সহকারী শিক্ষক
১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৩৬ অপরাহ্ণ
লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ কবে ও পূজার নিয়ম | Lakshmi Puja 2026
📌 লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ কবে ও পূজার নিয়ম
লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ কবে ও পূজার নিয়ম | Lakshmi Puja 2026
দুর্গাপূজার রেশ কাটতে না কাটতেই বাঙালি ঘরে ঘরে আবার উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়। শরতের পূর্ণিমার রাতে ঘরে ঘরে ডাক পড়ে ধনসম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীর। এই পোস্টে জেনে নিন লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ কবে, পূজার সঠিক সময়, তিথি, পূজার নিয়ম, কী কী উপাচার লাগে, নৈবেদ্য ও প্রসাদের তালিকা, আলপনা ও লক্ষ্মী পাঁচালি সম্পর্কে সবকিছু।
লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ এক নজরে
বিষয় | তথ্য |
পূজা | কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ |
তারিখ | ২৫ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার |
তিথি | আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা (কোজাগরী পূর্ণিমা / শরৎ পূর্ণিমা) |
মূল পূজা | পূর্ণিমার রাতে, নিশীথ সময়ে |
ছুটি | ২৫ অক্টোবর স্কুল-কলেজে ছুটি (পূজার ছুটির তালিকায়) |
লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ কবে
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ পড়েছে ২৫ অক্টোবর, রবিবার। এই দিন আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথি। বিজয়া দশমীর (২১ অক্টোবর) চার দিন পরেই এই পূজা হয়, তাই দুর্গাপূজার পরের বড় আয়োজন বলা হয় একে।
অনেক ক্যালেন্ডারে লক্ষ্মী পূজা ২৬ অক্টোবর লেখা দেখে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। এর কারণ হলো পূর্ণিমা তিথি ২৫ অক্টোবর দুপুরে শুরু হয়ে ২৬ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত থাকে। কিন্তু পূজা হয় পূর্ণিমার রাতে, অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর রাতেই। তাই বাংলাদেশে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা পালিত হবে ২৫ অক্টোবর রবিবার রাতে। নিজের বাড়ির পঞ্জিকা মিলিয়ে নিলে সবচেয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
লক্ষ্মী পূজার সময় ও তিথি ২০২৬
কলকাতা পঞ্জিকা অনুযায়ী পূর্ণিমা তিথি ২৫ অক্টোবর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে শুরু হয়ে ২৬ অক্টোবর সকাল ৯টা ৪১ মিনিটে শেষ হবে। নিশীথ পূজার শুভ সময় ধরা হয় ২৫ অক্টোবর রাত ১০টা ৫৬ মিনিট থেকে ১১টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত। বাংলাদেশের সময় ভারতের সময়ের চেয়ে প্রায় ৩০ মিনিট এগিয়ে, তাই স্থানীয় পঞ্জিকায় সময় কয়েক মিনিট এদিক-ওদিক হতে পারে। পঞ্জিকাভেদে নিশীথ সময়ের হিসাবে সামান্য পার্থক্য থাকে, তাই পূজার আগে নিজের পঞ্জিকা দেখে নেওয়াই ভালো।
কোজাগরী নামের অর্থ কী
কোজাগরী নামটি এসেছে সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’ থেকে, যার অর্থ ‘কে জেগে আছে’। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং ঘরে ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কে জেগে আছে। যে ঘরে আলো জ্বলে, মানুষ জেগে থাকে, সেই ঘরেই বাসা বাঁধে সমৃদ্ধি। এজন্যই এই রাতে জেগে থেকে লক্ষ্মীর আরাধনা করার রীতি। এই পূজাকে কোজাগরী পূর্ণিমা, শরৎ পূর্ণিমা বা কৌমুদী পূজাও বলা হয়।
লক্ষ্মী পূজার নিয়ম
লক্ষ্মী পূজা ঘরের পূজা। মণ্ডপে নয়, নিজের বাড়িতেই এই পূজা হয়। পূজার নিয়ম ধাপে ধাপে জেনে নিন।
পূজার আগের প্রস্তুতি
সকাল থেকে ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। দরজা থেকে পূজার ঘর পর্যন্ত আলপনা এঁকে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ তোলা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই পায়ের ছাপ ধরে দেবী ঘরে প্রবেশ করেন। পূজার জায়গা গঙ্গাজল বা পরিষ্কার জল ছিটিয়ে শুদ্ধ করে নেওয়া হয়।
ঘট স্থাপন ও পূজা
