Loading..

শিক্ষায় অগ্রযাত্রা

রিসেট

২৩ এপ্রিল, ২০২২ ০১:২৫ অপরাহ্ণ

ডিজিটাল শিক্ষায় ‘কানেক্ট’ ও ‘শিক্ষক বাতায়ন’ নতুন অগ্রযাত্রা

স্বাধীনতার ৫০তম বছরে এসে ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রায় অর্জিত সাফল্য দেশকে নিয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার দ্বারপ্রান্তে। নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন এবং সহজেই নাগরিক সেবা প্রাপ্তির প্রত্যেকটি ক্ষেত্র ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে।  দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা পৌঁছে গেছে। শিক্ষাব্যবস্থাও এর বাইরে নেই। ডিজিটাল শিক্ষা সেবা প্রদানে অনলাইন ভিত্তিক সে রকম দুটি প্ল্যাটফর্মের নাম ‘কানেক্ট’ এবং ‘শিক্ষক বাতায়ন’। যেগুলো দেশের শিক্ষক সমাজ ও কিশোর সমাজকে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত করে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করার অনন্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।

বাংলা ভাষাভাষী কিশোর-কিশোরীরা বিশ্বের যে কোনো কোনো বসে অনলাইনে ‘কিশোর বাতায়ন’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে সক্ষম। এটি তরুণদের জন্য অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা করে। এর অভীষ্ট হলো শিক্ষা এবং কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরী এবং যুবকদের ভবিষ্যত দক্ষ কর্মী হিসেবে রূপান্তর করা। আর এর লক্ষ্য ৩৬ মিলিয়ন কিশোর-কিশোরীদের যুক্ত করা যাতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং দক্ষতা উন্নয়ন করে তারা দেশের অগ্রগতি তথা এসডিজি অর্জনে অবদান রাখতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী করে তুলতে বিভিন্ন বিষয় দিয়ে সাজানো হয়েছে ‘কিশোর বাতায়ন’। konnect.edu.bd লিংকটির মাধ্যমে ওয়েবপেজটিতে প্রবেশ করতে হবে এবং যুক্ত হওয়া যাবে।

আঁকা ছবির মাধ্যমে হোমপেজসহ বিভিন্ন আইকন তুলে ধরা হয়েছে কিশোর বাতায়নে। অক্ষর পড়তে না পারলেও শিশুরা ছবি দেখে বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা পাবে। এটির ইউজার ইন্টারফেসটি কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। হোম পেজের ওপর দেখা যাবে ‘খবরদার’, ‘আইডিয়া বক্স’, ‘লগইন’সহ তিনটি মেন্যু। এছাড়া রয়েছে ‘কমিকস’, ‘আপলোড’, ‘আরো চাও’, জীবন দক্ষতা কিংবা ‘চলচ্চিত্র’র মতো মজার মজার সব অপশন। ওয়েবসাইটের একদম নিচে রয়েছে যোগাযোগের ঠিকানা এবং লিংকস অপশনে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষামূলক প্রয়োজনীয় সব লিংক। ‘জীবন দক্ষতা’ বিভাগে রয়েছে দারুণ সব বিষয়।

কিশোর বাতায়ন

কিশোর বাতায়নের চলচ্চিত্র বিভাগটি সাজানো হয়েছে কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী করে। এখানে রয়েছে চমৎকার সব কার্টুন ও চলচ্চিত্র। ডাউনলোড না করেই স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে দেখা যাবে এসব । কিশোর বাতায়নে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের প্রোফাইল সাজাতে পারবে। কে কয়টি বই পড়েছে বা কয়টি ভিডিও বা ছবি আপলোড করেছে তাও দেখা যাবে। এ ছাড়া বিভিন্ন কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করলে সেগুলো প্রোফাইলে যুক্ত হবে। ‘কানেক্ট’ প্রতিবছর অনলাইন ও অফলাইন বিভিন্ন শিক্ষামুলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এর মধ্যে আমার জেলা আমার অহংকার, বইয়ের পাতায় প্রদীপ জ্বলে-বইয়ের পাতা স্বপ্ন বলে, কৈশোরে বঙ্গবন্ধু/আমার কৈশোর/আমার স্বাধীনতা এগুলো অন্যতম। এছাড়া ‘ফুলবন্ধু’ নামে প্রতি বছর থিম্যাটিক কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কানেক্ট। আয়োজিত এসব প্রতিযোগিতা এপর্যন্ত ২০,০০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে প্রায় ১ লক্ষ কিশোর-কিশোরী।

