Loading..

প্রকাশনা

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১: মহাকাশে বাংলাদেশ
০৭ জুন, ২০২২

 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১: মহাকাশে বাংলাদেশ

 

প্রাথমিক কার্যক্রম:

আজ বিশ্বের প্রায় সকল উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্রের নিজস্ব উপগ্রহ রয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখা, টেকসই প্রযুক্তি ধারাবাহিক ও অপরদেশের উপর নির্ভরশীলতা কমানো প্রভৃতি কাজের জন্য একটি দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট প্রয়োজন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর মোকাবেলার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঝুঁকির ফলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি পিছিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বৃদ্ধি এবং দেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিজস্ব স্যাটেলাইট ব্যবস্থা। উন্নত রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও মহাশূন্যে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে নিজস্ব টেলিযোগাযোগ খাতে সম্ভাবনার নতুন মাত্রা উন্মোচন করার প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশ অনুভব করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (এসপিপি) এবং ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিআর) বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করে।

 

প্রকল্প অনুমোদন:

দেশের প্রথম স্যাটেলাইট স্থাপনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে  বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণকমিশন (BTRC) ২০০৮ সালের এপ্রিলে একটি কমিটি গঠন করে, পরবর্তীতে  ২০১০ সালে জানুয়ারিতে কমিটি পুনর্গঠন করা হয় । এই কমিটি আইটিসি (ITU) এর কাছে 1020 E ও 690 E এর জন্য ইলেকট্রনিক ফাইল, কোঅর্ডিনেশন রিকোয়েস্ট (CR) নোটিফিকেশন প্রভৃতি সাবমিট করার মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পাদন করে। বিটিআরসি (BTRC) আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (ITU) কাছে কক্ষপথের স্লট ১০২ পূর্ব-এর বরাদ্দের জন্য অনুরোধ জানায়। নিজস্ব উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য বাংলাদেশ চেয়েছি কক্ষপথের স্লট ১০২ পূর্ব। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবসায়িক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ইস্যু প্রভৃতি বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য ওই বিশেষ স্লট বরাদ্দের ব্যাপারে বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশ আপত্তি জানায়। উল্লেখ্য যে, ITU-এর প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্রকে তাদের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য ITU-এর নিয়মকানুন অনুসরণ করতে হয় । গঠিত কমিটি এ ব্যাপারে ITU-এর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করে সব ধরনের দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করতো ।

স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বিটিআরসি "Preparatory functions and Supervision in Launching a Communication and Broadcasting Satellite”  শিরোনামে একটি প্রকল্প প্রণয়ন করে, যা ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয় । প্রকল্পের মেয়াদ ০১ জুলাই ২০১১ থেকে ৩০ জুন ২০১৫ পর্যন্ত এবং প্রকল্পটি আনুমানিক ব্যয় ৮,৬৮১.৫১ লক্ষ টাকা ধরা হয় । যেহেতু ITU এর কর্তৃক কক্ষপথের অবস্থান ও ফ্রিকুয়েন্সি বরাদ্দ প্রক্রিয়া খুবই জটিল এবং বাংলাদেশ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন কার্যক্রমে পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকায়, প্রাথমিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করার জন্য বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করে।  সে মোতাবেক যথাযথ নিয়ম ও বিধি অনুসরণ করে ২০১২ সালের ২৯ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান Space Partnership International (SPI) কে এই প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে  নিয়োগ দেয়ো হয়।

এরপর ২০১৩ সালে BTRC রুশ-ইন্টারস্পুটনিক-এর সঙ্গে চুক্তি করে ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব কক্ষপথের স্লট ভাড়া নেয় । এই চুক্তির মূল্য ছিল ২২১ কোটি টাকা । ১৫ বছর এই স্লট ব্যবহার করতে পারবে বাংলাদেশ । বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি। (যুগান্তর)  ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব ছাড়াও বাংলাদেশ চেয়েছিল ৬৯ ডিগ্রি পূর্ব এবং ১৩৫ ডিগ্রি পূর্ব। স্লট বরাদ্দের চুক্তির পর বাংলাদেশের দরকার ছিল একটি উপগ্রহ । এ উদ্দেশ্য অর্জনে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট নির্মাণের জন্য  ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর ফরাসি সংস্থা থ্যালেস অ্যালিনিয়া (Thales Alenia Space) এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ।   

