। প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার।
ধৈর্য, সহনশীলতা ও ইতিবাচক মানসিকতা
সুন্দর দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে শুধু ভালোবাসার অনুভূতি দিয়ে নয়; বরং ভালোবাসাকে দায়িত্বশীল আচরণে প্রকাশ করার মাধ্যমে। সংসারে দুজন মানুষের চিন্তা, অভ্যাস, চাহিদা ও প্রত্যাশায় পার্থক্য থাকতেই পারে। প্রত্যেকেই ভুল করতে পারেন, আবার প্রত্যেকেরই নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ রয়েছে। তাই সঙ্গীর প্রতিটি ভুলকে অপরাধ হিসেবে দেখার পরিবর্তে সমস্যার কারণ বোঝা এবং সংশোধনের পথ খোঁজা প্রয়োজন।
ইতিবাচক মানসিকতা মানে সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং সমস্যাকে স্বীকার করে গঠনমূলক সমাধানের চেষ্টা করা। সঙ্গীর ভালো কাজের প্রশংসা করা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, ছোটখাটো ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে ‘তুমি সব সময় এমন করো’ কিংবা ‘তোমার দ্বারা কিছুই হবে না’—এ ধরনের আক্রমণাত্মক বক্তব্য পরিহার করা উচিত। এর পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘এই আচরণে আমি কষ্ট পেয়েছি; আমরা কি শান্তভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারি?’ এভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলে অপর পক্ষের আত্মসম্মানে আঘাত না দিয়ে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা সহজ হয়।
একই সঙ্গে উভয়কে মনে রাখতে হবে, সম্পর্কের উন্নতি এক পক্ষের দায়িত্ব নয়। একজন সব সময় ক্ষমা করবেন, আর অন্যজন বারবার আঘাত করবেন—এটি সুস্থ দাম্পত্যের আদর্শ নয়। পারস্পরিক পরিবর্তন, দায়িত্ব গ্রহণ এবং ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ—সবই সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মতবিরোধের সময় করণীয়
দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি মতপার্থক্যকে যুদ্ধ হিসেবে দেখলে সংসারে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বিরোধ দেখা দিলে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, রাগের সময় বিরতি নেওয়া: উত্তেজনা বেড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তর্ক চালিয়ে না গিয়ে কিছু সময়ের জন্য আলোচনা বন্ধ রাখা যেতে পারে। তবে বিরতি যেন শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নীরবতা চাপিয়ে দেওয়া না হয়; বরং শান্ত হয়ে আলোচনায় ফিরে আসার সম্মত পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা: নিজের বক্তব্য তুলে ধরার পাশাপাশি সঙ্গীর অনুভূতি ও যুক্তি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। সব বিষয়ে একমত হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু একে অপরকে সম্মান দিয়ে শোনা জরুরি।
তৃতীয়ত, অভিযোগের বদলে সমাধানে মনোযোগ দেওয়া: অতীতের সব ভুল একসঙ্গে সামনে না এনে বর্তমান সমস্যাটির বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হবে। কে জিতল আর কে হারল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সমস্যার সমাধান হলো কি না।
চতুর্থত, সংসারের বাস্তবতা বিবেচনা করা: অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সন্তান প্রতিপালন, কাজের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত ক্লান্তি অনেক সময় বিরোধের কারণ হতে পারে। তাই শুধু অভিযোগ না করে দায়িত্ব ভাগাভাগি, ব্যয়ের পরিকল্পনা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রয়োজন হলে সহায়তা নেওয়া: দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যা চলতে থাকলে নিরপেক্ষ পারিবারিক মধ্যস্থতাকারী, যোগ্য পরামর্শদাতা কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। উভয়ের নিরাপত্তা ও সম্মতি বিবেচনায় রেখে এ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।
সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের দায়িত্ব
সন্তানের সামনে বাবা-মায়ের আচরণ তার জন্য নীরব পাঠ্যপুস্তকের মতো। সে দেখে, মতবিরোধ হলে মানুষ কীভাবে কথা বলে, ভুল হলে কীভাবে ক্ষমা চায় এবং রাগের সময় কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাবা-মা যদি একে অপরকে সম্মান করেন, তাহলে সন্তানও সম্মানজনক আচরণ শিখতে পারে। আর যদি প্রতিনিয়ত অপমান, হুমকি ও সহিংসতা দেখে, তবে তার মনে সম্পর্ক সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
তাই সন্তানের সামনে একে অপরকে ছোট করা, তার মাধ্যমে সঙ্গীর কাছে বার্তা পাঠানো, তাকে পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করা কিংবা অন্য অভিভাবকের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। সন্তানকে বাবা-মায়ের বিরোধের বিচারক বানানো তার কোমল মনের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে।
কোনো ঝগড়া সন্তানের সামনে ঘটে গেলে পরে তার সঙ্গে বয়সোপযোগী ভাষায় কথা বলা প্রয়োজন। তাকে বোঝাতে হবে যে বড়দের মধ্যে মতপার্থক্য হতে পারে, কিন্তু তার জন্য সে দায়ী নয়। বাবা-মা দুজনেই তাকে ভালোবাসেন এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন—এ আশ্বাস দেওয়া জরুরি। অবশ্য এমন আশ্বাস তখনই দেওয়া উচিত, যখন তা বাস্তবে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সন্তানের সামনে ভুল আচরণ করে ফেললে বাবা-মায়ের উচিত নিজেদের ভুল স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এতে সন্তান শেখে, ভুল করা মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা হলেও ভুল সংশোধন করা দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
ইসলামের আলোকে দাম্পত্যের সৌন্দর্য
ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে শান্তি, ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, “আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আর-রূম, ৩০:২১)।
