Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ নভেম্বর, ২০২৬ ১০:৫২ অপরাহ্ণ

মাওলানা নূরুল মহসিন—পাঠদান, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের এক প্রতিচ্ছবি”

“মাওলানা নূরুল মহসিন—পাঠদান, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের এক প্রতিচ্ছবি”


শ্রেণিকক্ষে প্রাণবন্ত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের জন্য নিজ হাতে হ্যান্ডনোট প্রণয়ন, নিবিড় তত্ত্বাবধান এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে নিরলস প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন, অসংখ্য শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বিকাশের এক নিবেদিত কারিগর। আমার নিজের শিক্ষকতা-জীবনেও তাঁর পাঠদানপদ্ধতি, কর্মনিষ্ঠা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ গভীর অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।


মাওলানা নূরুল মহসিন। বর্তমানে কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার অধ্যক্ষ। শিক্ষকতা, পাঠদানশৈলী, শিক্ষার্থী গঠন এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যাঁর রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘ শিক্ষকতা-জীবনে তিনি যেমন অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছে প্রিয় ও অনুসরণীয় শিক্ষক হিসেবে সমাদৃত হয়েছেন, তেমনি সহকর্মী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছেও অর্জন করেছেন শ্রদ্ধা ও আস্থার জায়গা।


তাঁকে নিয়ে লিখতে বসলে সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন তরুণ, স্মার্ট, প্রাণচঞ্চল ও উদ্যমী শিক্ষকের প্রতিচ্ছবি। উদাত্ত কণ্ঠস্বর, সাবলীল উপস্থাপনা এবং শ্রেণিকক্ষজুড়ে বিচরণ করে পাঠদানের অভিনব কৌশল—সব মিলিয়ে তাঁর ক্লাস ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত এক শিক্ষার পরিসর।


শ্রেণিকক্ষজুড়ে বিচরণ, পাঠদানে অভিনবত্ব

তখন আমরা শিক্ষার্থী। মাওলানা নূরুল মহসিন হুজুর  যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতেন, তখন যেন পুরো পরিবেশেই একধরনের প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি হতো। পাঠদানের সময় তাঁকে কখনো চেয়ারে বসে থাকতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। পুরো শ্রেণিকক্ষজুড়ে হেঁটে হেঁটে পাঠদান করতেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল দৃপ্ত ও স্পষ্ট, উপস্থাপনায় ছিল সাবলীলতা, আর পাঠের প্রতিটি পর্বে থাকত অসাধারণ প্রাণশক্তি।

শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা, পাঠের সঙ্গে সবাইকে সম্পৃক্ত করা এবং জটিল বিষয় সহজবোধ্য করে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়। প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব, উদাত্ত কণ্ঠস্বর ও শ্রেণিকক্ষজুড়ে বিচরণ করে পাঠদানের অভিনব কৌশল আমাদের মুগ্ধ করত।


তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি ছোট্ট অথচ চোখে পড়ার মতো দিক ছিল পোশাক-পরিচ্ছদ। প্রতিটি পিরিয়ডে তাঁর পরনে থাকত ভিন্ন পাঞ্জাবি। একই দিনে একই পাঞ্জাবি পরে দুবার ক্লাস নিতে তাঁকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, পরিপাট্য ও আত্মপ্রস্তুতির যে স্বতন্ত্র সৌন্দর্য রয়েছে, তাঁর মধ্যে তা বেশ স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠত।


আরবি অনুবাদে শব্দচয়ন ও ভাষার নান্দনিকতা

আরবি অনুবাদে তাঁর পাঠদানশৈলী ছিল সত্যিই অসাধারণ। অনুবাদ শুরু করতেন বাক্যের শেষ দিক থেকে। কোথায় কমা বসবে, কোথায় ‘আর’ কিংবা ‘এবং’ ব্যবহার করতে হবে, কোন শব্দের পরিবর্তে কোন বাংলা শব্দটি অধিক যথার্থ হবে—সবকিছুই অত্যন্ত যত্নসহকারে বুঝিয়ে দিতেন।

বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ শব্দভান্ডার থেকে যথাযথ শব্দ নির্বাচন করে আরবি বাক্যকে সাবলীল, শ্রুতিমধুর ও অর্থবহ বাংলায় রূপান্তর করার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। শব্দচয়ন, বাক্যগঠন, যতিচিহ্নের যথাযথ প্রয়োগ এবং ভাষার সৌন্দর্যের এমন সমন্বয় সচরাচর দেখা যায় না। তাঁর মুখে আরবি অনুবাদ শুনতে শুনতে আমরা মুগ্ধ হয়ে যেতাম।

