Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

ছয় দিনের প্রশিক্ষণ, আজীবনের অনুপ্রেরণা

ছয় দিনের প্রশিক্ষণ, আজীবনের অনুপ্রেরণা

৬৫তম সেটেলাইট শিক্ষক প্রশিক্ষণ: পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন ও আত্মোপলব্ধির এক স্মরণীয় অধ্যায়

স্থান: রামু, কক্সবাজার
আয়োজনে: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), ঢাকা

শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি মানুষ গড়ার শিল্প, ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব এবং একটি জাতির বিবেক জাগ্রত রাখার মহান অঙ্গীকার। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার উদ্দেশ্য, শিক্ষণপদ্ধতি ও শিক্ষার্থীদের চাহিদায়ও পরিবর্তন আসছে। তাই একজন শিক্ষককে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান ধারণ করলেই চলে না; তাঁকে হতে হয় দক্ষ, মানবিক, নৈতিক, সৃজনশীল ও সময়োপযোগী। এই উপলব্ধিকে আরও গভীর করেছে ৬৫তম সেটেলাইট শিক্ষক প্রশিক্ষণ—পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের ছয় দিনের শিক্ষণীয় আয়োজন।

রামু, কক্সবাজারে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), ঢাকার আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই প্রশিক্ষণ আমার কাছে কেবল কিছু নতুন বিষয় শেখার আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল না; বরং নিজের শিক্ষকতাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা, পেশাগত সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা এবং একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে ওঠার পথে নিজেকে আরও প্রস্তুত করার সুযোগ।

একুশ শতকের শিক্ষক: জ্ঞানের বাহক নয়, সম্ভাবনার নির্মাতা

একুশ শতকের শিক্ষকের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। এখন শিক্ষক শুধু তথ্য প্রদান করবেন না; তিনি শিক্ষার্থীকে তথ্য অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ, যুক্তিনির্ভর চিন্তা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা ও সহযোগিতার দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবেন। শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, নতুন কিছু আবিষ্কারের আগ্রহ এবং নিজের সিদ্ধান্তের দায় গ্রহণের মানসিকতা গড়ে তুলবেন।

এই প্রশিক্ষণ আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য কতটুকু পড়ানো হলো, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার্থীর মধ্যে কতটুকু শেখার আগ্রহ, আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করা গেল, সেটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যে শিক্ষক শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎ উন্মুক্ত করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত অর্থে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেন।

শিক্ষার্থীকে উদ্বুদ্ধ করা: শাসনের চেয়ে প্রেরণার শক্তি বেশি

প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা, আগ্রহ, পারিবারিক পরিবেশ, শেখার গতি ও আত্মবিশ্বাস এক রকম নয়। কেউ দ্রুত শেখে, কেউ সময় নেয়; কেউ সহজেই নিজের প্রতিভা প্রকাশ করতে পারে, আবার কেউ সামান্য উৎসাহের অভাবে নিজের সামর্থ্য আড়াল করে রাখে। একজন দক্ষ শিক্ষকের দায়িত্ব হলো এই বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা।

শিক্ষার্থীকে মোটিভেট করার অর্থ শুধু প্রশংসা করা নয়; বরং তার চেষ্টা ও অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দেওয়া, ব্যর্থতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখতে শেখানো এবং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে ভয় নয়, আগ্রহ নিয়ে শিখতে পারে। শিক্ষার্থীর মনে যখন এই বিশ্বাস জন্মায় যে, ‘আমি চেষ্টা করলে পারব’, তখন তার শেখার জগতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যায়।

ইতিবাচক শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক: শিক্ষার নীরব শক্তি

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা, সহমর্মিতা ও ন্যায়সংগত আচরণ। ভয় দেখিয়ে সাময়িক নীরবতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, কিন্তু হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও শেখার আগ্রহ সৃষ্টি করা যায় না কেবল শাসনের মাধ্যমে।

একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তার সমস্যাকে গুরুত্ব দেন, ভুল সংশোধনের সুযোগ দেন এবং সবার সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করেন, তখন শ্রেণিকক্ষ হয়ে ওঠে নিরাপদ ও আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষার্থী তখন শিক্ষককে শুধু পাঠদাতা হিসেবে নয়, বরং একজন নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখতে শেখে।