 

উৎক্ষেপনের ইতিকথা:

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ১ম বাংলাদেশী জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন ও ব্রডকাস্টিং স্যাটেলাইট । ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে প্রকল্পটি শেষ হবার কথা ছিল। ওই তারিখের জন্য আরিন্নিপেস (Ariane space)  থেকে দৃঢ় নিশ্চয়তা না পাওয়ার পর বিটিআরসি আরিনে ৫ এর পরিবর্তে ফ্যালকন ৯ লঞ্চ ভেহিকল বেছে নেয় । প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে ২০১৮ সালের ১১ মে-এর পূর্ব পর্যন্ত এই উৎক্ষেপণ আট বার বিলম্বিত হয়। প্রথম উৎক্ষেপন রকেটের নতুন ব্লক- ৫ মডেলটি ব্যবহার করা হয়। প্রথমে স্যাটেলাইটটি বঙ্গবন্ধু-১ Arianespace -এর আরিনে ৫ (Ariane 5 ECA) কর্তৃক উৎক্ষেপনের কথা থাকলেও চুক্তির তারিখ সংক্রান্ত জটিলতায় পরে ব্যাকআপ লঞ্চ স্পেসএক্স (SpaceX) মাধ্যমে উৎক্ষেপনের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।

মূলত এটি ১০ মে উৎক্ষেপন করার কথা ছিল, কিন্তু কিছু কারিগরি ত্রুটির জন্য উৎক্ষেপনের তারিখ ১দিন পিছিয়ে যায়। অবশেষে ২০১৮ সালের ১১ মে আমেরিকার মহাকাশ পরিবহণ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স-এর তৈরি রকেট ফ্যালকন ৯ এর মাধ্যমে কেনেডি স্পেস সেন্টারের কেপ কার্নিভাল লঞ্চ প্যাড (Cape Carnival launching pad) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় দুপুর ০৪ টা ১৪ মিনিটে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপন করা হয়। উল্লেখ্য এই কেপ কার্নিভাল লঞ্চ প্যাড থেকে গত বছর একটি কোরিয়ান স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয় । ফ্যালকন 9 ব্লক 5 মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্স দ্বারা পরিকল্পিত এবং উৎপাদিত একটি two-stage-to-orbit (TSTO) or two-stage rocket দুই ধাপের একটি রকেট উৎক্ষেপেন বাহন, যা ফ্যালকন 9 এর পঞ্চম সংস্করণ।  স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করার পর বাংলাদেশ তা থেকে পরীক্ষা সিগন্যাল পেতে শুরু করে ১২ মে ।

 

গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন:

এটি বাংলাদেশ সরকারের একটি মেগা প্রকল্পটি যা  যৌথভাবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), যু্ক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল বাস্তবায়ন করছে। স্যাটেলাইটটি কক্ষপথের গতিবেগ অর্জনের জন্যে এতে পৃথক দুটি পরিচালন অংশ রয়েছে। আলাদা মঞ্চই প্রদক্ষিণভাবে ইঞ্জিন সরবরাহ করে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পরিচালনা করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার সরকার মালিকানাধীন বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানিলিমিটেড (bcscl) গঠন করে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১ এর উৎক্ষেপণ পরবর্তী  কার্যক্রম পরিচালনা, স্থল স্টেশন থেকে উপগ্রহকে নিয়ন্ত্রণ করা, বিপণন ও বিক্রয় সেবা ইত্যাদির জন্য কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৭ সালের ১০ই আগস্ট অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের ১ম বৈঠকের মাধ্যমে কোম্পানিটি যাত্রা শুরু করে।  ২০২০ সালে ১৬ আগস্ট এই কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (bscl) রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, ফ্লোরিডার মেরিট দ্বীপের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে বঙ্গবন্ধু-১ এর যাত্রা শুরু হয়। স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ ও নেটওয়ার্ক অপারেশনের জন্য বাংলাদেশের গাজীপুরের তেলীপাড়ায় একটি গ্রাউন্ড স্টেশন এবং রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় একটি ব্যাকআপ গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি করা হয়। স্যাটেলাইট এই দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যা প্রাথমিক এবং ব্যাক-আপ সাইট অপারেশন এবং কন্ট্রোল সেন্টারগুলোর জন্য ব্যবহৃত হয় । বঙ্গবন্ধু-১ এর উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী মহাকাশ সৌভ্রাতৃত্বের ৫৭তম গর্বিত সদস্য হয়ে উঠে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি অবশ্যই গৌরবের সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

