Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:৪৪ অপরাহ্ণ

Rag Day_ র‍্যাগ ডে আদ্যোপান্ত। মোশারফ হোসাইন, হাড়গিলা উচ্চ বিদ্যালয়, ইসলামপুর, জামালপুর।

#Rag_Day


Rag Day বলতে সাধারণত শিক্ষাজীবনের একটি পর্যায় শেষ হওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের আয়োজিত আনন্দ, স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিদায়-উদ্যাপনের দিনকে বোঝানো হয়।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি:

• Rag Day: বিদায়, স্মৃতিচারণ ও আনন্দ-উদ্যাপনের অনুষ্ঠান।

• Ragging: সাধারণত জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের দ্বারা নবীন বা কনিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের ভয় দেখানো, অপমান করা, জোর করে কিছু করানো কিংবা শারীরিক-মানসিকভাবে হয়রানি

দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তার: ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে Ragging শব্দটি পরিচিতি লাভ করে। তবে Rag Day-এর বর্তমান বিদায়-উদ্যাপনমূলক রূপের ইতিহাসকে Ragging-এর ইতিহাসের সঙ্গে সম্পূর্ণ এক করে দেখা ঠিক নয়। 

বর্তমান রূপ: অনেক প্রতিষ্ঠানে Rag Day বলতে রঙিন পোশাক, ব্যাচভিত্তিক টি-শার্ট, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি, স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বিদায় অনুষ্ঠানের সমন্বয় বোঝানো হয়।

Rag Day-এর ইতিবাচক উদ্দেশ্যগুলো সাধারণত নিম্নরূপ:


1. বিদায় ও স্মৃতিচারণ: শিক্ষাজীবনের আনন্দময় মুহূর্তগুলো স্মরণ করা।

2. বন্ধুত্ব সুদৃঢ় করা: সহপাঠীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।

3. মানসিক প্রশান্তি: দীর্ঘদিনের পড়াশোনা ও পরীক্ষার চাপের পর কিছুটা আনন্দের সুযোগ সৃষ্টি করা।

4. প্রতিভা বিকাশ: গান, আবৃত্তি, অভিনয়, বক্তব্য, সৃজনশীল উপস্থাপনা ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতিভা প্রকাশ করা।

5. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো।

6. নতুন জীবনের প্রস্তুতি: শিক্ষাজীবনের একটি পর্যায় শেষে কর্মজীবন বা পরবর্তী শিক্ষাস্তরে প্রবেশের প্রেরণা লাভ করা।

তবে এসব উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য Rag Day-ই একমাত্র উপায় নয়। একটি সুশৃঙ্খল বিদায় অনুষ্ঠান, স্মৃতিচারণ সভা কিংবা শিক্ষার্থীদের সম্মাননা অনুষ্ঠানেও একই উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব।


Rag Day-এর অসুবিধা ও নেতিবাচক দিক

অসুবিধা কীভাবে সমস্যা তৈরি হয়

অতিরিক্ত ব্যয় দামি পোশাক, টি-শার্ট, সাজসজ্জা, ফটোগ্রাফি ও অনুষ্ঠানস্থলের খরচে পরিবার চাপে পড়ে।

আর্থিক বৈষম্য যারা টাকা দিতে পারে না, তারা সহপাঠীদের কাছে বিব্রত বা উপেক্ষিত বোধ করতে পারে।

পড়াশোনায় ব্যাঘাত অতিরিক্ত প্রস্তুতি, মহড়া ও অনুষ্ঠান আয়োজনের কারণে পড়াশোনার সময় নষ্ট হতে পারে।

সামাজিক প্রতিযোগিতা কে বেশি জমকালো অনুষ্ঠান করবে, তা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে।

অনলাইন প্রদর্শনপ্রবণতা ছবি, ভিডিও, পোশাক ও আয়োজনের মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা বাড়তে পারে।

নিরাপত্তার ঝুঁকি অসতর্ক মিছিল, যানবাহন চলাচলে বাধা, আতশবাজি কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

মানসিক চাপ অংশগ্রহণে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীর ওপর বন্ধুদের চাপ, চাঁদা বা নির্দিষ্ট পোশাকের বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে।

এসব অসুবিধা Rag Day-এর অনিবার্য ফল নয়; বরং আয়োজনের ধরন, ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক চাপের ওপর নির্ভরশীল।

বিদায় অনুষ্ঠান, বন্ধুত্বের স্মৃতি সংরক্ষণ, শিক্ষককে সম্মান জানানো কিংবা সাংস্কৃতিক পরিবেশনা নিজে থেকেই অপসংস্কৃতি নয়। কিন্তু কোনো কোনো আয়োজন যখন দায়িত্বশীলতার সীমা অতিক্রম করে, তখন তা নেতিবাচক সংস্কৃতির রূপ নিতে পারে

যেসব আচরণ অপসংস্কৃতির রূপ নিতে পারে

• অশালীন নাচ-গান বা আপত্তিকর পরিবেশনা

• জোরপূর্বক চাঁদা আদায় ও ব্যয়বহুল আয়োজন

• মাদক, মদ বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার

• অশ্লীলতা, যৌন হয়রানি বা অসম্মানজনক আচরণ

• রাস্তা অবরোধ, বিপজ্জনক মিছিল বা জনদুর্ভোগ

• Ragging-এর নামে অপমান, ভয় দেখানো ও নির্যাতন

অপসংস্কৃতিতে রূপ নেওয়ার প্রধান কারণ

1. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শন ও জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রবণতা।

2. অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় আয়োজন করার প্রতিযোগিতা।

3. পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব।

4. সহপাঠীদের চাপ এবং ‘সবাই করছে, আমাকেও করতে হবে’—এমন মানসিকতা।

5. আনন্দ ও স্বাধীনতার অর্থ সম্পর্কে অপরিণত ধারণা।

6. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নৈতিক শিক্ষা ও অনুষ্ঠান পরিচালনার সুস্পষ্ট নীতিমালার অভাব।

কোরআনের আলোকে Rag Day মূল্যায়ন

1. অপচয় পরিহার

সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ৩১

আরবি: وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ

অর্থ: “তোমরা অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।”

শিক্ষা: শুধু লোকদেখানো বা প্রতিযোগিতার জন্য অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করা ইসলামের অপচয়বিরোধী শিক্ষার পরিপন্থী। 

2. উপহাস ও অপমান নিষিদ্ধ

সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১১

আরবি: لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ

অর্থ: “কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে।”

শিক্ষা: Ragging-এর নামে কাউকে হেয় করা, অপমানজনক নামে ডাকা, পোশাক বা আর্থিক অবস্থা নিয়ে বিদ্রূপ করা কোরআনের নির্দেশনার বিরোধী।

3. অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন পরিহার

শিক্ষা: কাউকে ভয় দেখানো, জোর করে অংশগ্রহণ করানো, শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা এবং অন্যের অধিকার নষ্ট করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। অনুষ্ঠান আনন্দের হলেও তা অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে না।

গান-বাজনা, পর্দা, নারী-পুরুষের মেলামেশা এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার কিছু বিষয়ে আলেমদের ব্যাখ্যা এক নয়। তাই প্রতিটি সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের বিষয়ে এক বাক্যে সর্বসম্মত ফতোয়া দেওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট কাজটি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো। তবে যৌন হয়রানি, জবরদস্তি, অপমান ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এই মতভেদ কোনো ছাড় দেয় না।

মন্তব্য করুন