সহকারী শিক্ষক
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ ০৩:০৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মোহাম্মাদ আবু সাইদঃ শিক্ষকদের মাঝে এমন অনেকে আছেন যাদের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি পছন্দ করে, নিজের আদর্শও বলে মনে করে। আবার এমন শিক্ষক আছেন যাদের দেখলে তারা বিরক্ত হয়, যমের মত ভয় পায়, পড়া না বুঝলেও সাহস করে কিছু জিজ্ঞেস করে না। প্রিয় শিক্ষক হতে গেলে কি কি গুনাবলী প্রয়োজন?
জীবনের ভাবনা
এখানেও একজন ভাল শিক্ষকের বেশ অনেকগুলি গুনাবলী নিয়ে উত্তরের মাধ্যমে আলোচনা করবো।
শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে নেয়া দরকার, শিক্ষকতা কোনো পেশা নয়; এটা ব্রত। শিক্ষকতার প্রতি যদি আপনার ভালোবাসা না থাকে, তাহলে সেটি আপনার নিকট পেশা ছাড়া আর কিছুই নয়। সবাই ভালো ছাত্র হয় না, তবে সবাই ভালো মানুষ হতে পারে’- শিক্ষার লক্ষ্য হলো ভালো মানুষ তৈরি করা। আর মানুষ (ভালো মানুষ) গড়ার মূল দায়িত্ব শিক্ষকগণের উপর ন্যস্ত। যিনি শিক্ষক তিনি সর্বস্থানেই একজন শিক্ষক- এ কথাটা স্মরণ রাখা দরকার। শিক্ষককে অবশ্যই একজন আদর্শ শিক্ষক হতে হবে। আর আদর্শ শিক্ষক হতে হলে কতগুলো বিষয় নিজের মাঝে গড়ে তুলতে হবে- ক) সুন্দর বাচনভঙ্গি; খ) আকর্ষনীয় উপস্থাপনা কৌশল; গ) সুনির্দিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানের গভীরতা; ঘ) দূরদর্শীতা, ঙ) কৌশলী; চ) বন্ধুবাৎসল্য; ছ) কাজের প্রতি ভালোবাসা; জ) অপরের মতামতের প্রতি গুরুত্ত দেয়া; ঝ) ভালো শ্রোতা হওয়া; ঞ) পারষ্পারিক শ্রদ্ধাবোধ; ট) আদর্শবোধে উজ্জীবিত হওয়া; ঠ) সহনশীলতা; ড) পারষ্পারিক সহযোগিতার মনোভাব; ও ঢ) জ্ঞানপিপাসু। এ ছাড়াও অনেক গুণাবলী আছে যেগুলো নিজের মধ্যে সন্নিবেশ এবং চর্চা করতে হবে। আপনি যদি শিক্ষকতাকে ভালোবাসেন তাহলে এটা আপনার জন্য উপযুক্ত এবং যথেষ্ট। কীভাবে আপনি আরও ভালোভাবে শিখন-শিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন প্রতিনিয়ত আপনাকে তা ভাবতে হবে। শিক্ষকতা একটা সেবামূলক কাজ। তাই অর্থের সাথে এর তুলনা না করাই শ্রেয়। বলা হয়ে থাকে যে, “শিক্ষককে দেখেই মনে হবে, তাঁর মনে অপার শান্তি বিরাজ করছে।” কিন্তু নানা প্রতিকুলতার মাঝে হয়ত কখনও কখনও তাঁদের মূখ ম্লান হয়ে যায়। তাঁদের মুখের হাসি ধরে রাখতে কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নেয়াটা যেমন জরুরি; তেমনি সমাজের মানুষেরও একটা দায়িত্ব আছে। বিদ্যালয় আমাদের সমাজকে গড়ে তোলে, সংরক্ষণ করে। তাই আমাদের উচিত বিদ্যালয়কে সাহায্য করা। সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুই ধরনের মানুষের প্রয়োজন কখনই শেষ হবে না- এক) শিক্ষক, দুই) চিকিৎসক। শেষ করছি স্যার মোজাফফর আহমেদের একটি লেখা থেকে দুটি লাইন তুলে ধরে- “শিক্ষকতা একটা ধর্ম, একে জীবনে ধারণ করতে হয়; জ্ঞানীমাত্রই শিক্ষক নন"।
