Loading..

উদ্ভাবনের গল্প

রিসেট

০৪ আগস্ট, ২০২১ ১১:৫২ অপরাহ্ণ

দায়িত্ব মাথায় আমার স্বস্থি থাকেনা যদিও তা খ্যাতির বিড়ম্বনায় রূপ নেই।

দায়িত্ব মাথায় আমার স্বস্থি থাকেনা যদিও তা খ্যাতির বিড়ম্বনায় রূপ নেই।

 

আমি খান ইমামুল ইসলাম, সহকারী শিক্ষক ( বিজ্ঞান), গোহালা টি,সি,এ,এল উচ্চ বিদ্যালয়, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ। আমার বিদ্যালয়টি গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুর উপজেলার পুরাতন বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি। বিদ্যালয়ের সার্বিক দিক মোটামুটি ভাল কিন্তু বিদ্যালয়ে কোন রকম কো-কারিকুলাম কার্যক্রম কিছুই হয়না। বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান বলতে যা হয় তা নিতান্তই দায় সাড়া ছাড়া আর কিছুই নয়। শিক্ষায় আনন্দ নেই বলে ছেলে-মেয়েরা স্কুল থেকে পালায়।

এবার তাহলে আমার কথায় আসা যাক, আমি বিদ্যালয়ে যোগদান করি ২০১৫ সালের জানুয়ারী মাসে। আমি যোগদানের পর থেকেই স্কুলের বিভিন্ন কার্যক্রম দেখে মর্মাহত হই, বিশেষ করে দেখি ছেলে মেয়েরা স্কুল পালায়। আর পালাবে না কেন স্কুলের প্রতিদিনের গদবাধা পড়াশোনা আর কয়দিন ভাল লাগে।

আমি চিন্তা করলাম একটু পরিবর্তন করা যায় কিনা, আমি বিজ্ঞান বিভাগের ছেলেমেয়েদের ডেকে আলোচনা করলাম তোমরা নিজের হাতে এবং বাড়ির অব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র দিয়ে কে কী বানাতে পারো। আমি পরের দিন ইউটিউব থেকে কিছু সহজে তৈরি করা যায় এমন ভিডিও গুলো ডাউনলোড করে স্কুলের কম্পিঊটার ও প্রজেক্টরের মাধ্যমে ছেলে মেয়েদের দেখিয়ে উদ্ভুদ্ধ করলাম। ২-৩ দিনের মধ্যে ছেলে মেয়েরা তা রেডি করে ফেললো।  এবার আমি একটি দিনক্ষণ ধার্য করে প্রদর্শনীর জন্য ডেকোরেটর ভাড়া করে স্টল তৈরি করে সবাই কে দেখার সুযোগ করে দিলাম। সবাই দেখে খুব খুশি হল। প্রথমবার শুধু বিজ্ঞান বিভাগের ছেলে-মেয়েরা ৪৫ টি প্রজেক্ট তৈরি করলেও পরের বছর স্কুলের অন্যান্য বিভাগের ছেলে-মেয়েরা যোগ দেওয়ার তা বেড়ে দাঁড়াল ১৫২ টিতে।  আমি ভাল প্রজেক্ট তৈরীর জন্য ছেলে-মেয়েদেরকে পুরস্কৃত করলাম এবং অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের জন্য দিলাম সৌজন্য পুরষ্কার । এটা দেখে শিক্ষক, শিক্ষার্থীর এবং অভিভাবক প্রত্যেকেই খুব খুশি হল এবং বলল পুর্বে এই ধরনের আয়োজন কখনই হয়নি।

এরপর আমি স্কুলের বিজ্ঞানাগারের জন্য স্কুল ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষকের বরাবর একটি আবেদন করলাম এবং বিজ্ঞানাগারের দৈন্যদশা তুলে ধরলাম। আমাদের স্কুলে একটি বিজ্ঞানাগার থাকলেও তা ব্যবহার উপযোগী ছিলনা। কারণ যন্ত্রপাতীগুলো বেশিরভাগই ভাঙ্গাচোরা এবং রাসায়নিক দ্রব্যাদি যা ছিল তা বহু বছর আগে মেয়াদ উত্তীর্ণ। স্কুল ম্যানেজিং কমিটি বিজ্ঞানাগার বাবদ ৫০,০০০/= টাকা বরাদ্দ দিলেন এবং আমি পরের দিনই প্রধান শিক্ষকের সাথে করে ঢাকা গেলাম এবং সেখান থেকে অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে এনে পরের দিন থেকেই ছেলে-মেয়েদের হাতে কলমে ব্যবহারিক জ্ঞান দান করতে থাকি। আগে যেখানে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী ছিল ১০-১২ জন পরের বছর তা বেড়ে দাড়াল প্রায় ৩০ জনে

