সহকারী শিক্ষক
২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী কি মশা!
মশার অস্ত্র চোখেও দেখা যায় না। মশা শুধু নিরবে রোগ ছড়িয়ে দেয়ছবি: পেক্সেলস
রাতে ঘুমাতে গেছেন। ঘর অন্ধকার, চারপাশ নিস্তব্ধ। হঠাৎ কানের কাছে ভেসে এল একটা ভনভন শব্দ। হাত বাড়িয়ে মশাটা মারতে গেলেন। কিন্তু ওটা ততক্ষণে উধাও। একটু পর আবার ফিরে এল। এবার হয়তো হাতের আঙুলে, নয়তো পায়ের পাতায় বসে রক্ত খাওয়ার চেষ্টা করছে।
একটা মশা নিয়ে এত কাণ্ড! আকারে এত ছোট যে হাতের এক চিমটিতেই ধরে ফেলা যায়। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণীদের সঙ্গে মৃত্যুর হিসাব মেলালে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটিই অনেককে পেছনে ফেলে দেবে। হাঙর, কুমির কিংবা সাপের চেয়েও বেশি মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী মশা। তবে সরাসরি কামড়ে নয়। মশা যে রোগজীবাণু ছড়িয়ে দেয়, বিপদটা মূলত সেখানেই।
একটি হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতিবছর মশাবাহিত রোগে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এই মৃত্যুর বড় অংশের জন্য দায়ী ম্যালেরিয়া। অথচ মশার শরীরে বাঘের মতো শক্তি নেই, সাপের মতো বিষ নেই, কুমিরের মতো ধারালো দাঁতও নেই। মশার অস্ত্র চোখেও দেখা যায় না। মশা শুধু নিরবে রোগ ছড়িয়ে দেয়। এটাই ওদের ক্ষমতা।
আপনি হয়তো জানেন, সব মশা কিন্তু মানুষকে কামড়ায় না। মানুষের রক্ত খায় স্ত্রী মশা। পুরুষ মশা সাধারণত ফুলের মধু ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে খাবার সংগ্রহ করে। স্ত্রী মশাও মধু খেতে পারে, তবে ডিম তৈরির জন্য তার রক্তের প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি দরকার হয়।
মশা রোগ ছড়ায় কীভাবে
একজন অসুস্থ মানুষের রক্ত থেকে রোগজীবাণু মশার শরীরে ঢুকতে পারে। পরে সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে জীবাণু তার শরীরেও পৌঁছাতে পারে। এভাবে মশা এক মানুষের কাছ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে দেওয়ার বাহক হয়ে ওঠে।
মশার মাধ্যমে ছড়ানো রোগের মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গু, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসজনিত রোগ এবং আরও কিছু ভাইরাসের সংক্রমণ। তবে পৃথিবীজুড়ে মশাবাহিত রোগগুলোর মধ্যে ম্যালেরিয়া বিশেষভাবে ভয়ংকর। এটি হয় প্লাজমোডিয়াম নামের একধরনের পরজীবীর কারণে। এই পরজীবী বহন করতে পারে অ্যানোফিলিস গণের স্ত্রী মশা।
ধরুন, একটি মশা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত কাউকে কামড়াল। রক্তের সঙ্গে পরজীবীও মশার শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। এরপর পরজীবী মশার শরীরে বিকশিত হয়ে তার লালাগ্রন্থিতে পৌঁছাতে পারে। সেই মশা যখন আরেকজন মানুষকে কামড়ায়, তখন পরজীবী নতুন মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এভাবেই সংক্রমণ ছড়ায়।
ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হলে জ্বর, কাঁপুনি এবং ফ্লুর মতো নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। রোগটি গুরুতরও হতে পারে; কখনো কখনো মৃত্যুও ঘটে। একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, মশা নিজে কোনো রোগে আক্রান্ত না হয়েও রোগজীবাণু ছড়াতে পারে। আবার সব মশা সব রোগ ছড়ায় না। নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির মশা নির্দিষ্ট রোগের জীবাণু বহন করে।
আরেকটি স্বস্তির খবর আছে। মশার কামড়ে এইচআইভি সংক্রমণ হয়, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ মশা মানুষের রক্ত খেলেও এইচআইভি একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে এভাবে ছড়িয়ে দেয় না।
মশা অনেক পুরোনো শত্রু
মশার ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, জুরাসিক যুগ থেকেই পৃথিবীতে মশার অস্তিত্ব রয়েছে। অর্থাৎ এদের বয়স ১৫ কোটি বছরেরও বেশি। প্রাগৈতিহাসিক যুগের মশার জীবাশ্ম দেখে গবেষকেরা ধারণা করেন, এত দীর্ঘ সময়ে এদের শরীরের গঠনে তুলনামূলকভাবে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি।
মশক বা ইংরেজি mosquito শব্দটির উৎস স্প্যানিশ ভাষার mosca থেকে। এর অর্থ মাছি। এর সঙ্গে ছোট বোঝাতে -ito যোগ হলে শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় ‘ছোট মাছি’।
মানুষের সভ্যতা বদলেছে, চিকিৎসাবিজ্ঞান এগিয়েছে, রোগ শনাক্ত করার পদ্ধতি আরও উন্নত হয়েছে। তবু মশাবাহিত রোগ এখনো পৃথিবীর বহু মানুষের জন্য বড় বিপদ। মশা এত ছোট যে খালি চোখেই দেখা যায়, কিন্তু এর বহন করা জীবাণু একেকটি জীবন কেড়ে নিতে পারে।
এ কারণে মশাকে শুধু বিরক্তিকর পতঙ্গ হিসেবে দেখলে চলবে না। কানের পাশে ভনভন শব্দ শুনে তাকে তাড়ানো দরকার অবশ্যই, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি মশার বংশবিস্তার রোধ করা, প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক ব্যবহার করা এবং মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতন থাকা।
লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা
সূত্র: হেলথ চ্যানেল ও আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা
৮
৮ মন্তব্য