একজন আদর্শ শিক্ষক মেধা ,মনন , আচরণ , বচন ও বসনে হবেন অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব । কারণ , শিক্ষক শুধু বই ভিত্তিক জ্ঞানের শিক্ষক নন , তিনি মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে বিবেচিত । আদর্শ শিক্ষক সমাজ সংলগ্ন ও সামাজিক চেতনায় সম্মৃদ্ধ একজন ব্যক্তিত্ব । শিক্ষার্থীর সামনে তিনি উপস্থিত করেন চলমান সমাজকে নানারুপে ও নানা মাত্রায় । আমাদের অর্জিত জ্ঞান, সমসাময়িক প্রায়গিক কারণে । অর্জিত জ্ঞান সমাজ প্রয়োজনের প্রাসঙ্গিক না হলে সে জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো যৌক্তিকতা নেই । আদর্শ শিক্ষক সমাজ সচেতন হোউয়ার সুবাদে রাজনৈতিক সচেতন হবেন । তবে সক্রিয় রাজনীতি পরিহার করবেন । আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব এর সঠিক পাঠক । একজন আদর্শ শিক্ষক একজন ভালো মনস্তত্ত্ববিদও খ্যাত নামা শিক্ষাবিদ গিলবার্ট হায়েটের মতে , আদর্শ শিক্ষকের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য :শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর মমতা; বিষয়ের প্রতি অনুরাগ এবং নিজ পেশার প্রতি অনুরাগ । একজন আদর্শ শিক্ষক হবেন তিমির বিনাশী । ছাত্র দের মনের তমিস্র দুর করে তাদের হৃদয়ে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে দিবেন । একজন শিক্ষক ভালোভাবেই জানেন কোন উপায়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালে তারা বিষয়টিকে খুব সহজই গ্রহণ করতে পারবে এবং কোনো ধরনের বিরক্ত লাগবে না। তাই তিনি পড়ানোর মাধ্যমটিকে আনন্দময় করে তোলেন। এতে করে ছাত্রছাত্রীরা অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং পড়ায় মনোযোগী হয়। একজন আদর্শ শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের সাথে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন তৈরি করে ফেলেন। যার ফলে ছাত্রছাত্রীরা যেকোনো সমস্যায় শিক্ষকের কাছে চলে যান এবং তিনি তা খুব সহজ উপায়ে সমাধান করে দেন। শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের একটি নির্দিষ্ট উপায়ে পড়িয়ে থাকেন এবং সবসময় উৎসাহ দিয়ে থাকেন। তিনি ভালো করে জানেন যে উৎসাহ ছাড়া একজন শিক্ষার্থী ভালোভাবে এগোতে পারে না। এ কারণে ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে তিনি তাদের উৎসাহ দিয়ে থাকেন সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে। একজন আদর্শ শিক্ষক নিজেকে সবসময় প্রস্তুত রাখেন। ছাত্রছাত্রীদের যেকোনো সমস্যার সমাধানে যেন তিনি এগিয়ে আসতে পারেন সে বিষয়ে সতর্ক থাকেন এবং তাদের সার্বিক প্রয়োজনে সাহায্য করে থাকেন মুল ব্যাপরটা হচ্ছে কমিউনিকেশন। এ কাজটা অনেকে করতে পারেন না। ছাত্রদের স্বপ্নটা জাগিয়ে তুলতে পারেন। আমি মনে করি শিক্ষক যখন শিখাবেন তখন শিক্ষার্থী হয়ে যাবেন।ক্লাশ হবে অংশগ্রহনমূলক,লাইভ,সাউন্ড। প্রিয় শিক্ষক হতে হলে তার আচরন হতে হবে বন্ধুসুলভ.....