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাস, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তরের আদেশ পেলাম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে হবে। শিক্ষার্থীদেরকে নিয়ে কবিতা আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কন ইত্যাদির আয়োজন করতে হবে। আমার মনে পড়ে গেল ছাত্র জীবনের দেওয়ালিকার কথা। আমি বিষয়টা কয়েকজন শিক্ষকের সাথে আলোচনা করলাম এবং অবশেষে হেড স্যার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যার  এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। পরের দিনই একজন রাজমিস্ত্রী ডেকে স্কুলের কাঠ দিয়ে দেওয়ালিকার জন্য একটি বোর্ড তৈরি করলাম এবং সেই সাথে ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে কবিতা, ছোট গল্প, কৌতুক ইত্যাদির জন্য লেখা আহ্বান করলাম। দুই দিন হতে না হতেই ছেলেমেয়েদের ব্যাপক সাড়া দেখে সত্যিই আমি অভিভূত হলাম। এতো লেখা যে আমি কার লেখা বাদ দিয়ে কার লেখা প্রকাশ করি। ছেলেমেয়েদের দিয়েই দেওয়ালিকার জন্য বিভিন্ন ছবি আঁকালাম এবং এদের সাথে করেই প্রথমবার সমস্ত দেওয়ালিকার কাজ শেষ করলাম। যতটুকু জেনেছি কোন দিন কেউ এসবের উদ্যোগ নেয়নি। এর পর থেকে শুধু নির্দেশনা দিয়েছি ছেলেমেয়েরা নিজেরাই এ কাজ সম্পন্ন করেছেআমি এ কাজে ছেলে মেয়েদের মাঝে নবজাগরণ সৃষ্টি করতে পেরেছি। ঐ সালের জুন মাসেই আমার উদ্যোগেই প্রথম স্কুল ম্যাগাজিন প্রকাশ করে যা দেওয়ালিকার লেখাগুলোর মধ্য হতে নির্বাচিত লেখাগুলো নিয়ে। আমি ঐ স্কুল ম্যাগাজিনের সম্পাদক প্যানেলের সদস্য ও একমাত্র উপদেষ্টা ছিলাম।

 

এরপর আসি আইসিটি সংক্রান্ত বিষয়াবলি নিয়ে। স্কুলের এমন অবস্থা কম্পিউটার আছে ২-৩ টি কিন্তু একটিও সচল নয়। এখন দেখি বিদ্যালয়ের সকল অফিসিয়াল চিঠি বাইরের কম্পিউটারের দোকান থেকে কম্পোজ করে আনে। আমি উদ্যোগ নিয়ে ঐ বছরই স্কুলের ফান্ড থেকে টাকা নিয়ে প্রায় লক্ষাধিক টাকায় ২টি ল্যাপটপ আমি ও কম্পিউটার শিক্ষক ফরিদপুর থেকে কিনে আনি এবং সেই থেকে প্রায় সমস্ত কাজকর্ম আমি নিজেই করি। ফরম পূরণ, রেজিস্ট্রেশন ও উপবৃত্তির কাজসহ যত কাজ আছে আমি সমস্ত কাজ নিজেই করি। আগে অফিসিয়াল কাজের জন্য হেড স্যার শিক্ষা অফিস থেকে নানা রকম কথা শুনতো। এখন হেড স্যার বলার আগেই আমি সব করে ফেলি। কাজ করতে করতে কখন যে মাঝরাত হয়ে যায় আমি মাঝে মাঝেই টের পায়না। এখন স্কুল সমস্ত কাজের জন্য আমার উপর নির্ভর করে যা আমার জন্য এখন খ্যাতির বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও আমি কাজকে খুবই উপভোগ করি। তবে আমি বিশ্বাস করি মানুষ চেষ্টা করলেই পারে যদি তার পরিবর্তন হওয়া বা পরিবর্তন করার মানসিকতা থাকে।  

মন্তব্য করুন