ডিজাইন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট:

থ্যালাবাস 4000B2 প্ল্যাটফর্মের উপর ভিত্তি করে থালেস আলেনিয় স্পেস দ্বারা উন্নত, বিডি-1 উপগ্রহের একটি লঞ্চ ভর আছে 3, 500kg. এর মধ্যে রয়েছে ব্যাটারির সঙ্গে দু’টি স্থাপনার সৌর আররশ্মি এবং ১৫ বছরের একটি নকশার আয়ু । 2015 নভেম্বর-এ, বিডি-১ স্যাটেলাইটের নকশা, উৎপাদন, এবং টেস্টিং সার্ভিসসহ কারাপরিদর্শক ব্যবস্থা প্রদানে থালেস আলনিয়া স্পেস প্রাইম কন্ট্রাক্টর নির্বাচিত হয় । চুক্তিভিত্তিক পরিধি আরও রয়েছে গ্রাউন্ড সেকশনের উন্নয়ন । বিডি-১ উপগ্রহের কমিউনিকেশন মডিউল সংযুক্তিকরণের কাজ চালানো হয় ফ্রান্সের তুরিনে অবস্থিত থালেস অ্যালজেনিয়া স্পেসের প্ল্যান্টে । বিডি-১ উপগ্রহের ক্রিটিক্যাল ডিজাইন রিভিউ (CDR) শেষ হয়েছিল 2017 জানুয়ারি । এই উপগ্রহের জন্য সার্ভিস মডিউল নির্মিত হয়েছিল কান-এ এবং স্যাটেলাইট মিলন শেষ হয়েছিল 2017-এর মার্চে । থালেস আলিয়েনিয়া স্পেস বেলজিয়াম, থালেস আলিয়েনিয়া স্পেস ইতালিয়া, এবং থালেস অ্যালজেনিয়া স্পেস এসপানা এই উপগ্রহ ও তার মাটির উপাদানের বিকাশের সঙ্গেও যুক্ত ছিল ।

 

স্যাটেলাইটের জন্য অর্থায়ন:

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সম্পাদিত চুক্তির ভিত্তিতে প্রায় ২১৯ কোটি টাকায় ১৫ বছরের জন্য এই কক্ষপথ কেনা হয়। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট খরচ হচ্ছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি।

 

স্যাটেলাইটটির যোগাযোগ ক্ষমতা:

বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট 119.1° E দ্রাঘিমাংশ কক্ষপথের অবস্থান করে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান করছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মোট ২৪টি কু-ব্যান্ড (Ku-band) ও ১৬টি সি-ব্যান্ড (C-band) ট্রান্সপন্ডার বহন করে 1600 মেগাহার্টজ ক্ষমতাসম্পন্ন যার স্থায়ীত্ব ১৫ বছর ধরা হয়েছে। Ku ব্যান্ডের মাধ্যমে ডিটিএইচ (ডাইরেক্ট টু হোম) সার্ভিস এবং ব্রডব্যান্ড সুবিধা পাওয়া যাবে।