নৈতিক মূল্যবোধ: শিক্ষার আত্মা

শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন নয়; একজন সৎ, দায়িত্বশীল, সহনশীল ও বিবেকবান মানুষ তৈরি করাও শিক্ষার মৌলিক লক্ষ্য। সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার শিক্ষা শিক্ষার্থীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের নিজের জীবনই সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষণ-উপকরণ। শিক্ষক যদি সততার কথা বলেন, অথচ নিজের আচরণে তার প্রতিফলন না থাকে, তবে সেই শিক্ষা শিক্ষার্থীর হৃদয়ে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে না। তাই নৈতিকতা শেখানোর প্রথম শর্ত হলো নিজে নৈতিকতার চর্চা করা।

পাঠপরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা

প্রশিক্ষণে পাঠপরিকল্পনা, মূল্যায়ন এবং শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কার্যকর পাঠপরিকল্পনা শিক্ষককে পাঠের উদ্দেশ্য নির্ধারণ, উপযুক্ত শিক্ষণপদ্ধতি নির্বাচন, সময়ের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জনে সহায়তা করে।

অন্যদিকে, মূল্যায়ন শুধু শিক্ষার্থীর নম্বর নির্ধারণের উপায় নয়; এটি তার শেখার অগ্রগতি, দুর্বলতা ও সহায়তার প্রয়োজন চিহ্নিত করার একটি কার্যকর মাধ্যম। যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষক বুঝতে পারেন, কোন বিষয়টি শিক্ষার্থীরা আয়ত্ত করেছে এবং কোথায় নতুন করে ব্যাখ্যা বা অনুশীলন প্রয়োজন।

শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলা ও মানবিকতার সমন্বয় জরুরি। একটি ভালো শ্রেণিকক্ষ মানে শুধু নীরব শিক্ষার্থী নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, ভুল থেকে শিখতে পারে এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে।

কারিকুলাম, সিলেবাস ও শিক্ষণ-উপকরণের কার্যকর ব্যবহার

কারিকুলাম ও সিলেবাসের উদ্দেশ্য, পরিধি এবং পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা একজন শিক্ষককে পাঠদানের বৃহত্তর লক্ষ্য বুঝতে সাহায্য করে। সিলেবাসের নির্ধারিত বিষয়বস্তু শেষ করাই শিক্ষকের একমাত্র দায়িত্ব নয়; বরং নির্ধারিত শিখনফল অর্জনের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি প্রয়োগ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে শিক্ষণ-উপকরণের সঠিক ব্যবহার পাঠকে সহজবোধ্য, আকর্ষণীয় ও বাস্তবমুখী করে তোলে। ছবি, চার্ট, মডেল, বাস্তব উপকরণ কিংবা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর উপস্থাপনা শিক্ষার্থীর মনোযোগ ধরে রাখতে এবং জটিল বিষয় সহজে বুঝতে সহায়তা করতে পারে। তবে উপকরণের বাহুল্য নয়, পাঠের উদ্দেশ্যের সঙ্গে তার যথাযথ সামঞ্জস্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আদর্শ প্রশ্নপত্র: মুখস্থবিদ্যার বাইরে যোগ্যতা যাচাই

একটি আদর্শ প্রশ্নপত্রের কাজ কেবল শিক্ষার্থীর স্মৃতিশক্তি যাচাই করা নয়; বরং তার অনুধাবন, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, যুক্তিবোধ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা মূল্যায়ন করা। প্রশ্ন হতে হবে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, স্পষ্ট, নির্ভুল, ন্যায়সংগত এবং নির্ধারিত শিখনফলভিত্তিক।

প্রশ্নপত্র প্রণয়নে যথাযথ ভারসাম্য, উপযুক্ত কাঠিন্য, সুস্পষ্ট নির্দেশনা এবং নম্বর বণ্টনের যৌক্তিকতা অপরিহার্য। কারণ, মূল্যায়নব্যবস্থা যদি শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতা যথাযথভাবে তুলে ধরতে না পারে, তবে তার ফলাফলও শিক্ষার প্রকৃত অর্জনকে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হবে।

প্রশিক্ষণের বাস্তব অভিজ্ঞতা: অংশগ্রহণ, অনুশীলন ও আত্মোপলব্ধি

ছয় দিনের এই প্রশিক্ষণ আমার কাছে ছিল শেখা, অনুশীলন, আত্মমূল্যায়ন ও নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কারের এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু যেমন ছিল সময়োপযোগী, তেমনি প্রশিক্ষণ পরিচালনার কৌশলও ছিল অত্যন্ত শিক্ষণীয়। এখানে কেবল প্রশিক্ষকের বক্তব্য শোনা কিংবা নোট নেওয়ার মধ্যে আমাদের অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং প্রতিটি পাঠের বিষয়বস্তু অনুধাবন করা, অর্জিত জ্ঞান যাচাই করা এবং বাস্তব প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

