Loading..

ভিডিও ক্লাস

রিসেট

২২ জুন, ২০২১ ০৭:৫৭ অপরাহ্ণ

বন্দনা। শাহ মুহাম্মদ সগীর

বন্দনা

শাহ মুহম্মদ সগীর


কবি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা:

মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রাচীনতম কবি হলেন শাহ মুহম্মদ সগীর। ধারণা করা হয়, তিনি ১৪-১৫ শতকের কবি ছিলেন। গৌড়ের সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে (১৪৮৯-১৪১১ খ্রিষ্টাব্দ) ইউসুফ জুলেখা কাব্যটি লিখেন। মনে করা হয় ইউসুফ জুলেখা পঞ্চদশ শতকের প্রথম ভাগেই রচিত হয়েছিল। কাব্যের রাজবন্দনায় 'মহামতি গ্যাছ' বলে যাঁকে উল্লেখ করা হয়েছিল তিনি গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। 'শাহ' উপাধি থেকে অনুমান করা হয় কবি শাহ মুহম্মদ সগীর কোনো দরবেশ বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কাব্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কতিপয় শব্দের প্রয়োগ দেখে ড. মুহম্মদ এনামুল হক তাঁকে চট্টগ্রামের অধিবাসী বলে ধরে নিয়েছেন। কবি তার কবিতার রাজবন্দনায় উল্লেখ করেছেন, 'মুহম্মদ সগীর তান আজ্ঞার অধীন'এ কথা থেকে ধারণা করা হয় তিনি হয়ত সুলতানের কর্মচারী ছিলেন। অথবা কাব্যচর্চায় কবি শাহ মুহম্মদ সগীর সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। তিনি দেশীয় ভাষায় ইউসুফ জুলেখা কাব্যের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় উপাখ্যানই বর্ণনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কাব্যে ধর্মীয় পটভূমি থাকলেও তা হয়ে উঠেছে মানবিক প্রেমোপাখ্যান। শাহ মুহম্মদ সগীরের কাব্যের ভেতর মানবিক গুণের প্রকাশ ঘটেছে অবলীলায়। তাঁর কাব্যের শিল্পমূল্যও তুলনাহীন।

**গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (শাসনকাল ১৩৮৯-১৪১০) ছিলেন প্রথম ইলিয়াস শাহি রাজবংশের তৃতীয় সুলতান।তিনি তৎকালীন বাংলার সুপরিচিত সুলতানদের অন্যতম ছিলেন। তার প্রকৃত নাম আজম শাহ। সিংহাসন আরোহণের পর তিনি গিয়াস উদ্দিন আজম শাহ নাম ধারণ করেন।

বন্দনা

(স্তুতি বা প্রশংসা)

শাহ মুহম্মদ সগীর

দ্বিতীয়ে প্রণাম কঁরো মাও বাপ পাএ।

(মাও- মা। পাএ- পায়ে)

দ্বিতীয়ত সালাম/প্রণাম করি মাবাবাকে।

 

যান দয়া হন্তে জন্ম হৈল বসুধায়।।

(যান- যাদের। হন্তে- হতে/দ্বারা। বসুধা- পৃথিবী।

যাদের দয়ায় পৃথিবীতে আমার জন্ম হলো।

 

পিঁপিড়ার ভয়ে মাও না থুইলা মাটিতে।

(পিপিঁড়া- পিঁপড়া/পোকামাকড়। না থুইলা- না রাখা।

পিঁপড়া বা পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে মা শিশুকে খুব সাবধানে রাখতেন।

 

কোল্ দিয়া বুক দিয়া জগতে বিদিত।।

(বিদিত- জানত।)

কোলে করে, বুকে করে আগলে রেখেছেন যা পৃথিবীর সবাই জানে।

 

অশক্য আছিলুঁ মুই দুর্বল ছাবাল

(অশক্য- দুর্বল/শক্তিসামর্থ্যহীন। আছিলঁ- ছিলাম। ছাবাল- শিশু।

শক্তি সামর্থ্যহীন এক দুর্বল শিশু ছিলাম আমি।

 

তান দয়া হন্তে হৈল এ ধড় বিশাল।।

(তান- তার। হন্তে- দ্বারা। ধড়- শরীর।)

তাঁর দয়া ও যত্নে আমি এত বড় হয়েছি।

 

না খাই খাওয়াএ পিতা না পরি পরাএ।

(পরাএ- পোশাক পরিধান করানো।)

পিতা না খেয়ে আমাকে খাওয়াতেন, নিজে না পরে আমাকে পরাতেন।

 

কত দুক্ষে একে একে বছর গোঞাএ।।

(দুক্ষে- দুঃখে। গোঞাএ- পার করে।)

দুঃখকষ্টে বছরের পর বছর পার করেছেন।

 

পিতাক নেহায় জিউ জীবন যৌবন।

(পিতাক- বাবা। নেহায়- অতিক্রম করে/বিসর্জন দিয়ে। জিউ- প্রাণ/মন)

বাবা তার মনপ্রাণ, জীবনযৌবন সব বিসর্জন দিলেন।

 

কনে না সুধিব তান ধারক কাহন।।

(কনে-কখনো। সুধিব- শোধ করা। ধারক- ঋণ। কাহন- কাহিনী।)

কখনো তাঁর ঋণ শোধ করা যাবে না।

 

ওস্তাদে প্রণাম করোঁ পিতা হন্তে বাড়।

(ওস্তাদ-শিক্ষক। হন্তে- হতে/থেকে। বাড়-বেশি।)