এই স্যাটেলাইটের Ku ব্যান্ডের মাধ্যমে ডিটিএইচ (ডাইরেক্ট টু হোম) সেবা দেয়া হবে। যার ফলে গ্রাম, শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ডিজিটাল টিভি ও রেডিও সম্প্রচার পৌঁছে যাবে। গ্রাহক ছোট একটা এন্টেনা দিয়ে এ সেবা গ্রহণ করতে পারবে। এই ব্যান্ডের বীমে প্রাপ্ত ব্রডব্যান্ড সেবার ফলে যেকোনো প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব ইন্টারনেট সুরক্ষিত রেখে ব্যবহার করতে পারবে। স্যাটেলাইটের C ব্যান্ডের মাধ্যমে ভিডিও সম্প্রচার সেবা দেয়া যাবে। ফলে কাভারেজ এরিয়ার যেকোনো জায়গায় ভিডিও সম্প্রচার করা যাবে, এমনকি গ্রাহক ছোট থেকে মাঝারী ধরনের এন্টেনার মাধ্যমে এ সেবা গ্রহণ করতে পারবে। এই স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত VSAT নেটওয়ার্ক সেবার মাধ্যমে যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারবে এবং কমিউনিকেশন ট্র্যাংক সেবার ফলে দেশের দুর্গম এলাকায় টেলিকমিউনিকেশন ও মোবাইল কমিউনিকেশন সেবা পৌঁছে দেয়া যাবে।

 

 এ সেবার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কাভারেজ এরিয়ার যেকোনো জায়গায় ভিডিও সম্প্রচার করা যাবে। গ্রাহক ছোট থেকে মাঝারী ধরণের এন্টেনার মাধ্যমে এ সেবা গ্রহণ করতে পারবে।

এই উপগ্রহটির কাভারেজ এলাকা হচ্ছে বাংলাদেশ ও তার আশেপাশের জলসীমা যেমন বঙ্গোপসাগর, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্য (পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল) ও ইন্দোনেশিয়া । এই মহাকাশযানের মাধ্যমে Direct-broadcast Satellite television নামে পরিচিত "Direct To Home (DTH), অতি ক্ষুদ্র অ্যাপারচার টার্মিনাল (VSAT) কমিউনিকেশন, ব্যাকওভার ও ট্রাকিং, নেটওয়ার্ক রেস্টোরেশন, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবংবিভিন্ন লাভজনক সার্ভিস প্রদান করার সুযোগ করার রয়েছে। উপগ্রহের প্রাথমিক সার্ভিস এরিয়া (PSA) হল বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশ, যেখানে সেকেন্ডারি সার্ভিস এরিয়ার (SSA) মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (Middle East and North Africa (MENA),  পাশাপাশি রয়েছে পূর্ব আফ্রিকা। এটি বাংলাদেশ ও এর নিকটস্থ ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশসহ বঙ্গোপসাগরের জলসীমাজুড়ে এলাকায় কু-ব্যান্ড ও সি-ব্যান্ড সার্ভিস দিবে।

 

এক নজরে স্যাটেলাইটটির বৈশিষ্ট্য:

·         কাজের ধরন: যোগাযোগ ও সম্প্রচার

·         প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান: থ্যালেস অ্যালজেনিয়া স্পেস (Thales Alenia Space)

·         উৎক্ষেপনকারী প্রতিষ্ঠান: স্পেসএক্স

·         নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান: বিটিআরসি ও থ্যালামস

·         অপারেটর:  Bangladesh Satellite Company Limited (bscl)  

·         বহনকারী রকেট: ফ্যালকন ৯, ব্লক-5 (Falcon 9 Block 5)

·         উৎক্ষেপন স্থান: এলসি-39 এ, কেনেডি স্পেস সেন্টার (Kennedy Space Center)

·         স্যাটেলাইট ওজন: 3,709 কিলোগ্রাম বা 8,177 পাউন্ড

·         মোট ব্যয়: 2,765.66 কোটি টাকা

·         মিশন লাইফ: ১৫ বছর

·         ডিজাইন লাইফ: ১৮ বছর

·         কসপার আইডি (COSPAR ID): 2018-44 A

·         Satellite Catalog (SATCAT) Number:  43463

·         প্ল্যাটফর্ম: স্পেসবাস ৪০০০ বি২ (Spacebus-4000B2)