আমার কাছে বিশেষভাবে ভালো লেগেছে প্রশিক্ষকগণের চাপমুক্ত, আন্তরিক ও অংশগ্রহণবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার কৌশলটি। তাঁরা আমাদের ওপর কোনো ধরনের মৌখিক চাপ সৃষ্টি করেননি, অযথা ভীতি তৈরি করেননি কিংবা শেখার ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেননি। অথচ প্রতিটি পাঠ শেষে বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন কৌশলের প্রয়োগ আমাদের মনোযোগ ধরে রেখেছে এবং সক্রিয় অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছে। অর্থাৎ, চাপ সৃষ্টি না করেও যে অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগী, দায়িত্বশীল ও কর্মতৎপর রাখা যায়, প্রশিক্ষণটি ছিল তার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা।

প্রতিটি পাঠ শেষে মূল্যায়নের বিষয়টি আমাদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এর মাধ্যমে শুধু পাঠের বিষয়বস্তু কতটুকু মনে রাখতে পেরেছি, তা নয়; বরং বিষয়টি কতটা বুঝেছি, শেখা ধারণা প্রয়োগ করতে পারছি কি না এবং কোথায় আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে—এসব বিষয় নিয়েও ভাবার সুযোগ হয়েছে। ফলে মূল্যায়ন আমাদের কাছে নিছক আনুষ্ঠানিকতা বা ভীতির কারণ হয়ে ওঠেনি; বরং তা শেখার অগ্রগতি যাচাই ও নিজেকে সমৃদ্ধ করার একটি কার্যকর প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

এই অভিজ্ঞতা শিক্ষক হিসেবে আমার চিন্তাভাবনাকে নতুনভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আমরা অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের মনোযোগী রাখতে অতিরিক্ত নির্দেশনা, বারবার সতর্ক করা কিংবা শৃঙ্খলার ওপর বেশি গুরুত্ব দিই। কিন্তু এই প্রশিক্ষণ আমাকে উপলব্ধি করিয়েছে, শিক্ষার্থীদের সক্রিয় রাখার জন্য কেবল নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন শিক্ষণপরিবেশ, যেখানে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবে, নিজের শেখার অগ্রগতি বুঝতে পারবে এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ পাবে। যথাযথ পরিকল্পনা, কার্যকর পাঠদান ও ধারাবাহিক মূল্যায়নের সমন্বয় শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে।

পাঠপরিকল্পনা বিষয়ে অর্জিত ধারণা আমাকে পাঠদানের আগে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নির্ধারণ এবং শিখনফল অর্জনের উপযোগী কার্যক্রম সাজানোর গুরুত্ব নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। শিক্ষার্থীকে উদ্বুদ্ধ করা ও ইতিবাচক শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের আলোচনা মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি সম্মানজনক আচরণ এবং তার সামর্থ্যের ওপর আস্থা রাখা কতটা জরুরি। একইভাবে শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষণ-উপকরণের ব্যবহার, কারিকুলাম ও সিলেবাস এবং আদর্শ প্রশ্নপত্র প্রণয়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো পাঠদানকে আরও পরিকল্পিত, বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ছয় দিনের এই অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি, কার্যকর প্রশিক্ষণের সার্থকতা শুধু কতগুলো বিষয় শেখানো হলো, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অংশগ্রহণকারীদের শেখার প্রক্রিয়ায় কতটা সম্পৃক্ত করা গেল, নিজেদের দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ কতটা তৈরি হলো এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগের অনুপ্রেরণা কতটা জাগ্রত হলো, তার ওপরও নির্ভর করে। এই প্রশিক্ষণ আমাকে সেই উপলব্ধির কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

আমি চাই, প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতাগুলো আমার শ্রেণিকক্ষেও প্রতিফলিত হোক। শিক্ষার্থীদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি না করে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, পাঠশেষে উপযুক্ত মূল্যায়নের মাধ্যমে শেখার অগ্রগতি যাচাই করা, ভুলকে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখা এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করাই হবে আমার ভবিষ্যৎ চর্চার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তাই শুধু নতুন কিছু জানা নয়; বরং শেখানোর পদ্ধতি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখা।

