Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:২০ অপরাহ্ণ

জিপিএর দৌড়ে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, শিক্ষার্থী কোথায়?


একটি জাতির মেরুদণ্ড তার শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা শুধু সনদ অর্জন কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফল করার মাধ্যম নয়; বরং এটি মানুষের জ্ঞান, বিবেক, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধ বিকাশের প্রধান হাতিয়ার। অথচ বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত ও দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করছি, নাকি কেবল জিপিএ ও সনদনির্ভর একটি প্রজন্ম গড়ে তুলছি?

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী কমছে, অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে!

দেশের অনেক সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কম বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও নিয়মিত পাঠদান চললেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়। আবার এমন অভিযোগও শোনা যায়, প্রতিষ্ঠানের নথিপত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা থাকলেও তাদের একটি অংশ নিয়মিত ক্লাস।


না করে কোচিং সেন্টার কিংবা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে।

প্রশ্ন হলো, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশিত শিক্ষা দিতে না পারে, তাহলে অভিভাবকেরা কেন বিকল্প প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন? শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম হওয়ার কারণ কি শিক্ষকদের পাঠদানপদ্ধতি, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহির অভাব, অভিভাবকদের মানসিকতা, নাকি এসবের সম্মিলিত প্রভাব?

সমস্যার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করে শুধু শিক্ষকদের দায়ী করা কিংবা শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির জন্য অভিভাবকদের দোষারোপ করা কোনো কার্যকর সমাধান নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং কার্যকর পদক্ষেপ।

কোচিংনির্ভরতা ও শিক্ষাবাণিজ্যের বিস্তার

বর্তমানে অনেক অভিভাবক মনে করেন, বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেই ভালো ফল নিশ্চিত হয় না; ভালো ফলের জন্য কোচিং কিংবা প্রাইভেট শিক্ষকের সহায়তা অপরিহার্য। এই ধারণা থেকেই গড়ে উঠেছে কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার একটি শক্তিশালী প্রবণতা।

অন্যদিকে, বিভিন্ন বেসরকারি মডেল স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ও কোচিং সেন্টারের মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিক্ষার চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার প্রতিশ্রুতি, সাজেশননির্ভর প্রস্তুতি এবং মুখস্থবিদ্যাকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা হয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কিছু প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা কিংবা শিক্ষাক্রম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ধারণা ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানকে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার একটি নির্দিষ্ট পর্যায় দিয়ে বিচার না করে তাঁর বিষয়জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, পাঠদানদক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতা যাচাই করাই যুক্তিসংগত।

একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের তথ্য মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষার খাতায় লিখতে শেখাবেন—এমন ধারণা আধুনিক শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একজন প্রকৃত শিক্ষকের কাজ শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখানো, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়ানো এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা।

জিপিএর প্রতিযোগিতা, কিন্তু প্রকৃত মেধার বিকাশ কোথায়?

আমাদের সমাজে জিপিএ ও পরীক্ষার ফলাফলকে শিক্ষার্থীর মেধা নির্ধারণের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা রয়েছে। অভিভাবকদের একটি অংশ সন্তানের প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা কিংবা নৈতিক বিকাশের চেয়ে ভালো ফলাফল অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে শিক্ষার্থীও শেখার আনন্দের পরিবর্তে পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—যে শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের তথ্য মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করতে পারে না, নিজের ভাষায় কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করতে পারে না কিংবা যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম, তার শিক্ষার প্রকৃত অর্জন কতটুকু?

অবশ্যই ভালো ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। তবে ফলাফলই শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। শিক্ষার সঙ্গে থাকতে হবে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, যোগাযোগদক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, নৈতিকতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের সামর্থ্য।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি না হলে উচ্চ জিপিএ অর্জন করেও একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে সুশিক্ষিত হয়ে উঠতে ব্যর্থ হতে পারেন।

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধে সরকারের ভূমিকা কোথায়?

দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাক্রম অনুসরণ, পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বিশেষ করে সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যক্রম যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কিন্ডারগার্টেন ও কোচিং সেন্টারের কার্যক্রমও প্রযোজ্য আইন, নীতিমালা ও মানদণ্ডের আলোকে তদারকি করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা, শিক্ষাক্রম অনুসরণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর অযৌক্তিক পরীক্ষার চাপের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

যেসব প্রতিষ্ঠান প্রকৃত শিক্ষা প্রদানের পরিবর্তে শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তবে বেসরকারি উদ্যোগকে ঢালাওভাবে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করছে। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানভেদে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

সরকারের কাছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষার্থীর ভর্তি কিংবা পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যানই কি শিক্ষার মান নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট? নাকি শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কী শিখছে, কতটুকু বুঝতে পারছে এবং অর্জিত জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগাচ্ছে, সেটিও নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন?

উত্তরণের পথ কী?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর ও মানসম্মত করতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।

প্রথমত, শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শেখার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অনুপস্থিতির পেছনের কারণ শনাক্ত করে বিদ্যালয়, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার উন্নয়ন, আধুনিক পাঠদানপদ্ধতির ব্যবহার এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, কোচিংনির্ভরতা কমাতে হবে। বিদ্যালয়েই এমন মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার ওপর আস্থা রাখতে পারে।

চতুর্থত, মূল্যায়নব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে অনুধাবন, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, ব্যবহারিক দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

পঞ্চমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি, এমপিওভুক্ত ও বেসরকারি—সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিয়মিত ও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

ষষ্ঠত, অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। সন্তান কত নম্বর পেল, শুধু তা নয়; সে কী শিখল, কেমন মানুষ হয়ে উঠছে এবং বাস্তব জীবনে কতটা দক্ষ হচ্ছে—এসব বিষয়েও অভিভাবকদের নজর দিতে হবে।

উপসংহার: শিক্ষা কি সনদ তৈরির কারখানা, নাকি মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান?

একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকবে, শিক্ষক থাকবেন, শিক্ষার্থী ভর্তি হবে, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং সনদ বিতরণ করা হবে—কিন্তু শিক্ষার্থীরা যদি প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতা অর্জন করতে না পারে, তাহলে সেই শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হলে কাউকে অন্ধভাবে দোষারোপ না করে সমস্যার গভীরে যেতে হবে। সরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ভূমিকা স্বীকার করতে হবে এবং শিক্ষার নামে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, জিপিএর প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশকে শিক্ষার মূল লক্ষ্য করতে হবে।

সরকারের কাছে প্রশ্ন—আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় পাস করবে; নাকি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে তারা জ্ঞানী, দক্ষ, সৃজনশীল, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের কাছেই নয়; শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী এবং সমগ্র সমাজের কাছেও প্রত্যাশিত।

কারণ, শিক্ষা নিয়ে অবহেলার মূল্য কোনো একটি প্রজন্মকে নয়, পুরো জাতিকেই দীর্ঘদিন ধরে দিতে হয়।

লেখক: মোশারফ হোসাইন, সহকারী শিক্ষক(ইসলাম শিক্ষা), হাড়গিলা উচ্চ বিদ্যালয়, ইসলামপুর, জামালপুর।

একজন সচেতন নাগরিক ও শিক্ষাব্যবস্থার পর্যবেক্ষক।

মন্তব্য করুন