Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ

গিবত: একটি ভয়াবহ সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধি

গিবত: একটি ভয়াবহ সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধি

ভূমিকা

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে আমাদের একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে হয়, সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করতে হয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের সমাজে এমন একটি ভয়াবহ অভ্যাস ছড়িয়ে পড়েছে, যা মানুষের সম্মান নষ্ট করে, পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটায় এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়। আর তা হলো গিবত বা পরনিন্দা।

গিবত কী?

গিবত হলো কোনো ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে তার এমন দোষ বা ত্রুটি আলোচনা করা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে। দোষটি যদি তার মধ্যে সত্যিই থাকে, তবে তা গিবত। আর যদি সেই দোষ তার মধ্যে না থাকে, তবে তা অপবাদ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কি জানো, গিবত কী?” সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন। তিনি বললেন—

ذِكْرُكَ أَخَاكَ بِمَا يَكْرَهُ

অর্থ: “তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে।”

— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৯

গিবত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সতর্কবাণী

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন—

وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ

অর্থ: “তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা করো।”

— সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২

আল্লাহ তাআলা গিবতকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর মাধ্যমে গিবতের জঘন্যতা ও ভয়াবহতা আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গিবতের ভয়াবহ পরিণতি

গিবত শুধু মুখের একটি কথা নয়; এর মাধ্যমে মানুষের সম্মানহানি হয় এবং সমাজে বিভেদ সৃষ্টি হয়। গিবতের কয়েকটি ক্ষতিকর দিক হলো—

১. আল্লাহর অসন্তুষ্টি: গিবত ইসলামে নিষিদ্ধ এবং এটি গুরুতর গুনাহ।

২. সম্পর্ক নষ্ট হয়: গিবতের কারণে বন্ধু, আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি হয়।

৩. সমাজে অশান্তি ছড়ায়: পরনিন্দা মানুষের মধ্যে সন্দেহ, হিংসা ও বিভেদ বাড়ায়।

৪. নিজের চরিত্র কলুষিত হয়: যে ব্যক্তি অন্যের দোষ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সে নিজের সংশোধনের সুযোগ হারায়।

৫. পরকালে জবাবদিহি করতে হবে: মানুষের অধিকার নষ্ট করলে কিয়ামতের দিন তার প্রতিকার করতে হতে পারে।

গিবত থেকে বাঁচার উপায়

গিবত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কিছু অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

  • কথা বলার আগে চিন্তা করতে হবে, কথাটি সত্য, প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর কি না।
  • অন্যের দোষ আলোচনা না করে নিজের ভুল সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
  • যেখানে গিবত হচ্ছে, সেখানে সম্ভব হলে গিবত বন্ধ করতে হবে বা আলোচনার বিষয় পরিবর্তন করতে হবে।
  • কারও ভুল দেখলে অপমান না করে সুন্দরভাবে ব্যক্তিগতভাবে বোঝাতে হবে।
  • অতীতে গিবত করে থাকলে আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা করতে হবে এবং যার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, তার ব্যাপারে সতর্কতার সঙ্গে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।

উপসংহার

গিবত এমন একটি পাপ, যা অনেক সময় মানুষ হাসি-ঠাট্টা ও সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেই করে ফেলে, অথচ এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করে না। একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখা এবং অন্যের সম্মান রক্ষা করা।

আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—নিজে গিবত করব না, অন্যকে গিবত করতে উৎসাহ দেব না এবং মানুষের দোষ খোঁজার পরিবর্তে নিজের সংশোধনে মনোযোগী হব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে গিবত থেকে বেঁচে থাকার এবং সুন্দর চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মন্তব্য করুন

ব্লগ