মূলত তিনি শুধু অনুবাদ শেখাতেন না; শেখাতেন ভাষার সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে, শব্দের যথার্থ ব্যবহার জানতে এবং একটি বাক্যকে কীভাবে পরিশীলিত ও অর্থবহভাবে উপস্থাপন করতে হয়।

আরবি বিষয়ের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার প্রতিও তাঁর বিশেষ মনোযোগ ছিল। আরবি শব্দের শাব্দিক অর্থ বোঝানোর সময় তিনি সংশ্লিষ্ট শব্দের পাশাপাশি তিন-চারটি করে ইংরেজি প্রতিশব্দও লিখে দিতেন। ফলে শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে আরবি শব্দের অর্থ অনুধাবনের পাশাপাশি ইংরেজি শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করারও সুযোগ পেত। তাঁর পাঠদানের এই কৌশল ছিল বেশ ব্যতিক্রমী ও শিক্ষণীয়।


শিক্ষার্থীদের সাফল্যে নিজেকে উজাড় করে দেওয়া

শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য তাঁর শ্রম, মেধা ও আন্তরিকতা ছিল উল্লেখ করার মতো। একসময় দাখিল ও আলিম পরীক্ষার্থীদের জন্য তিনি নিজ হাতে হ্যান্ডনোট প্রস্তুত করতেন। বিভিন্ন বই, গাইড ও রেফারেন্স থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে সেগুলো সাজিয়ে দিতেন।

দাখিল পরীক্ষা শেষে দীর্ঘবিরতিতে আমাকে তাঁর কক্ষে নিয়ে পাশে বসিয়ে নিজের হাতে নোট লিখতে দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই নোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হতো। শুধু নোট সরবরাহ করেই দায়িত্ব শেষ করতেন না; নিজে পাঠদান করতেন, মুখস্থ করাতেন, অনুশীলন করাতেন, এমনকি নিয়মিত পরীক্ষাও নিতেন। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষার প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপে তিনি নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত থাকতেন।


দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতিও ছিল তাঁর বিশেষ নজর। কে কোন বিষয়ে পিছিয়ে আছে, কার কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কীভাবে তাকে এগিয়ে নেওয়া যায়—এসব বিষয় তিনি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন থাকত বিশেষ দিকনির্দেশনা, তেমনি অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্যও থাকত আলাদা পরিকল্পনা ও পরিচর্যা।

শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পেছনে একজন শিক্ষকের কতটা শ্রম, সময়, মেধা ও আত্মনিবেদন প্রয়োজন, তাঁর কর্মপদ্ধতি ছিল তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


আমার শিক্ষকতা-জীবনে তাঁর গভীর প্রভাব

নিজের শিক্ষকতা-পেশায় প্রবেশের পর থেকে আমি সবসময় তাঁর পাঠদানপদ্ধতি অনুসরণ করার চেষ্টা করি। শিক্ষক হিসেবে আমার চিন্তা, প্রস্তুতি ও শ্রেণিকক্ষ পরিচালনায় তাঁর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা আজও প্রেরণা জোগায়।

বিশেষ করে পরবর্তী দিনের পাঠ আগের দিনই ভালোভাবে শিখে নেওয়ার অভ্যাসটি তিনি আমাদের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন। এটি শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য নয়, বরং প্রতিদিনের পাঠ যথাযথভাবে আয়ত্ত করার একটি কার্যকর পদ্ধতি ছিল।

শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখতে তাৎক্ষণিক পুনরালোচনা, প্রশ্নোত্তর, পাঠের সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং শ্রেণিকক্ষেই পড়া আদায় করে নেওয়ার কৌশলগুলো আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে।


তাঁর আরেকটি অনুকরণীয় বৈশিষ্ট্য ছিল পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করা। একজন শিক্ষক পাঠদানের আগে নিজেকে কতটা প্রস্তুত করবেন, পাঠের বিষয়বস্তু কতটা আয়ত্ত করবেন এবং কীভাবে তা শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য করে তুলবেন—এসব বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়েছে।

আজ আমি যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করি, তখন প্রায়ই তাঁর সেই প্রাণবন্ত পাঠদানশৈলী, পরিপূর্ণ প্রস্তুতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি নিবিড় মনোযোগের কথা মনে পড়ে। নিঃসন্দেহে তিনি আমার শিক্ষকতা-জীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস।


প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক

একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য কেবল তাঁর পদবি কিংবা কর্মজীবনের অর্জনে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং শিক্ষার্থীদের স্মৃতি, ভালোবাসা এবং তাঁদের জীবনে রেখে যাওয়া প্রভাবের মধ্যেই তাঁর প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। মাওলানা নূরুল মহসিনকে নিয়ে তাঁর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণেও সেই পরিচয়ের প্রতিফলন পাওয়া যায়।

