Loading..

শিক্ষায় অগ্রযাত্রা

রিসেট

২৬ জুন, ২০২১ ০১:২৭ অপরাহ্ণ

হোমিওপ্যাথি

হোমিওপ্যাথি

Homeopathic remedies
1857 painting by Alexander Beydeman showing historical figures and personifications of homeopathy observing the perceived brutality of medicine of the 19th century

হোমিওপ্যাথি জার্মান চিকিৎসক স্যামুয়েল হ্যানিম্যান উদ্ভাবিত (১৭৯৬) এক চিকিৎসা পদ্ধতি। এই চিকিৎসা পদ্ধতির অন্তর্নিহিত মূলনীতি হচ্ছে- কোনো একজন সুস্থ ব্যক্তির শরীরে যে ওষুধ প্রয়োগ করলে তার মধ্যে যে লক্ষণ দেখা দেয়, ওই একই ওষুধ সেই লক্ষণের ন্যায় অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তির উপরে প্রয়োগ করলে তা অসুস্থ ব্যক্তির জন্য অসুখের লক্ষণ নিরাময়ের কাজ করে।[১] হ্যানিম্যানের প্রস্তাবিত এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থা। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে যে, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ প্রয়োগের ফলে কোনপ্রকার শারীরিক পরিবর্তন হয় না; যদিও কিছু ক্ষেত্রে ওষুধ গ্রহণের কারণে হয়ত রোগী মানসিক প্রশান্তি লাভ করে থাকতে পারেন। এইজন্য হোমিওপ্যাথিক ওষুধকে "প্লেসবো" হিসেবে গণ্য করা হয়[২] এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পদ্ধতিকে বিজ্ঞানীরা ছদ্মবিজ্ঞান হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।[৩][৪][৫][৬][৭]

হ্যানিম্যান বিশ্বাস করতেন সকল অসুখের মূলে রয়েছে "মিয়াসম" নামক একধরনের প্রতিক্রিয়া এবং হোমিওপ্যাথিক ওষুধ এই মিয়াসম দূর করার জন্য কার্যকর। সাধারণত হোমিওপ্যাথিক ওষুধ তৈরি করার জন্য একটি নির্দিষ্ট দ্রব্যকে ক্রমাগত লঘুকরণ করা হয় অ্যালকোহল অথবা পতিত জলে দ্রবীভূত করে। এই লঘুকরণ এতবার করা হয়ে থাকে যে শেষপর্যন্ত এই মিশ্রণে প্রাথমিক দ্রব্যের অণু পরিমাণও অবশিষ্ট থাকে না।[৮]

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জৈবরসায়ন এবং জীববিজ্ঞান সম্পর্কে যে সকল প্রাসঙ্গিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তা হোমিওপ্যাথির বিপরীত।

পরিচ্ছেদসমূহ

ইতিহাস

হোমিওপ্যাথি অ্যালোপ্যাথির ভয়াবহতা দেখেছে,অ্যালেক্সান্ডার বেইডেমনের একটি ১৮৫৭ সালের চিত্রকর্ম, যাতে ১৯ শতকের চিকিৎসার নৃশংসতা পর্যবেক্ষণ করে হোমিওপ্যাথির ঐতিহাসিক চিত্র এবং ব্যক্তিত্ব দেখা যায়।

ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ

হ্যানিম্যান আঠারো শতকের শেষের দিকে মূলধারার ঔষধগুলো অযৌক্তিক এবং অগ্রহণযোগ্য হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন [৯] কারণ এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অকার্যকর এবং প্রায়শই ক্ষতিকারক ছিল। [১০] তিনি কম মাত্রায় একক ওষুধের ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন এবং জীবিত প্রাণীরা কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে একটি নিরপেক্ষ, প্রাণবন্ত দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করেছিলেন। [১১] চিকিৎসা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের ফলাফলটি মূলধারার ঔষধের চেয়ে সাধারণত হোমিওপ্যাথির শুরু হওয়ার সময় প্রচলিত ছিল।

হ্যানিম্যানের ধারণা

স্যামুয়েল হ্যানিম্যান স্মৃতিস্তম্ভ, ওয়াশিংটন ডিসি, "সিমিলিয়া সিমিলিবাস কিউরেন্টার" সদৃশ্য সদৃশ্যকে আরোগ্য করবে।

"হোমিওপ্যাথি" শব্দটি হ্যানিম্যান তৈরি করেছিলেন এবং ১৮০৭ সালে প্রথম মুদ্রণে প্রকাশিত হয়েছিল।[১২]