সন্ধ্যার পর লক্ষ্মীর ঘট সাজানো হয়। ঘটে ধান, আতপ চাল, নারকেল, সিঁদুর, ধূপ ও প্রদীপ দেওয়া হয়। ঘটের পাশে ধানের ছড়া, কড়ি, পান-সুপারি সাজিয়ে রাখা হয় অনেক বাড়িতে। তারপর ফুল, চন্দন, ধূপ, প্রদীপ দিয়ে দেবীর পূজা করা হয়।
লক্ষ্মী পাঁচালি পাঠ
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজায় দেবীর ব্রতকথা বা লক্ষ্মী পাঁচালি পাঠ করা অন্যতম প্রধান রীতি। পাঁচালিতে লক্ষ্মী ব্রতের মাহাত্ম্য ও দেবীর কৃপায় সুখ ফিরে আসার কাহিনি বলা হয়েছে। বাড়ির সবাই মিলে এক মনে পাঁচালি শোনেন।
জাগরণ
পূজার রাতে জেগে থাকার রীতি আছে। রাতভর চলে জাগরণ, পরিবারের সবাই মিলে দেবীর গুণগান করেন। এই জাগরণ থেকেই ‘কোজাগরী’ নামের সার্থকতা।
লক্ষ্মী পূজার মন্ত্র
লক্ষ্মী পূজায় সাধারণত এই মন্ত্রগুলো জপ করা হয়। লক্ষ্মী গায়ত্রী মন্ত্র: ওঁ মহালক্ষ্ম্যৈ চ বিদ্মহে বিষ্ণুপত্ন্যৈ চ ধীমহি। তন্নো লক্ষ্মীঃ প্রচোদয়াৎ। বীজ মন্ত্র: ওঁ শ্রীং হ্রীং ক্রীং শ্রীমহালক্ষ্ম্যৈ নমঃ। প্রণাম মন্ত্র: ওঁ মহালক্ষ্ম্যৈ নমো নমঃ। ১১, ২১ বা ১০৮ বার জপ করার রীতি আছে।
লক্ষ্মী পূজায় কী কী লাগে
পূজার উপাচারের তালিকা বাড়িভেদে কিছুটা আলাদা হতে পারে। সাধারণভাবে যা যা লাগে:
লক্ষ্মীর ঘট, ধান, আতপ চাল, নারকেল
সিঁদুর, চন্দন, ফুল, বেলপাতা, দুর্বা
ধূপ, প্রদীপ, কর্পূর
পান, সুপারি, কড়ি
আলপনার জন্য চালের গুঁড়ো
নৈবেদ্যের জন্য ফল, মিষ্টি, খই, মুড়ি, নারকেলের নাড়ু
লক্ষ্মী পূজার নৈবেদ্য ও প্রসাদ
লক্ষ্মী পূজার প্রসাদে থাকে খই, মুড়ি, চিড়ের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, মোয়া, বাতাসা ও নানা রকম ফল। দুধ জ্বালিয়ে ক্ষীর বানানোর রীতি অনেক বাড়িতে আছে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এই পূজার নৈবেদ্যে লবণ, হলুদ ও তেঁতুল দেওয়া হয় না। পূজা শেষে সবাই মিলে প্রসাদ গ্রহণ করেন।
লক্ষ্মীর আলপনা
লক্ষ্মী পূজার আলপনা এই পূজার সবচেয়ে সুন্দর অংশ। চালের গুঁড়ো গুলে সাদা আলপনা আঁকা হয়। দরজা থেকে পূজার স্থান পর্যন্ত লক্ষ্মীর দুটি পায়ের ছাপ আঁকা হয়, যেন দেবী সেই পথ ধরে ঘরে আসেন। পদ্ম, শঙ্খ, মাছ ও ধানের শিষের মোটিফ আলপনায় দেখা যায়। আলপনা আঁকা অনেক পরিবারে মেয়েদের হাতের শিল্প হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে আসছে।
লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ ছুটি
সরকারি ছুটির তালিকা অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর লক্ষ্মী পূজা উপলক্ষে স্কুলে ছুটি রয়েছে। দুর্গাপূজা, বিজয়া দশমী, প্রবারণা পূর্ণিমা ও লক্ষ্মী পূজা মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে টানা ছুটি চলছে। কলেজ পর্যায়ে দুর্গাপূজা থেকে লক্ষ্মী পূজাসহ দীর্ঘ ছুটি নির্ধারিত রয়েছে, তবে নির্দিষ্ট কলেজের ক্ষেত্রে নিজ প্রতিষ্ঠানের নোটিশ অনুসরণ করতে হবে।
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা বনাম দীপাবলির লক্ষ্মী পূজা
অনেকেই এই দুই পূজাকে এক ভাবেন, কিন্তু এগুলো আলাদা। কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা হয় আশ্বিন মাসের পূর্ণিমায়, মূলত বাঙালি বাড়িতে। আর দীপাবলির লক্ষ্মী পূজা হয় কার্তিক মাসের অমাবস্যায়, ভারতের অনেক অঞ্চলে সেটাই প্রধান লক্ষ্মী পূজা। দুই পূজার তিথি, রীতি ও আঞ্চলিক গুরুত্ব আলাদা।
লক্ষ্মী পূজা নিয়ে কিছু কথা
দেবী লক্ষ্মী ধনসম্পদ, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির দেবী। লোকবিশ্বাসে তিনি বিষ্ণুর স্ত্রী এবং দুর্গার কন্যা। তাঁর বাহন পেঁচা। লক্ষ্মী শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘লক্ষ্য’ থেকে, যার অর্থ লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য। পূজার মূল বার্তা হলো পরিশ্রম, পরিচ্ছন্নতা ও সততার মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধি আসে। ঘর পরিষ্কার রাখা, আলপনা আঁকা, রাতে জেগে থাকা — সবকিছুর মধ্যেই এই বার্তা লুকিয়ে আছে।
লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ নিয়ে প্রশ্নোত্তর
লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ কবে?
লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ পড়েছে ২৫ অক্টোবর, রবিবার। আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা পালিত হবে।
লক্ষ্মী পূজা ২৫ অক্টোবর না ২৬ অক্টোবর?
পূজা ২৫ অক্টোবর রাতে। পূর্ণিমা তিথি ২৬ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত থাকলেও পূজা হয় পূর্ণিমার রাতে, অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর। কিছু ক্যালেন্ডারে তিথির শেষ দিন হিসেবে ২৬ অক্টোবর লেখা থাকে, এতে বিভ্রান্ত হবেন না।
লক্ষ্মী পূজার শুভ সময় কখন?
নিশীথ সময়, অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর রাত ১০টা ৫৬ মিনিট থেকে ১১টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত পূজার সবচেয়ে শুভ সময় ধরা হয়। পঞ্জিকাভেদে সময় কিছুটা আলাদা হতে পারে।
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজায় কী কী দেওয়া হয় না?
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী এই পূজার নৈবেদ্যে লবণ, হলুদ ও তেঁতুল দেওয়া হয় না।
লক্ষ্মী পূজার প্রসাদে কী থাকে?
খই, মুড়ি, চিড়ের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, মোয়া, বাতাসা, ফল ও ক্ষীর থাকে প্রসাদে।
লক্ষ্মী পূজায় আলপনা কেন আঁকা হয়?
আলপনা দিয়ে দরজা থেকে পূজার ঘর পর্যন্ত লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ তোলা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই পায়ের ছাপ ধরে দেবী ঘরে প্রবেশ করেন।
লক্ষ্মী পূজা ২০২৬ কি সরকারি ছুটির দিন?
২৫ অক্টোবর লক্ষ্মী পূজা উপলক্ষে স্কুলে ছুটি রয়েছে। এটি পূজার ছুটির তালিকার অংশ।
কোজাগরী মানে কী?
কোজাগরী এসেছে ‘কো জাগর্তি’ থেকে, যার অর্থ ‘কে জেগে আছে’। এই রাতে জেগে থেকে লক্ষ্মীর আরাধনা করার রীতি থেকেই নামটি এসেছে।
লক্ষ্মী পূজায় তুলসী পাতা দেওয়া হয় না কেন?
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, শালগ্রাম রূপে বিষ্ণুর সঙ্গে তুলসীর বিবাহ হয়েছিল, তাই তুলসীকে লক্ষ্মীর সতীন ধরা হয়। এই বিশ্বাস থেকেই লক্ষ্মী পূজায় তুলসী পাতা দেওয়ার রীতি নেই। তবে বিষ্ণু পূজায় তুলসী অত্যন্ত প্রিয়।
গত বছর লক্ষ্মী পূজা কবে ছিল?
গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে লক্ষ্মী পূজা ছিল ৬ অক্টোবর।
দীপাবলির লক্ষ্মী পূজা আর কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা কি এক?
না, দুটি আলাদা পূজা। কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা আশ্বিন পূর্ণিমায়, দীপাবলির লক্ষ্মী পূজা কার্তিক অমাবস্যায় হয়।
শেষ কথা
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা বাঙালির ঘরের পূজা। মণ্ডপের জাঁকজমক নয়, ঘরের আলপনা, প্রদীপের আলো, পাঁচালির সুর আর প্রসাদের গন্ধেই এই পূজার আসল সৌন্দর্য। ২৫ অক্টোবর রাতে ঘর পরিষ্কার করে, আলপনা এঁকে, জেগে থেকে দেবীর আরাধনা করুন। সবাইকে লক্ষ্মী পূজার শুভেচ্ছা।
৭২
১০৯ মন্তব্য