·         বিদ্যুৎ শক্তি: ৬কিলোওয়াট (6kW)

·         ব্যাটারি: লিথিয়াম আয়ন মনো ব্যাটারি

·         সোলার এর‍্যে: 3-panels per wing with GaAs cells

·         প্রোপালসন: সম্পূর্ণ কেমিক্যাল

·         কক্ষপথের অবস্থান: 119.1 পূর্ব দ্রাঘিমাংশ জিওস্টেশনারি স্লট

·         সময়কাল: 1,436.1 minutes

·         দ্রুতি : 3.07 km/s

·         উৎকেন্দ্রতা: 0.0001

·         অনুভূ উচ্চতা  (Perigee altitude): 35789.3 কিমি

·         অপভূ উচ্চতা (Apogee altitude): 35798.5 কিমি

·         ট্রান্সপন্ডার ব্যান্ড: সর্বমোট ৪০ টি (26 Ku band, 14 C band)

 

একনজরে স্যাটেলাইটের সুবিধাসমূহ:

  • ·         টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়ন।

  • ·         ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির খরচ উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস।

  • ·         টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি সীমার বাইরে বসবাসকারী জনগণকে ডিজিটাইজেশনের আওতায় আনা।

  • ·         স্যাটেলাইট সংযোগের জন্য বিদেশি অপারেটরদের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।

  • ·         বিদেশি অপারেটরদের কাছ থেকে ব্যান্ডউইথ ভাড়া সাশ্রয় করা। বর্তমানে এতে বছরে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়।

  • ·         বিভিন্ন দেশের কাজে স্যাটেলাইটের ট্রান্সপন্ডার ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন।

  • ·         ডাইরেক্ট-টু-হোম (ডিটিএইচ) সেবার আওতায় বিশ্বব্যাপী টিভি বিনোদনের দ্রুত ও সহজতর অ্যাক্সেস উপভোগ করা।

  • ·         দেশের দূরবর্তী বা দুর্গম অংশ যেমন- পার্বত্য এলাকা, উপকূলীয় এলাকা, হাওর ও গভীর সমুদ্র অঞ্চল প্রভৃতি স্থানে ইন্টারনেট সেবা প্রদান।

  • ·         ডিজিটাল সার্ভিসে বা ই-সার্ভিসের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনসাধারনের কাছে সরকারি সেবা প্রদান।

  • ·         প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সুনামি প্রভৃতি ক্ষেত্রে নির্ভুল ও হালনাগাদ আবহাওয়ার তথ্য পৌঁছে দেয়া।

  • ·         দেশের ডিজিটাল অগ্রগতিতে অত্যন্ত অবদান রাখা এবং ভিশন ২০২০ বাস্তবায়ন।

  • ·         ২০২০ সালের মধ্যে যোগাযোগ, প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ও উন্নয়ন করা।

  • ·         দেশের সকল ইউনিয়ণ পরিষদ পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবা বিস্তৃত করা।

  • ·         অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দূর্যোগের মধ্যে টেলিযোগাযোগ সেবা সচল রাখা ও বিকল্প ব্যাকআপ তৈরি করা।

  • ·         রাষ্ট্রীয় নজরদারী ও জাতীয় নিরাপত্তার বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কার্যকর ভূমিকা রাখা।

  • ·         মহাকাশ প্রযুক্তি সংক্রান্ত শিক্ষা ও গবেষণা কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করা।

তথ্যসূত্র:

https://www.google.com

https://www.aerospace-technology.com

https://en.wikipedia.org

https://bangladeshus.com

https://www.bcscl.com.bd

https://www.thalesgroup.com

https://en.prothomalo.com

https://www.jugantor.com

 

 

 

লেখক: মনির আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা

ইমেইল: [email protected]

 

মন্তব্য করুন

অন্যান্য