Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:০৪ পূর্বাহ্ণ

জীবনের শেষ প্রান্তে: হে আল্লাহ, তোমার রহমত ও ক্ষমায় আমাকে বরণ করে নিয়ো

জীবনের শেষ প্রান্তে: হে আল্লাহ, তোমার রহমত ও ক্ষমায় আমাকে বরণ করে নিয়ো

মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

পৃথিবীর এই রঙিন জীবন, মায়াময় প্রকৃতি, প্রিয়জনের স্নেহ, ভালোবাসার বন্ধন আর হাজারো স্বপ্নের ভিড়ে মানুষ কখনো কখনো ভুলে যায় জীবনের সবচেয়ে অবধারিত সত্যটি—একদিন তাকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। যে পৃথিবীর আলো-বাতাসে তার বেড়ে ওঠা, যে ঘরকে সে আপন ঠিকানা মনে করে, যে মানুষগুলোর ভালোবাসায় তার হৃদয় পরিপূর্ণ থাকে, একদিন সবকিছু পেছনে ফেলে তাকে পাড়ি জমাতে হবে অনন্ত পরকালের পথে। এ বিদায় সাময়িক বিচ্ছেদ নয়; এটি এমন এক যাত্রার সূচনা, যার পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারিত হবে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচার, হিসাব-নিকাশ এবং তাঁর অসীম রহমতের অধীনে।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫)। এই একটি আয়াতই মানুষের জীবনের অহংকার, আত্মগর্ব ও পার্থিব মোহকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। ধনসম্পদ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচিতি—কোনোটিই মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না। একদিন জীবনের ব্যস্ততা থেমে যাবে, পরিচিত পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে, আর নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে কেবল আমল ও তার পরিণতির দায়িত্ব।

তখন হৃদয়ের গভীর থেকে হয়তো একটি আকুল প্রার্থনাই বেরিয়ে আসবে—হে আমার প্রতিপালক! জীবনের শেষ মুহূর্তে আমাকে ঈমানের ওপর অবিচল রেখো। আমার অন্তরকে তোমার স্মরণে সজীব রেখো। আমার জানা-অজানা ভুলগুলো ক্ষমা করো, আমার ত্রুটিগুলো সংশোধনের তাওফিক দাও এবং তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের পথে আমার জীবনকে পরিচালিত করো। যখন আমার পৃথিবীর পথচলা শেষ হয়ে আসবে, তখন তোমার রহমত থেকে আমাকে নিরাশ হতে দিয়ো না।

হে আল্লাহ! আমি জানি, আমি নিখুঁত নই। আমার জীবনে রয়েছে অসংখ্য সীমাবদ্ধতা, কথায় ও কাজে রয়েছে অনিচ্ছাকৃত ভুল, দায়িত্ব পালনে রয়েছে অপূর্ণতা। কখনো হয়তো কারও মনে কষ্ট দিয়েছি, কখনো নিজের অধিকার বুঝতে গিয়ে অন্যের অধিকারের কথা ভুলে গেছি, কখনো দুর্বলতার কাছে পরাজিত হয়েছি, আবার কখনো নিজের অজান্তেই তোমার সন্তুষ্টির পরিপন্থী কোনো কাজে জড়িয়ে পড়েছি। তুমি আমার প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু জানো। আমার অন্তরের অনুতাপ, চোখের অশ্রু এবং সংশোধিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও তোমার অজানা নয়।

হে পরম করুণাময়! আমার ভুলগুলোকে অস্বীকার করার শক্তি নয়, বরং ভুল স্বীকার করে ফিরে আসার সাহস দাও। মানুষের হক নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার, কারও প্রতি অন্যায় করে থাকলে ক্ষমা চাওয়ার এবং নিজের জীবনকে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করার তাওফিক দাও। আমার তওবা কবুল করো, গুনাহ থেকে বাঁচার শক্তি দাও এবং জীবনের অবশিষ্ট সময়টুকু তোমার সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করার সুযোগ দাও।

কারণ, তোমার রহমতের প্রত্যাশা মানে দায়িত্বহীন হয়ে থাকা নয়; তোমার ক্ষমার আশা মানে অন্যায়ের পথে অবিচল থাকা নয়। বরং তোমার প্রতি ভালোবাসা, তোমার শাস্তির ভয় এবং তোমার ক্ষমার প্রত্যাশা একজন মুমিনকে আত্মশুদ্ধি, সৎকর্ম ও ন্যায়পরায়ণতার পথে এগিয়ে নেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫৩)। এই বাণী অনুতপ্ত হৃদয়ে আশার আলো জ্বালায় এবং মানুষকে তাঁর প্রতিপালকের দিকে ফিরে আসতে উৎসাহিত করে।