এ আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্য কেবল একসঙ্গে বসবাস করা নয়; বরং পরস্পরের জন্য প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার পরিবেশ তৈরি করা। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই একে অপরের অধিকার, মর্যাদা ও অনুভূতির প্রতি যত্নশীল হলে পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বাড়ে।
মহান আল্লাহ আরও বলেন, “আর তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১৯)।
এই নির্দেশনা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই নৈতিক শিক্ষা বহন করে। সুন্দর আচরণ, ন্যায়সংগত দায়িত্ব পালন, সম্মানজনক কথাবার্তা এবং কষ্টের সময় সহযোগিতা—এসবই দাম্পত্যের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। ধর্মীয় উপদেশের উদ্দেশ্য শুধু অন্যের ভুল ধরিয়ে দেওয়া নয়; বরং প্রত্যেকে নিজের আচরণ সংশোধন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।
এখানে আরও মনে রাখা জরুরি, ধৈর্য মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়, ক্ষমা মানে অপরাধকে বৈধ ঘোষণা করা নয় এবং সংসার রক্ষার অর্থ নিজের বা সন্তানের নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়া নয়। বরং ন্যায়, দায়িত্ববোধ, আত্মসংযম ও পারস্পরিক কল্যাণের মাধ্যমে একটি সুস্থ পরিবার গড়ে তোলাই ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সুন্দর প্রজন্ম গঠনে বাবা-মায়ের অঙ্গীকার
সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শুধু ভালো স্কুল, উন্নত পোশাক কিংবা আর্থিক সচ্ছলতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি পরিবার, যেখানে সে সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ ও ক্ষমাশীলতার বাস্তব উদাহরণ দেখতে পায়। বাবা-মা যদি নিজেদের বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে পারেন, তাহলে সন্তানও ভবিষ্যতে সমস্যা মোকাবিলার ইতিবাচক কৌশল শিখতে পারে।
এ জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত প্রতিদিন কিছু সময় একে অপরের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলা, সন্তানের প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা করা, সংসারের দায়িত্ব ন্যায্যভাবে ভাগ করে নেওয়া এবং ভুল বোঝাবুঝি জমতে না দেওয়া। প্রয়োজন হলে উভয়ে মিলে কিছু পারিবারিক নীতি নির্ধারণ করতে পারেন—যেমন গালমন্দ নয়, শারীরিক আঘাত নয়, সন্তানের সামনে অপমান নয় এবং উত্তেজনার সময় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
একটি শান্তিপূর্ণ পরিবার গড়ে ওঠে ছোট ছোট ভালো অভ্যাসের সমন্বয়ে। দিনের শেষে সঙ্গীর পরিশ্রমের স্বীকৃতি দেওয়া, কষ্টের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া এবং একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা সম্পর্ককে গভীর করে। এই অভ্যাসগুলো সন্তানের মনে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার ভিত্তি তৈরি করে।
তবে সব দায়িত্ব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও উচিত অযথা উসকানি না দেওয়া, পক্ষপাতমূলক মন্তব্য থেকে বিরত থাকা এবং প্রয়োজনের সময় ন্যায়সংগত সহযোগিতা করা। সমাজের দায়িত্ব হলো সুস্থ পরিবার গঠনে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা, ব্যক্তিগত বিরোধকে বিনোদন বা অপপ্রচারের বিষয় না বানানো এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানো।
উপসংহার
দাম্পত্য জীবন শুধু দুজন মানুষের সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের শান্তি, সন্তানের মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মূল্যবোধ। তাই পারস্পরিক অবিশ্বাস, অপমান, বকাঝকা, ঝগড়াবিবাদ ও শারীরিক সংঘর্ষকে কখনোই তুচ্ছ বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এসব আচরণ সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল করে এবং শিশুর মনে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, বিশ্বাস, ধৈর্য, সহনশীলতা, ইতিবাচক মনোভাব, দায়িত্ববোধ ও ন্যায়সংগত আচরণ একটি পরিবারকে শান্তি ও নিরাপত্তার আশ্রয়ে পরিণত করতে পারে। স্বামী-স্ত্রী উভয়কে বুঝতে হবে, সংসারে জয়ী হওয়া মানে সঙ্গীকে পরাজিত করা নয়; বরং সমস্যাকে পরাজিত করে পারস্পরিক মর্যাদা ও ভালোবাসা রক্ষা করা। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতা ও পেশাগত সহায়তা নেওয়াও পরিণত দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
আজকের বাবা-মায়ের আচরণ আগামী দিনের সন্তানের সম্পর্কবোধ ও জীবনদৃষ্টিকে প্রভাবিত করে। তাই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ঘরে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু অপমান থাকবে না; ভুল হবে, কিন্তু সংশোধনের সুযোগ থাকবে; রাগ আসবে, কিন্তু সংযম হারিয়ে যাবে না; আর সমস্যা দেখা দেবে, কিন্তু সমাধানের পথ বন্ধ হবে না।
মনে রাখতে হবে, সন্তানকে শান্তির শিক্ষা দিতে হলে বাবা-মাকে আগে শান্তিপূর্ণ আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। ভালোবাসা, ন্যায়, ধৈর্য ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পরিবারই পারে সুস্থ, মানবিক, আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম উপহার দিতে।
হে মহান আল্লাহ, আমাদের পরিবারগুলোকে পারস্পরিক ভালোবাসা, বিশ্বাস, ধৈর্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে তোলার তাওফিক দিন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি দূর করুন, সন্তানদের মানসিক নিরাপত্তা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ দান করুন এবং আমাদের ঘরগুলোকে শান্তি, রহমত ও কল্যাণের আশ্রয় করে দিন। আমিন।
১৮
২৯ মন্তব্য