তরুণদের সৃজনশীলতাকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে এটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ‘কানেক্ট’। বৈশ্বিক মহামারির এই সময়ে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে কিশোর বাতায়নে যুক্ত হয়ে নিজেদের সময়কে কাজে লাগাতে পারছে। অনলাইনে কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে। নিজেদের সৃজনশীল কাজগুলো এখানে আপলোডের সুযোগ তাদের অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। গ্রামের কিশোর-কিশোরীরা শহরের শিক্ষার্থীদের তৈরি গল্প, কবিতা, গান উপভোগ করতে পারছে। আবার শহরের তরুণরা গ্রামে উপভোগ্য বিষয়গুলো এই পোর্টাল থেকে জানতে পারছে। মাদকের ভয়াবহতা, কিশোর অপরাধ, সাইবার অপরাধ, সাইবার বুলিং ও জঙ্গিবাদ কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এই পোর্টাল। ছবিসমৃদ্ধ এই বাতায়ন শিশুরাও সহজে ব্যবহার করতে পারছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তরুণদের অবিরাম সেবা দিয়ে যাচ্ছে ‘কানেক্ট’। তার স্বীকৃতিসরূপ ‘ডাব্লিউএসআইএস পুরস্কার ২০২০’-এর চূড়ান্ত পর্বে মনোনীত হয়েছিল কিশোর বাতায়ন। আইসিটিক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার এটি।

শিক্ষকদের প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে আধুনিক, সময়সাশ্রয়ী এবং মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ ও যুগোপযোগী করে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এটুআইএর যৌথ উদ্যোগে ২০১৩ সালের ১৬ই মে শিক্ষক বাতায়নের যাত্রা শুরু হয়। ‘শিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে শিক্ষক’ স্লোগানে ৯ লক্ষ শিক্ষককে এ বাতায়নে অন্তর্ভুক্তকরণের লক্ষ্যে এই ওয়েবসাইট সাজানো হয়েছে। শিক্ষকদের জন্য তৈরি ডিজিটাল বিষয়বস্তু বা কনটেন্টভিত্তিক এ ওয়েবসাইটে www.teachers.gov.bd এই লিংকের মাধ্যমে এতে প্রবেশ করা যাবে।

শিক্ষক বাতায়ন প্রশিক্ষণের প্রচলিত ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। পূর্বে একজন শিক্ষকের কয়েক বছরে একবার প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার সু্যোগ হতো। কিন্তু এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বর্তমানে যে কোন সময় যে কোন প্রান্তে বসে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারেন তারা। স্কুল কলেজের সকল বিষয়ের উপর কাস্টমাইজযোগ্য ৯৫৩টি মডেল কন্টেন্ট আছে শিক্ষক বাতায়নে। এই কন্টেন্টগুলোর অফঅলাইন সংস্করন সারাদেশে স্কুল কলেজগুলোতে বিতরণ করা হয়েছে। এতে করে ইন্টারনেট সংযোগবিহীন অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বেশ লাভবান হয়েছে। বর্তমানে শিক্ষক বাতায়নে সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের উন্নতমানের ডিজিটাল কনটেন্ট রয়েছে এই পোর্টালে।

মোটকথা, এই পোর্টাল সহকর্মীদের সাথে শিক্ষা উপকরণ ও বিভিন্ন ধরনের কন্টেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের শিক্ষন পদ্ধতির ফাঁক কমিয়ে আনতে সক্ষম। ২০১৫ সালে সম্মানজনক ডাব্লিউএসআইএস পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পায় ‘শিক্ষক বাতায়ন’।

তরুণ সমাজকে কাজে লাগিয়ে আমরা যদি সত্যিই দেশকে এগিয়ে নিতে চাই তাহলে অবিলম্বে মানবসম্পদের ওপর বিনিয়োগ করতে হবে। শিক্ষাখাতে বরাদ্দের সম্পূর্ন অংশ যাতে সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় সেই পদক্ষেপ নিতে হবে। বলা হয় ডিজিটাল দুনিয়ায় শেষ সীমা বলে কিছু নেই। তাই ‘কানেক্ট’ ও ‘শিক্ষক বাতায়ন’সহ বিভিন্ন শিক্ষামূলক পোর্টালকে কীভাবে আরো আকর্ষণীয় ও সহজ করে সাজানো যায় তার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের একজন শিক্ষক-শিক্ষার্থীও যাতে ডিজিটাল সেবার বাইরে না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে। তবেই গড়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বনির্ভর ও আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ।

মন্তব্য করুন