স্কটিশ চিকিৎসক এবং রসায়নবিদ উইলিয়াম কুলেনের জার্মান ভাষায় একটি মেডিকেল গ্রন্থ অনুবাদ করার সময় হ্যানিম্যান হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে ধারণা করেছিলেন। ম্যালেরিয়া নিরাময়ের জন্য সিনচোনার ব্যবহার সম্পর্কিত কুলেনের তত্ত্ব সম্পর্কে সন্দেহাতীত হলেন, হ্যানিম্যান কী ঘটবে তা খতিয়ে দেখার জন্য বিশেষভাবে কিছু ছাল খেয়েছিলেন। তিনি জ্বর, কাঁপুনি এবং জয়েন্টে ব্যথা অনুভব করেছেন: ম্যালেরিয়ার মতোই লক্ষণগুলি। এ থেকে হ্যানিম্যান বিশ্বাস করেছিলেন, যে সমস্ত কার্যকর ওষুধগুলি থেকে চিকিৎসা করা হয়, সেগুলোই রোগগুলির মতো সুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে লক্ষণ তৈরি করে, প্রাচীন চিকিৎসকদের প্রস্তাবিত "সাদৃশ্য বিধান" অনুসারে। [১৩] অলিভার ওয়েন্ডেল হোমস দ্বারা চিহ্নিত এবং ১৮৬১ সালে প্রকাশিত সিনচোনার ছাল খাওয়ার প্রভাবগুলির একটি বিবরণ লক্ষণগুলি পুনরুৎপাদন করতে ব্যর্থ হয়েছিল।[১৪] হ্যানিম্যানের সাদৃশ্য বিধান একটি আইপ্স ডিক্সিট যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি থেকে প্রাপ্ত হয় না।[১৫] এটিকে হোমিওপ্যাথি নাম দিয়েছ যা আসে, গ্রিকঃ ὅμοιος hómoios, "-সাদৃশ্য" and πάθος páthos, "পদ্ধতি" থেকে।

পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক গবেষনায় দেখা গিয়েছে যে সিনচোনা ম্যালেরিয়া নিরাময় করে, কারণ এটিতে কুইনাইন রয়েছে যা প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপারাম পরজীবীকে মেরে ফেলে যা এই রোগের কারণ হয়; এটি একটি রাসায়নিক ক্রিয়াযা হ্যানম্যানের ধারণার সাথে সম্পর্কিত নয়। [১৬]

১৯ শতক: জনপ্রিয়তা এবং প্রথম দিকে সমালোচনা বৃদ্ধি

বিশ শতকে পুনর্জাগরণ

একবিংশ শতাব্দি

ভারতীয় উপমহাদেশে

ভারত ও বাংলাদেশে বহুকাল থেকেই এই চিকিৎসা চলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভিজ্জ বা সাধারণ রাসায়নিক পদার্থ থেকে কনসেনট্রেট হিসেবে এই ওষুধ তৈরি করা হয় এবং চিকিৎসকরা গাইড বুকের নির্দেশ অনুযায়ী সেগুলি প্রয়োজন মতো লঘুকৃত করেন। বাংলা ভাষায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রচুর বইপত্র আছে এবং এগুলির ভিত্তিতে দেশে এই চিকিৎসা চলছে। ইদানীং দেশের নগর ও শহরে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের জন্য কয়েকটি হোমিওপ্যাথি কলেজ[১৭] প্রতিষ্ঠিত হয়েছে [১৮]

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৯ সালে একটি বিবৃতিতে জানায় যে হোমিওপ্যাথি কোনো বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা নয়।[১৯]

প্রমাণ এবং ফলপ্রসূতা

অনুভূত প্রভাব ব্যাখ্যা

অকার্যকর হওয়া সত্ত্বেও হোমিওপ্যাথি কিভাবে রোগ নিরাময় করতে পারে কিংবা লক্ষণ উপশম করতে পারে, তার কারণ হিসেবে বিজ্ঞান যা বলে [২০]:১৫৫–১৬৭

  • প্লেসবো প্রভাব
  • আলোচনা এর চিকিৎসাগত প্রভাব
  • প্রাকৃতিক নিরাময়
  • অস্বীকৃত চিকিৎসা
  • নন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