জীবনের শেষ মুহূর্তটি কেমন হবে, তা আমরা কেউ জানি না। কখন কার ডাক এসে যাবে, কোন সময়ে পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হবে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি মানে শুধু মৃত্যুর কথা ভাবা নয়; বরং জীবনের প্রতিটি দিনকে অর্থবহ করে তোলা। নামাজে যত্নবান হওয়া, সত্য কথা বলা, হালাল উপার্জন করা, পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করা, পরিবারকে ভালোবাসা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকা—এসবই পরকালের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আমরা অনেক সময় মানুষের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হই। কে আমাকে ভালোবাসল, কে আমাকে অবহেলা করল, কে আমার ত্যাগের মূল্য দিল, আর কে আমার আন্তরিকতাকে ভুল বুঝল—এসব ভাবতে ভাবতে হৃদয় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অথচ মানুষের মূল্যায়ন সব সময় ন্যায়সংগত হয় না, মানুষের স্মৃতিও চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু মহান আল্লাহর কাছে কোনো সৎকর্মই অগোচরে থাকে না। মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়া নীরব ত্যাগ, গোপনে করা দান, নিঃশব্দে ঝরা অশ্রু কিংবা অনুতাপে ভেজা হৃদয়ের আর্তি—সবই তাঁর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত।

তাই হে আমার রব! মানুষের কাছে নিজের মূল্য প্রমাণ করতে গিয়ে যেন তোমার সন্তুষ্টির পথ হারিয়ে না ফেলি। মানুষের অবহেলায় যেন হতাশ না হই, প্রশংসায় যেন অহংকারী না হয়ে উঠি এবং কষ্ট পেয়ে যেন অন্যের প্রতি অন্যায় না করি। আমাকে এমন হৃদয় দাও, যে হৃদয় ক্ষমা করতে শেখে; এমন বিবেক দাও, যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে; এমন চরিত্র দাও, যা মানুষের কল্যাণে নিবেদিত থাকে। আমার জীবনকে এমন সুন্দর করে দাও, যাতে আমার চলে যাওয়ার পরও মানুষের হৃদয়ে আমার কোনো সৎকর্মের স্মৃতি বেঁচে থাকে।

হে আল্লাহ! যেদিন আমার জীবনের শেষ সূর্য অস্তমিত হবে, যেদিন আমার পরিচিত পৃথিবী থেকে বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসবে, সেদিন আমার অন্তরকে ঈমানের আলোয় স্থির রেখো। মৃত্যুর কঠিন মুহূর্তে আমাকে অবিচল থাকার তাওফিক দাও। আমার জীবনের শেষ কথা যেন হয় তোমার একত্বের সাক্ষ্য, আমার অন্তর যেন থাকে তোমার প্রতি বিশ্বাসে পরিপূর্ণ এবং আমার শেষ পরিণতি যেন হয় তোমার সন্তুষ্টি লাভের উপযোগী।

আমি জানি, আমার জন্য কোনো বিশেষ পরিণতি নিশ্চিত করে বলার অধিকার আমার নেই। আমি জানি না, আমার আমল কতটুকু গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিংবা আমার ভুলের হিসাব কত দীর্ঘ। তবু আমি তোমার রহমতের আশায় বেঁচে থাকি, তোমার ক্ষমার প্রত্যাশায় অনুতপ্ত হই এবং তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেকে সংশোধন করতে চাই। আমার আশা তোমার প্রতি, আমার প্রার্থনা তোমার কাছে, আমার প্রত্যাবর্তনও তোমারই দিকে।

হে দয়াময় আল্লাহ! যখন আমার পৃথিবীর পথচলা শেষ হবে, তখন আমার পরিবার, প্রিয়জন ও পরিচিত মানুষেরা হয়তো আমার জন্য অশ্রু ঝরাবে। কেউ আমার স্মৃতি মনে করবে, কেউ আমার ভালোবাসার কথা বলবে, আবার সময়ের প্রবাহে একদিন অনেক কিছুই স্মৃতির আড়ালে চলে যাবে। কিন্তু আমি চাই, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হোক তোমার সন্তুষ্টি অর্জন। মানুষের প্রশংসা নয়, তোমার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়াই হোক আমার জীবনের প্রধান আকাঙ্ক্ষা। আমার মৃত্যুর পর আমার জন্য ক্ষমা ও রহমত কামনা করার মতো সৎকর্ম, সুন্দর চরিত্র এবং কল্যাণকর উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার তাওফিক দাও।

হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করি এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাই। আমার হিসাব সহজ করো, আমার অপরাধ ক্ষমা করো, আমার নেক আমল কবুল করো এবং আমার অন্তরকে অহংকার, হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যায়ের অন্ধকার থেকে পবিত্র করো। জীবনের প্রতিটি শ্বাসকে সৎকর্মের সুযোগে পরিণত করো। মৃত্যুর আগে আন্তরিক তওবা, মৃত্যুর সময় ঈমানের দৃঢ়তা এবং মৃত্যুর পরে তোমার রহমত লাভের সৌভাগ্য দান করো।

হে মহান আল্লাহ! একদিন আমাকে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে—এ সত্যকে আমার জীবনের প্রতিটি কাজে স্মরণ রাখার তাওফিক দাও। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঈমানের ওপর অবিচল রেখো, আমার গুনাহ ক্ষমা করো, মানুষের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার সুযোগ দাও এবং তোমার অসীম রহমতে আমাকে জান্নাতের অধিবাসী করো। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

 

মন্তব্য করুন