প্রিয় শিক্ষকের মুকুট অর্জন বড়ই কঠিন বিষয় বটে l শিক্ষকতা খুবই কঠিন ও ধৈর্যশীল একটি পেশা। তাদের একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীদের সামলাতে হয়, পড়াতে হয়, শিক্ষার্থীদের দুষ্টুমি সহ্য করে সামনে এগুতে হয়। তা সত্ত্বেও তিনি অনেকসময়ই হতে পারেন না প্রিয় শিক্ষক l প্রিয় শিক্ষক হবার কয়েকটি উপায় জেনে নেয়া যাক আজ :
• শিক্ষার্থীদের সাথে সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে, তারা যেন সবসময় তাদের যে কোনো সমস্যার কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, সেরকম ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
• সবার মধ্যেই সমান দক্ষতা আছে, একটু পরিশ্রম করলে সকলেই সাফল্য অর্জন করতে পারবে। যারা খুব বেশি সাফল্য অর্জন করতে পারেনি তাদের কে সবসময় আরও বেশি অনুপ্রানিত করতে হবে, যেন তারা আরও কঠিন পরিশ্রম করে।
• কিছু নিজস্ব নিয়ম তৈরি করে এবং সেগুলো শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেয়া যে নিয়মগুলো শিক্ষার্থীদের মানতেই হবে, মানলে পুরস্কার এবং সেগুলো পালন না করা হলে কি শাস্তির ব্যবস্থা হতে পারে ।
• উদাহরণ দিয়ে পড়া বজাহ্তে হয়, শিক্ষার্থীরা এই উদাহরনগুলো খুব পছন্দ করে।এই উদাহরনগুলো তাদেরকে সেই প্রসঙ্গটি মনে রাখতে সাহায্য করে।
• সঠিক একটি অনুশীলনী পদ্ধতি ফলো করা উচিত এবং তা শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেয়াও কর্তব্য।
• ক্লাসের মধ্যে সর্বদা সৃজনশীল পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে গল্প করা থেকে বিরত রাখার এটাই সেরা উপায় !
• শিক্ষকদের, ছাত্রছাত্রীদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ থেকেও নিজের দৃঢ়তা বজায় রাখতে জানতে হয় । যেন তারা ক্লাস উপভোগ করার পাশাপাশি ক্লাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখে।
• সবসময় একই ধরণের হোমওয়ার্ক না দিয়ে এসাইনমেন্ট ও গ্রুপ প্রজেক্ট করতে দিলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কখনো কমবে না। আবার খুব বেশি প্রজেক্ট বা এসাইনমেন্ট শিক্ষার্থীদের জন্য ঝামেলা বা বিরক্তি কারন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
• মুখস্থ পড়া ধরার পরিবর্তে সাধারণ সৃজনশীল ছোট ছোট প্রশ্ন করে মজার করে তুলতে বিষয়টি। •সবার সামনে শিক্ষার্থীদের যে কোন ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রশ্ন করা অনুচিত।
• শিক্ষার্থীর ভুলের জন্য তাকে পুরো ক্লাসের সামনে বকা না দিয়ে, ভুলটি বুঝিয়ে তার ভুল শুধরানোর সুযোগ করে দিতে হয়।
• সবসময় শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেকে একজন রাশভারী মানুষ হিসেবে প্রমান না করে ক্লাসে মাঝে মাঝে প্রাসঙ্গিক রসিকতার প্রয়োজন l তবে তা যেনো ব্যক্তিত্বকে ক্ষুন্ন না করে।
মোহাম্মাদ আবু সাইদ
সহকারী শিক্ষক
দেবোত্তর দাখিল মাদরাসা
আটঘরিয়া, পাবনা