সিনিয়র শিক্ষক
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০২ অপরাহ্ণ
পদের আগে প্রস্তুতি: নেতৃত্বের পরীক্ষা শুরু হয় আচরণে অভিজ্ঞতার আয়নায়
পদের আগে প্রস্তুতি: নেতৃত্বের পরীক্ষা শুরু হয় আচরণে
অভিজ্ঞতার আয়নায়
প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার সুবাদে বিভিন্ন অঞ্চলের এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে। গত সাত মাস হোয়াটসঅ্যাপের কয়েকটি গ্রুপে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা, প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময় করেছি। এই লেখা সেই সীমিত পরিসরের পর্যবেক্ষণ, সমগ্র শিক্ষকসমাজের মূল্যায়ন নয়।
অনেক শিক্ষকের মধ্যে দেখেছি জ্ঞানানুরাগ, অনুসন্ধিৎসা, যুক্তিনিষ্ঠা ও বিনয়। তাঁরা আমাকে আশাবাদী করেছেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে মতের অমিল হলে যুক্তির জবাবে এসেছে ব্যক্তিগত মন্তব্য, বিদ্রূপ কিংবা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা। সেটি আমাকে ভাবিয়েছে।
তাই একটি প্রশ্ন বারবার মনে এসেছে: শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে আমরা যতটা সোচ্চার, সেই সংকটের ছায়া নিজেদের আচরণে আছে কি না, তা যাচাই করতে ততটাই আগ্রহী কি? প্রশ্নটি কাউকে অভিযুক্ত করার জন্য নয়। যাঁরা ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে চান, নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে ভাবার উপলক্ষ হিসেবেই এটি তোলা। কারণ অন্যের ভুল ধরার ক্ষমতা আর নিজের ভুল ধরার মানসিকতা এক জিনিস নয়। প্রথমটি বুদ্ধিমত্তার পরিচয়, দ্বিতীয়টি পরিণত মননের।
মেধা কি নেতৃত্বের নিশ্চয়তা?
পদোন্নতির আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগানোর সুযোগ হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্যতা আর প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যোগ্যতা অভিন্ন নয়। পরীক্ষা জ্ঞান ও প্রস্তুতি মাপে। নেতৃত্বের বাস্তব ক্ষেত্রে লাগে ন্যায়বোধ, সহনশীলতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি এবং নিজের সীমাবদ্ধতা বোঝার ক্ষমতা।
একজন প্রধান শিক্ষককে ভিন্ন ভিন্ন মত ও ব্যক্তিত্বের সহকর্মীদের নিয়ে চলতে হয়, বিরোধ মেটাতে হয়, নিজের সিদ্ধান্তের সমালোচনাও শুনতে হয়। যিনি বিরোধিতা সহ্য করতে পারেন না, তিনি সহকর্মীদের ভিন্নমতকে কতটা গুরুত্ব দেবেন? যিনি যুক্তির জবাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেন, বিরোধ নিষ্পত্তিতে তিনি কতটা নিরপেক্ষ থাকবেন? যিনি ভুল স্বীকারে অনিচ্ছুক, তিনি জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়বেন কীভাবে?
এসব প্রশ্ন দিয়ে কাউকে আগাম অযোগ্য ঘোষণা করা যায় না। তবে নেতৃত্বের প্রস্তুতি যাচাইয়ের মানদণ্ড হিসেবে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। পদ আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব দেয়, আস্থা অর্জন করতে হয় আচরণ ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
মতপার্থক্য: জ্ঞানচর্চা, নাকি ব্যক্তিগত বিরোধ?
শিক্ষকদের মতবিনিময়ের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞান অর্জন, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি এবং যুক্তির মাধ্যমে ধারণাকে সমৃদ্ধ করা। কারও বক্তব্যে দ্বিমত করা মানে তাঁকে অসম্মান করা নয়। যুক্তিসংগত বিরোধিতাও জ্ঞানচর্চার অংশ।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন মতপার্থক্য ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অন্যকে হেয় করার উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। তখন আলোচনার লক্ষ্য সত্য অনুসন্ধান থেকে সরে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। কেউ হয়তো সাময়িকভাবে আলোচনায় প্রাধান্য পান, কিন্তু অন্যরা প্রশ্ন করতে সংকোচ করেন, ভিন্নমত প্রকাশের সাহস হারান। মুক্ত আলোচনার পরিবেশ সংকুচিত হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর প্রভাব আরও গভীর। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না, তাঁর আচরণও শিক্ষার্থীর কাছে অনানুষ্ঠানিক পাঠ। শিক্ষক ভিন্নমতকে অসম্মান করলে শিক্ষার্থী মতপার্থক্যকে শত্রুতা ভাবতে শেখে। শিক্ষক ভুল আড়াল করলে শিক্ষার্থীও ভুল গোপন করতে শেখে। আবার যে শিক্ষক ধৈর্য ধরে অন্যের কথা শোনেন, যুক্তির ভিত্তিতে নিজের অবস্থান বদলান এবং মতভেদেও অন্যের মর্যাদা রক্ষা করেন, তিনি শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষা দেন।
শিক্ষকের দায় ও কাঠামোর সীমাবদ্ধতা
শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের দায় শুধু শিক্ষকের নয়। অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, উপকরণের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পেশাগত অনিশ্চয়তা কাজের মানকে প্রভাবিত করে। সব ব্যর্থতা ব্যক্তি-শিক্ষকের ওপর চাপানো ন্যায়সংগত নয়।
তবু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষকের নিজস্ব দায় অস্বীকার করা যায় না, কারণ তিনি নতুন প্রজন্মের বিবেক ও মূল্যবোধ গড়ার অন্যতম কারিগর। যে প্রতিষ্ঠানে প্রশ্ন করাকে অবাধ্যতা, সমালোচনাকে শত্রুতা আর কর্তৃত্বকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে ধরা হয়, সেখানে সুস্থ নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না। যেখানে যুক্তি, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা গুরুত্ব পায়, সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী দুজনেরই বিকাশ ঘটে।
কাঠামোগত প্রস্তাব
ব্যক্তিগত আত্মোপলব্ধির পাশাপাশি ব্যবস্থাগত উদ্যোগও দরকার। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার সঙ্গে সিদ্ধান্তগ্রহণ, বিরোধ নিষ্পত্তি ও নৈতিক দ্বিধা নিয়ে পরিস্থিতিভিত্তিক মূল্যায়ন যুক্ত করা যায়। নিয়োগের পর নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠান-ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং প্রধান শিক্ষকের কাজের নিয়মিত ও স্বচ্ছ মূল্যায়নও ভাবা যায়। এতে মেধার পাশাপাশি আচরণ ও নেতৃত্বগুণও বিবেচনায় আসবে।
পদোন্নতির আগে আত্মোন্নয়ন
পদমর্যাদা বাড়া আর ব্যক্তিত্বের উৎকর্ষ এক বিষয় নয়। প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্জন করা যায়, কিন্তু সেই ক্ষমতা ন্যায়সংগতভাবে প্রয়োগের মানসিকতা গড়ে ওঠে চর্চা, অভিজ্ঞতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণে। প্রকৃত নেতা সহকর্মীদের কথা শোনেন, তাঁদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ দেন, সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ভাবেন না। শৃঙ্খলার নামে অপমান বা পক্ষপাতকে প্রশ্রয় দেন না।
নেতৃত্বের অর্থ সবার সঙ্গে একমত হওয়া নয়, মতভিন্নতার মধ্যেও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেওয়া। সব সিদ্ধান্ত সবাইকে সন্তুষ্ট করবে না, কিন্তু সিদ্ধান্তের যুক্তি ও প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা যায়।
যাঁরা নেতৃত্বের দায়িত্ব চান, নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা তাঁদের জন্য জরুরি:
আমি কি নিজের মত বলার পাশাপাশি অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনি?
আমার যুক্তি ভুল প্রমাণিত হলে তা মেনে নিতে ও শুধরে নিতে প্রস্তুত কি?
ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায্য সিদ্ধান্ত নিতে পারব কি?
ক্ষমতা পেলে সহকর্মীর মর্যাদা রক্ষা করব, নাকি কর্তৃত্ব দেখাব?
সমালোচনাকে অপমান না ভেবে উন্নতির সুযোগ হিসেবে নিতে পারব কি?
মৌখিক পরীক্ষায় এসব প্রশ্নের সুন্দর উত্তর দেওয়া কঠিন নয়। কিন্তু প্রকৃত উত্তর মেলে দৈনন্দিন আচরণে, মতবিরোধের মুহূর্তে, ক্ষমতা প্রয়োগে এবং নিজের ভুলের মুখোমুখি হওয়ার সময়।
আমরা কেউ নিখুঁত নই। নেতৃত্বে সীমাবদ্ধতাহীন মানুষ লাগে না, লাগে এমন মানুষ, যিনি নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন, ভুল থেকে শেখেন এবং শোধরানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।
আমরা কী দেব?
আমরা যাঁরা প্রধান শিক্ষক বা সহকারী প্রধান শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশা রাখি, তাঁদের হাতে থাকবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব, সহকর্মীদের কর্মপরিবেশ প্রভাবিত করার ক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ। এটি শুধু পদবি, সুবিধা বা সামাজিক মর্যাদার বিষয় নয়, মানুষের সঙ্গে কাজ করা ও ন্যায়সংগত পরিবেশ গড়ার দায়িত্ব।
আমরা কি শুধু সনদধারী শিক্ষার্থী তৈরি করব, নাকি বিবেকবান ও দায়িত্বশীল মানুষ গড়তেও ভূমিকা রাখব? আমরা কি শুধু প্রশাসনিকভাবে চলা বিদ্যালয় চাই, নাকি এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে যুক্তি, ন্যায় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চা হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়োগ পরীক্ষার ফল দিয়ে মিলবে না, মিলবে আমাদের কাজ, আচরণ ও সিদ্ধান্তে। আমরা কেমন নেতা হব, তার আভাস পদ পাওয়ার আগেই পাওয়া যায়, মানুষের সঙ্গে আমাদের বর্তমান ব্যবহারে। তাই পদোন্নতির অপেক্ষার এই সময় শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির নয়, নিজেকে আরও সহনশীল, ন্যায়পরায়ণ ও যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলারও সময়।
প্রকৃত নেতৃত্বের সূচনা পদ অর্জনের পর নয়, পদ অর্জনের আগেই, আত্মোপলব্ধি ও আত্মোন্নয়নের মধ্য দিয়ে।
— মুফিদুল আলম
রামু, কক্সবাজার।
১
২ মন্তব্য