Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ

মহাবিশ্ব কি অসীম নাকি সসীম? নাকি আমরা কসমিক গোলকধাঁধায় বাস করছি?

মহাবিশ্ব কি অসীম নাকি সসীম? নাকি আমরা কসমিক গোলকধাঁধায় বাস করছি? 


রাতের আকাশের দিকে তাকালে অসংখ্য তারকারাজি দেখে আমাদের মনে একটি প্রশ্ন জাগে - এই মহাবিশ্ব কি আসলেই অসীম? এর আকারই বা কেমন?  আধুনিক কসমোলজি ও ​মহাকাশ গবেষণার ডাটা থেকে জানা যায় যে, আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব জ্যামিতিকভাবে সমতল। এতদিন সাধারণভাবে মনে করা হতো কোনো স্থান সমতল হলে তা বুঝি অসীম হতে বাধ্য। কিন্তু গণিতের শাখা টপোলজি আমাদের দেখায় যে, এই ধারণা সঠিক নয়।  একটি স্থান পুরোপুরি সমতল হওয়া সত্ত্বেও তার আয়তন সসীম হতে পারে। এই গাণিতিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে থ্রি-টরস স্পেস টোপোলজি বা টরাস ইউনিভার্স থিউরি । এবার আসি মূল প্রশ্নে, - আমাদের সমতল মহাবিশ্ব কি অসীম নাকি সসীম? 


এই অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর সহজ একটি উদাহরণের মাধ্যমে দেয়া যাক। বাল্যকালে আমরা অনেকেই ভিডিও গেম খেলেছি। ভিডিও গেমের বিভিন্ন ক্যারেক্টর স্ক্রিনের এক দিক থেকে বেরিয়ে অন্য দিক দিয়ে আবার ফিরে আসে। থ্রি টরাস মহাবিশ্ব ঠিক এভাবেই কাজ করে। এটি একটি ত্রিমাত্রিক বাক্সের মতো, যার বিপরীত দেয়ালগুলো অদৃশ্যভাবে একে অপরের সাথে জোড়া থাকে। আপনি যদি একটি মহাকাশযান নিয়ে কোনো এক দিকে সোজা চলতে থাকেন, তবে মহাবিশ্বের কোনো শেষ প্রান্তে ধাক্কা খাবেন না। বরং সোজা পথ ঘুরে ঠিক পেছনের দিক থেকে নিজের যাত্রাবিন্দুতে ফিরে আসবেন। একে বলা হয় বহু সংযুক্ত স্থান, যেখানে মহাবিশ্ব সমতল হলেও এর আয়তন সসীম। 


উনিশ শতকে গণিতবিদ ফেলিক্স ক্লেইন ও আর্নস্ট ফন ডাইক প্রথম দেখান যে, সমতল স্থানকে এভাবেই মোড়ানো সম্ভব। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের আদিম আলো বা সিএমবি (Cosmic Microwave Backgraound- CMB) পরীক্ষা করে এই তত্ত্বের বাস্তব প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই-বাছাই করেন। 


বিজ্ঞানী নিল কর্নিশ এবং তার গবেষক দলটি এই 'টরাস ইউনিভার্স থিউরি' পরীক্ষার জন্য আদিম  CMB এর মানচিত্রে একটি বিশেষ প্যাটার্ন খোঁজার প্রস্তাব করেন। তাদের মতে, মহাবিশ্ব যদি একটি ছোট টরাস/ডোনাটের মতো মোড়ানো বাক্সের আকৃতির হয়, তবে আদিম মহাবিশ্বের আলো একাধিক পথ ঘুরে আমাদের টেলিস্কোপে এসে পৌঁছাবে। এর ফলে রাতের আকাশের বিভিন্ন প্রান্তে একই তাপমাত্রার আলোর পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে, যাকে বিজ্ঞানীরা আকাশে জোড়া বৃত্ত বা ম্যাচিং সার্কেলস বলে থাকেন।


পরবর্তীতে মহাকাশে থাকা উইম্যাপ (WIMAP) ও প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইটের  ডাটা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এমন কোনো জোড়া বৃত্তের অস্তিত্ব পাননি। এর মানে কিন্তু 'টরাস ইউনিভার্স থিউরি' ভুল তা নয়। এর সহজ অর্থ হলো, মহাবিশ্ব যদি সত্যিই ডোনাট আকৃতির গোলকধাঁধাও হয়ে থাকে, তবে তার আকার আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ব্যাসার্ধ অর্থাৎ ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষের চেয়েও বহু গুণ বড়। আর মহাবিশ্ব অত বিশাল হওয়ার কারণেই তার সেই পুনরাবৃত্ত আলো বা প্যাটার্ন আমাদের বর্তমান টেলিস্কোপের সীমার বাইরে থেকে যাচ্ছে।


ফলে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কিন্তু থেকেই যায়- আমরা কি সত্যিই এমন এক মহাবিশ্বে বাস করছি, যেখানে সোজা পথে যাত্রা করলে কোনো বাধা ছাড়াই আবার সূচনাবিন্দুতে ফিরে আসা সম্ভব, নাকি এই মহাজাগতিক শূন্যতা আসলেই অসীম? টরাস ইউনিভার্সের থিউরি আমাদের এটাই শেখায় যে, মহাবিশ্বের আসল আকার  আমাদের সরল অনুমানের চেয়েও বেশি জটিল, রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর।


তথ্যসূত্র:

বিখ্যাত গণিতবিদ ফেলিক্স ক্লেইন ও আর্নস্ট ফন ডাইক এর "ফ্ল্যাট স্পেস টোপোলজি" থিউরি  এবং বিজ্ঞানী নীল কর্নিশ, ডেভিড স্পারগেল ও গ্লেন স্টার্কম্যানের "সিএমবি বিকিরণে ম্যাচিং সার্কেলস অনুসন্ধান ও মহাবিশ্বের আকৃতির পর্যবেক্ষণমূলক সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবনা" এর ভিত্তিতে এই পোস্টটি লেখা হয়েছে।

মন্তব্য করুন