সমালোচনা

ক্লিনিকাল ভিত্তিতে যে সকল রোগী সাধারণ চিকিৎসার বদলে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নির্বাচন করেছেন, তাদের সময়মত রোগ নির্ণয় এবং ফলপ্রসূ চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় নি, ফলে অবস্থা আরও গুরুতর হয়েছে।[২১][২২][২৩][২৪] হোমিওপ্যাথির সমালোচকেরা বলেছেন, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণকারী ব্যক্তিরা যথাযথ চিকিৎসা নিতে পারেন নি,যা প্রচলিত চিকিৎসায় সম্ভব ছিল, এবং এর ফলে মৃত্যুও হয়েছে। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক দাবি করেন, প্রচলিত চিকিৎসা রোগকে আরও গুরুতর করবে এবং আরও ভয়াবহ সমস্যার মুখোমুখি করবে। [২৫][২৬] কিছু হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক তাদের রোগীকে উপদেশ দেন ভ্যাক্সিনের পরিবর্তে হোমিওপ্যাথিক nosode ব্যবহার করতে .[২৩][২৭][২৮],যা জৈবিক উপাদান যেমন পুঁজ, রোগাক্রান্ত টিস্যু থেকে তৈরি হয়। যখন হানিম্যান এই পদ্ধতির বিরোধী ছিলেন, কিছু আধুনিক হোমিওপ্যাথিক এটি প্রায়শ ব্যবহার করে থাকেন যদিও এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই।এও জানা যায়,হোমিওপ্যাথরা অ্যান্টি - ম্যালেরিয়াল ওষুধ ব্যবহার করতে নিষেধ করে। এই নিষেধবাণী যারা আক্রান্ত,তাদের বিপদে ফেলেছে, যেহেতু ম্যালেরিয়া পরজীবীর বিরুদ্ধে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ একদম অকার্যকর ।

১৯৭৮ সালে অ্যান্থনি ক্যাম্পবেল , রয়্যাল লন্ডন হোমিওপ্যাথিক হাসপাতালের একজন কনসাল্ট্যান্ট , জর্জ ভিথলকাস এর বিবৃতির কঠোর সমালোচনা করেন, যিনি তার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাকে চালু করতে চেয়েছিলেন। ভিথলকাস বলেছেন, অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সিফিলিস রোগের চিকিৎসা করলে তা পরবর্তীতে সেকেন্ডারি এবং টারশিয়ারি অবস্থায় উন্নীত হতে পারে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র সহ। ক্যাম্পবেল একে দায়িত্বহীন বিবৃতি বলে আখ্যা করে বলেন, এ কথা একজন সচেতনতাবিহীন মানুষকে প্রচলিত ওষুধ গ্রহণে নিবৃত্ত করবে । [২৯]

আমেরিকান জার্নাল অফ মেডিসিন এ Should We Maintain in Open Mind about Homeopathy শীর্ষক একটি আর্টিকেলে প্রকাশিত , মাইকেল বম এবং এডয়ার্ড আর্ন্সট বলেছেন, "হোমিওপ্যাথি বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা চিকিৎসাপদ্ধতির সবচেয়ে নিকৃষ্ট উদাহরণ। এই যুক্তি বহির্ভূত শুধু বৈজ্ঞানিক মতবাদের সাথে মিলে না, তাই নয়, বরং এটি স্ববিরোধীও বটে। যদি হোমিওপ্যাথি সঠিক হয়, তবে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং ফার্মাকোলজির অধিকাংশই বেঠিক।[৩০]

২০১৩ সালে স্যার মার্ক ওয়ালপোর্ট , যুক্তরাজ্যের সরকারি প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হোমিওপ্যাথি সম্বন্ধে বলেন,' বৈজ্ঞানিক ভাবে আমার দৃষ্টিভঙ্গি একদম সুস্পষ্ট; হোমিওপ্যাথি একটি ননসেন্স, অবৈজ্ঞানিক শাখা। সরকারের কাছে আমার উপদেশ, হোমিওপ্যাথিতে কোন বিজ্ঞান নেই। এটির সর্বোচ্চ প্লেসবো এফেক্ট থাকতে পারে। এটি এখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তারা এর পিছনে খরচ করবে কি না।[৩১] তার পূর্বসূরি প্রফেসর জন বেডিংটন বলেছেন, ' আমি হোমিওপ্যাথির ব্যাপারে যা ভাবতে পারি, তা হল পাগলামি। এটির কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আসলে, সকল বৈজ্ঞানিক যুক্তি বলে এটি কোন যুক্তিযুক্ত জ্ঞান নয়। কিন্তু হোমিওপ্যাথি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে।[৩২]


উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে


মন্তব্য করুন