শিক্ষককে সম্মান কর পিতার চাইতে বেশি।

 

দোসর-জনম দিলা তিঁহ হে আন্ধার।।

(দোসর-দ্বিতীয়। দিলা-দিলেন। তিঁহ-তিনিও। আন্ধার- অজ্ঞতা।)

তিনিও ২য় বার আমাকে জন্ম দিলেন অন্ধকার থেকে আলোয় এনে।

 

আন্ধা পুরবাসী আছ জথ পৌরজন।

(আহ্মা- সমগ্র। পুরাবাসী-নগরবাসী। আছ-আছেন। জথ-যতজন। পৌরজন-নাগরিক।)

এই সমগ্র পৃথিবীতে যত শিক্ষিত ব্যক্তি আছেন।

 

ইস্ট মিত্র আদি জথ সভাসদগণ।

(ইস্ট-আত্মীয়। মিত্র-বন্ধু। আদি-বয়োজ্যেষ্ঠ। সভাসদগণ-রাজার মন্ত্রীসভার সদস্যগণ)

আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, সভার বয়োজ্যেষ্ঠ সকল সদস্য।

 

তান সভান পদে মোহার বহুল ভকতি।

(তান-তাঁদের। সভান-সকলের। পদে-পায়ে। মোহার-আমার। ভকতি-শ্রদ্ধা।)

তাদের সকলের পায়ে আমার কদমবুচি/শ্রদ্ধা।

 

সপুটে প্রণাম মোহার মনোরথ গতি।।

সপুটে-নিজহাতে। প্রণাম-(সম্মান/কদমবুচি। মোহার-আমার। মনোরথ-মনের ইচ্ছা। গতি-স্বভাব।)

আমার মনের ইচ্ছা হলো তাদের সবাইকে কদমবুচি করি।

 

মুহম্মদ সগীর হীন বহোঁ পাপ ভার।

(হীন-অধম। বহোঁ-বহন করা। পাপভার- পাপের বোঝা)

আমি অধম ও পাপী মুহম্মদ সগীর

 

সভানক পদে দোয়া মাগোঁ বার বার।

(সভানক-সভার সদস্য। মাগোঁ-চাওয়া/প্রার্থনা করা।)

সভায় উপস্থিত সকলের কাছে বার বার দোয়া প্রার্থনা করছি।

শ্রেণিশিক্ষা: শাহ মুহম্মদ সগীর রচিত 'বন্দনা' কবিতাটি সংগৃহীত হয়েছে ইউসুফ জুলেখা কাব্যের বন্দনা পর্ব থেকে। ইউসুফ জুলেখার বন্দনাটি অনেক দীর্ঘ। এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে পাঠ্য করা হয়েছে। কবি শাহ মুহম্মদ সগীর তার 'বন্দনা' কবিতায় গুরুজনদের প্রতি কীভাবে ভক্তি করা উচিত তার চমত্কার বর্ণনা দিয়েছেন।


প্রথমে কবি শাহ মুহম্মদ সগীর মহান আল্লাহ তালার মহীমাগুণ প্রকাশ করেছেন তার বন্দনায়। কেননা মহান আল্লাহতালার ইশারাতেই এই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে।


আল্লাহতালার পরেই কবি মা-বাবার স্থান দিয়েছেন, তিনি বলেছেনতাদের দয়াতেই এ পৃথিবীতে সন্তানের জন্ম। এবং শুধু জন্ম দিয়েই মা-বাবার দায়িত্ব শেষ হয়নি। তাদের মমতা আর অপার স্নেহে লালন-পালন করেছে আমাদেরকে। আমরা যখন শিশু ছিলাম তখন আমরা অতি দুর্বল ছিলাম, নিজে কিছু করার সামর্থ্য ছিল না। মা শত কষ্ট করে তার সন্তানকে বুক দিয়া আগলে রেখেছে। পিঁপড়ার ভয়ে মাটিতে রাখে নাই। আর পিতা নিজে না খেয়ে না পরে সন্তানকে পরায়েছে। এভাবে সন্তানের প্রতি মা-বাবার মমতার চিত্রটি ফুটে উঠেছে এই কবিতায়। পুনরায় কবি শাহ মুহম্মদ সগীর মাতা-পিতার পর গুরুকেই মা-বাবার চেয়ে বড় করে দেখিয়েছেন। তার কারণ দ্বিতীয় জন্ম দিল গুরু। পিতা-মাতা দিলো অসীম স্নেহ-দরদ আর গুরু দিলো শিক্ষা। এ জগতে কার সাথে কীভাবে চলতে হবে, মিশতে হবে তার শিক্ষাই জীবনকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। জীবনের সুন্দর দিকগুলো, মানবীয় গুণের ঠিকানা সবকিছুই গুরুর কাছে শিখেছি আমরা। যে কারণে মাতাপিতার চেয়েও গুরুকেই গুরুত্বপূর্ণ করে দেখিয়েছেন কবি।


'বন্দনা' কবিতাটি থেকে আমাদের শিখতে হবে কার সাথে কী আচরণ করতে হবে, এই সুন্দর জগত্ আমরা মা-বাবার কারণে পেয়েছি, আর উপভোগ করার জন্য শিক্ষা দিয়েছেন গুরু, তাই গুরুকে প্রণাম। আমরা দেখি সর্বশেষে কবি সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন যেন তিনি কাব্যসাধনায় সাফল্য লাভ করতে পারেন।

মন্তব্য করুন