মাদরাসার প্রাক্তন শিক্ষার্থী আবু নোমান হাফিজুল্লাহ তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন—

“হুজুর মাদরাসায় প্রভাষক হিসেবে যোগদানের পরপরই সিনিয়র শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদানে একধরনের নতুন গতিশীলতা আসে। বিশেষ করে দাখিল ও আলিম স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি এমন একটি পাঠদানপদ্ধতি চালু করেন, যার ফলে সবাই ভালো ফলাফল অর্জনের সুযোগ পায়।

ক্লাসের পড়া ক্লাসেই আদায় করে নেওয়া, বিশেষ তত্ত্বাবধান, গতানুগতিক গাইডবইয়ের বাইরে গিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে স্মার্ট হ্যান্ডনোট তৈরি, গবেষণালব্ধ সাজেশন প্রণয়ন এবং ভালো ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক দিকনির্দেশনা—এসব প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে রশিদিয়া মাদরাসা লোহাগাড়া উপজেলায় ফলাফলের দিক থেকে একটি ভালো অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। অবশ্য সে সময়ের অধ্যক্ষ আবু বকর হুজুরও তাঁকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছেন।আমাদের ব্যাচের প্রতি হুজুরের বিশেষ নজর ছিল। তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে আমাদের ব্যাচ সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করেছিল।”

আরেক প্রাক্তন শিক্ষার্থী তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লিখেছেন—

“তিনি যেকোনো বিষয়ে বিভিন্ন গাইড ও রেফারেন্স বই থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিজেই অনেক পরিশ্রম করে হ্যান্ডনোট তৈরি করে দিতেন। ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরাও ভালো ফলাফল করার সুযোগ পেত। তিনি এখনো সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন বলেই আমার ধারণা। এ কাজে তিনি প্রচুর শ্রম বিনিয়োগ করেন।আমার আরবি লেখার হাত কিছুটা ভালো হওয়ায় একসময় নোট তৈরির দায়িত্বও আমার ওপর পড়েছিল। আরেকটি বিষয় হলো, গ্রামপর্যায়ের একটি মাদরাসায়, বিশেষ করে দাখিল ও আলিম পর্যায়ে, প্রয়োজনীয় অনেক কিতাব, রেফারেন্স বই ও শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ বইয়ের নাম তাঁর কাছ থেকেই প্রথম শুনেছি।”


প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এসব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয়, তাঁর পাঠদান কেবল শ্রেণিকক্ষের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক প্রস্তুতি ও সাফল্য নিশ্চিত করতে তিনি শ্রেণিকক্ষের বাইরেও সমানভাবে সক্রিয় ও আন্তরিক ছিলেন।


সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের দৃষ্টিতে

মাদরাসার সাবেক শিক্ষক, প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ও পীরে কামেল জনাব আলহাজ্ব মাওলানা গোলাম রছুল কমরী সাহেবও তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠানপ্রেমের প্রশংসা করেছেন। তিনি লিখেছেন—

“প্রিয় প্রতিষ্ঠানের একজন একনিষ্ঠ ও দক্ষ অধ্যক্ষ মহোদয় মাদরাসার মানোন্নয়নে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর জন্য প্রাণভরে দোয়া করি। মহান আল্লাহ তাঁর হাতে আরও বেশি আলেম ও আমলে সালেহে সমৃদ্ধ মানুষ গড়ে তোলার সুযোগ বাড়িয়ে দিন।”

একজন সাবেক শিক্ষকের এই আন্তরিক অভিব্যক্তি তাঁর প্রতি সহকর্মীদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও প্রত্যাশারই বহিঃপ্রকাশ।


জন্ম, পরিবার ও শিক্ষাজীবন

মাওলানা নূরুল মহসিন ১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা চন্দনাইশ উপজেলার জাফরাবাদ ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মেজো ভাই বর্তমানে লোহাগাড়া উপজেলার বড়হাতিয়া এশাআতুল উলুম ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসায় ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।


শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি মেধা ও অধ্যবসায়ের স্বাক্ষর রেখেছেন। ১৯৯৫ সালে জাফরাবাদ ফাজিল মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদরাসা থেকে ১৯৯৭ সালে আলিম, ১৯৯৯ সালে ফাজিল এবং ২০০১ সালে কামিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।

পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ এবং ২০১২ সালে আরবি বিষয়ে মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি অর্জন করেন। উল্লেখ্য, তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ কিংবা প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে।


কর্মজীবন: শিক্ষকতা থেকে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায়

২০০১ সালের ১ জুলাই বাঁশখালী উপজেলার যাতানূরাইন ফাজিল মাদরাসায় সহকারী মৌলভী হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। সেখানে ২০০২ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