প্রশিক্ষকগণ: কথার চেয়ে চরিত্র ও কর্মের শিক্ষা বড়

এই ছয় দিনের প্রশিক্ষণের সবচেয়ে স্মরণীয় প্রাপ্তিগুলোর একটি ছিল প্রশিক্ষকগণের ব্যক্তিত্ব, আচরণ, পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশিক্ষণ পরিচালনার কৌশল। তাঁদের প্রত্যেককে আমার কাছে একেকজন মূর্ত আদর্শ বলে মনে হয়েছে। তাঁরা শুধু বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেননি; নিজেদের আচরণ ও মূল্যবোধের মধ্য দিয়েও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

পেশাগত নৈতিকতার প্রশ্নে তাঁদের আপসহীনতা, দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি কোমল ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। তাঁদের মধ্যে আমি এমন এক সমন্বয় প্রত্যক্ষ করেছি, যেখানে দৃঢ়তা কঠোরতায় পর্যবসিত হয়নি, শৃঙ্খলা মানবিকতাকে আড়াল করেনি এবং পেশাগত উৎকর্ষ মানুষকে বিনয়ী হতে বাধা দেয়নি।

প্রশিক্ষকগণের বিশেষত্ব ছিল—তাঁরা শুধু মুখে অংশগ্রহণমূলক শিক্ষণপদ্ধতির কথা বলেননি; প্রশিক্ষণ পরিচালনার মধ্য দিয়েও তার কার্যকারিতা তুলে ধরেছেন। আমাদের ওপর মৌখিক চাপ সৃষ্টি না করে প্রতিটি পাঠ শেষে বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে সক্রিয় রাখার যে কৌশল তাঁরা প্রয়োগ করেছেন, তা তাঁদের পেশাগত দক্ষতারই পরিচায়ক। তাঁদের এই পদ্ধতি থেকে উপলব্ধি করেছি, যথাযথ পরিকল্পনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে ভয়ভীতির পরিবর্তে আগ্রহ, দায়িত্ববোধ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

একজন প্রশিক্ষক যখন নিজের আচরণ ও কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তুকে জীবন্ত করে তোলেন, তখন তাঁর শিক্ষা শ্রেণিকক্ষের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অংশগ্রহণকারীর চিন্তা, অনুভব ও পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গির অংশ হয়ে ওঠে। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া এই নীরব শিক্ষাটুকু আমার কাছে প্রশিক্ষণের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের মতোই মূল্যবান।

ছয় দিনের শিক্ষা, আগামীর অঙ্গীকার

ছয় দিনের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে, কিন্তু শেখার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। বরং এই প্রশিক্ষণ নিজের শিক্ষকতাকে আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তা শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতায় প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।

আমি বিশ্বাস করি, একজন শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন কোনো এককালীন প্রশিক্ষণের বিষয় নয়; এটি নিরবচ্ছিন্ন আত্মশুদ্ধি, অধ্যয়ন, অনুশীলন, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নিজের ভুল থেকে শেখার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তাই এই প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত ধারণাগুলোকে পাঠপরিকল্পনা, শিক্ষার্থী মূল্যায়ন, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর চেষ্টা করাই হবে আমার প্রধান অঙ্গীকার।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা কেবল উন্নত কারিকুলাম, আধুনিক উপকরণ কিংবা আকর্ষণীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে ওঠে না; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, নৈতিক নেতৃত্ব, মানবিক পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীর সম্ভাবনার প্রতি আন্তরিক বিশ্বাস।

প্রশিক্ষণ আমাদের জ্ঞান দিতে পারে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে, অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে; কিন্তু সেই জ্ঞানকে জীবন্ত শিক্ষায় রূপ দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষকের নিজের।

৬৫তম সেটেলাইট শিক্ষক প্রশিক্ষণের ছয়টি দিন তাই আমার কাছে কেবল একটি প্রশিক্ষণসূচির সমাপ্তি নয়; বরং আরও দক্ষ, আরও মানবিক এবং আরও দায়িত্বশীল শিক্ষক হয়ে ওঠার পথে এক নতুন যাত্রার সূচনা।

কৃতজ্ঞতা জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), ঢাকা এবং প্রশিক্ষণসংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি—যাঁদের উদ্যোগ, শ্রম ও প্রজ্ঞা এই ছয় দিনকে আমার পেশাগত জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।

ছয় দিনের প্রশিক্ষণ হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু এর শিক্ষা, অনুপ্রেরণা ও দায়বদ্ধতা বহমান থাকবে শ্রেণিকক্ষের প্রতিটি পাঠে, শিক্ষার্থীর প্রতিটি অগ্রগতিতে এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত আরও ভালো শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিটি প্রচেষ্টায়।

— মুফিদুল আলম
রামু, কক্সবাজার

মন্তব্য করুন

ব্লগ