পরদিন, ২০০২ সালের ১৩ আগস্ট, আরবি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসায়। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর তিনি এ প্রতিষ্ঠানে সুনাম ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষকতা করেন। ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন শেষে পরদিন ১৬ মার্চ যোগদান করেন বাঁশখালী উপজেলার প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুঁইছড়ী ইসলামিয়া কামিল মাদরাসায়। সেখানে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দেন।

পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের ১ মে আবারও ফিরে আসেন তাঁর দীর্ঘ কর্মস্মৃতির প্রিয় প্রতিষ্ঠান কলাউজান শাহ রশিদিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসায়। এবার অধ্যক্ষ ও সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অদ্যাবধি তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, দক্ষতা, সততা ও সুনামের সঙ্গে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।


অধ্যক্ষ হিসেবে শিক্ষার মানোন্নয়নে নিরলস প্রচেষ্টা

অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে মাওলানা নূরুল মহসিন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও একাডেমিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে পাঠদানের মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অধ্যয়ন, অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিশেষ পরিচর্যা, পরীক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস এবং শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল উন্নয়নে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং একাডেমিক কার্যক্রমে গতিশীলতা সৃষ্টিতে তিনি আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন নয়; বরং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা ও আদর্শিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা।

প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফলের আরও উন্নয়ন সাধনে তাঁর এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রায় দক্ষ নেতৃত্ব, পরিকল্পনা ও আন্তরিকতার যে সম্মিলন প্রয়োজন, তাঁর বর্তমান দায়িত্ব পালনে তার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।


প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা

পেশাগত দক্ষতা ও প্রশাসনিক যোগ্যতা বৃদ্ধিতেও তিনি সচেষ্ট। ২০২৪ সালে বিএমটিটিআই আয়োজিত অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষদের ৫০ জনবিশিষ্ট প্রশিক্ষণ ব্যাচে অংশগ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায়ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতাকে সমৃদ্ধ করেছেন।


একজন শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর শিক্ষার্থীদের সাফল্যে

একজন আদর্শ শিক্ষকের সার্থকতা কেবল পাঠ্যবইয়ের নির্ধারিত পাঠ শেষ করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করা, আত্মবিশ্বাস তৈরি করা এবং জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত করে গড়ে তোলার মধ্যেই তাঁর প্রকৃত কৃতিত্ব।

মাওলানা নূরুল মহসিনের শিক্ষকতা-জীবনের দিকে ফিরে তাকালে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই বিশেষভাবে চোখে পড়ে। পাঠদানের অভিনবত্ব, নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষা উপকরণ তৈরি, দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ, পরীক্ষার প্রস্তুতিতে নিবিড় তত্ত্বাবধান এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষার্থীদের জন্য সময় ব্যয় করার মানসিকতা তাঁকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

আমার কাছে তিনি শুধু অতীতের একজন প্রিয় শিক্ষক নন; বরং বর্তমান শিক্ষকতা-জীবনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও আদর্শ প্রতিনিয়ত নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমাকে উৎসাহিত করে। একজন শিক্ষকের পাঠদান যে তাঁর শিক্ষার্থীর পরবর্তী কর্মজীবনেও কতটা গভীর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাঁর ক্ষেত্রে আমি নিজেই তার একটি বাস্তব উদাহরণ।

শিক্ষক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ পথচলা, শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় আন্তরিক প্রচেষ্টা আমাদের সামনে একজন আদর্শ শিক্ষকের অনুকরণীয় প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। তাঁর হাত ধরে আরও বহু শিক্ষার্থী জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক—এটাই প্রত্যাশা।


মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর দীর্ঘদিনের ইলমি খেদমত, শিক্ষাদান ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মহৎ প্রচেষ্টাগুলো কবুল করুন। তাঁকে সুস্বাস্থ্য, নেক হায়াত ও বরকতময় দীর্ঘ জীবন দান করুন। তাঁর হাত ধরে আরও বহু জ্ঞানী, যোগ্য, আদর্শবান ও আমলদার মানুষ গড়ে উঠুক। তাঁর কর্মময় জীবন হোক আরও সাফল্যমণ্ডিত ও কল্যাণময়।

আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।


লেখক: মুহাম্মদ নাজিম উদ্দীন, প্রাক্তন শিক্ষার্থী; বর্তমানে সহকারী শিক্ষক, চুনতি মেহেরুন্নেছা মাধ্যমিক বিদ্যালয়।


#MadrasaEducation #MadrasahBoard #lohagara_satkania #kalauzan #Lohagara 

#Chattogram #kalauzanshahrashidiafazilmadrasah

মন্তব্য করুন

ব্লগ