Loading..

১৪ নভেম্বর, ২০২২ ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

পরীক্ষায় কীভাবে ভালো প্রস্তুতি নিবেন

পরীক্ষায় কীভাবে ভালো প্রস্তুতি নিবেন







একটি স্টাডি প্ল্যান তৈরি করুন

বোর্ড পরীক্ষা হোক কিংবা চাকুরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা হোক, পরীক্ষায় ভালো নম্বর নিশ্চিত করার জন্য পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্বে সতর্কতার সাথে একটি পরিকল্পিত স্টাডি প্ল্যান বা অধ্যয়ন পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরী।  স্কুল-কলেজ পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য বিষয় অনুসারে এবং প্রতিযোগিতামূলক বা বিভাগীয় পরীক্ষার জন্য সেকশন বা অধ্যায় অনুসারে অধ্যয়নের একটি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। একদিনে কতটুকু কভার করতে পারবেন সে অনুযায়ী কোন দিন কোন বিষয় বা অধ্যায় পড়বেন তা এই পরিকল্পনায় যুক্ত করুন এবং আগের দিন যা শিখেছেন তা রিভিশনের জন্য দিনের শুরুতে কিছু সময় রেখে দিন। একদিন একটি বিষয় কিংবা একইদিন পালাক্রমে একাধিক বিষয় পড়তে পারেন। এইভাবে আপনি আগে থেকেই জানতে পারবেন যে এই বিষয় প্রস্তুতির পরবর্তী সময়ে কিংবা পরের দিন কী পড়বেন। কোনো একটি বিষয় পড়তে ভালো না লাগলে বা বিরক্তি চলে আসলে বিষয় বা অধ্যায় পরিবর্তন করুন। এতে মস্তিস্কের ভিন্ন অংশের ক্রিয়ার ফলে বিরক্তি ভাব কেটে যাবে এবং পাঠে মনোনিবেশ বৃদ্ধি পাবে।

 

বই থেকে খানিকসময় বিরতি নিন

সারাবছর নিয়মিতভাবে প্রস্তুতি না নিয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার কাছাকাছি সময়ে দিনরাত অনবরত প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে টানা কয়েক ঘন্টা পড়ার পর শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামের জন্য কিছু সময় বিরতি নেয়া আবশ্যক। আপনি যদি কোনো বিরতি ছাড়াই অধ্যয়ন করেন, তবে আপনার মন ও শরীরের উপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হবে। কয়েক ঘন্টা পরে আপনার বই ও নোট খোলা থাকলেও আপনি শিক্ষা কার্যক্রমে মনোযোগ অব্যহত রাখতে পারবেন না। প্রতি 2 ঘন্টা পর বিরতিতে কমপক্ষে 20 মিনিট সময় নিন। আপনি সতেজ বোধ করার জন্য এই 20 মিনিটের মধ্যে যোগব্যায়াম করতে পারেন বা ঘরে হাঁটতে পারেন কিংবা ঘরে হাটঁতে হাঁটতে সদ্যমূখস্থ করা পড়াগুলো রিভিশন বা রিকল করতে পারেন।

 

নমুনা পেপার ও মক টেস্ট অনুশীলন করুন

যেকোনো পরীক্ষার জন্য অধ্যয়ন করার সময় আপনি যা শিখেছেন তা পরীক্ষা করার সর্বোত্তম উপায় হলো আগের বছরের নমুনাপশ্নের পাশাপাশি নিজে নিজে বিভিন্ন মডেল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা। পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাওয়ার জন্য, নমুনা এবং মক টেস্ট অনুশীলন করার আদর্শ সময় হচ্ছে চূড়ান্ত পরীক্ষার মাত্র কয়েকদিন আগে, যখন আপনি প্রতিটি বিষয় বা বিভাগের সিলেবাস সম্পন্ন করেন। আপনার টাইমার সেট করুন, একটি নমুনা কাগজ নিন এবং পরীক্ষা দিন যেভাবে আপনি উত্তর লিখবেন তার একটি চূড়ান্ত অনুশীলন করা হলো। নিজেই প্রশ্ন প্রণয়ন করুন এবং পরীক্ষক হিসেবে নিজের পরীক্ষার খাতা নিজেই মূল্যায়ন করুন। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ফলে পরীক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট সময়ে দক্ষতার সাথে অংশগ্রহণের কাজটি মূল্যায়ন করে কিংবা উত্তরের সঠিকতা নিরূপন করে আগে থেকেই পরীক্ষার দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে। এইভাবে আপনি জানতে পারবেন কোন বিভাগগুলো আপনার জন্য সময়সাপেক্ষ, কোন অংশটি আগে শুরু করবেন কিংবা কোনটি পরে। এতে বুঝতে পারবেন কোথায় আপনার সময় বাঁচাতে পারেন, কোন বিষয়ের উপর আপনার বেশি সময় দেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে সময় পুনর্বিন্যাস করুন, এতে ভালো ফলাফল আসবে।

 

দুর্বল পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করুন

পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আপনার দুর্বল পয়েন্ট শনাক্ত করা। আপনার দুর্বল ধারণাগুলোর একটি নোট তৈরি করুন, এগুলোর পেছনে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় দিন, একই সমস্যা সমাধানে একাধিক ব্যক্তির সহায়তা নিন, একাধিক বিকল্প সমাধানের মধ্যে তুলনামূলক সহজ পথটি বেছে নিন এবং বাকি বিষয়গুলোর সাথে সমন্বয় করুন। পরীক্ষার খাতায় চিহ্নিত দুর্বল বিষয়ের ধরনের উত্তর প্রদানের ক্ষেত্রে বিকল্প অপশনগুলোর উত্তর প্রদানের চেষ্টা করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি গণিতে দুর্বল হন তবে এটি আপনাকে ভয় দেখাতে পারে এবং আপনি যতটা সম্ভব এটি এড়াতে চেষ্টা করুন। আপনার অধ্যয়নের পরিকল্পনায় প্রাপ্ত দুর্বল বিষয় বা কঠিন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করুন, যাতে আপনি বোঝা অনুভব না করেন। প্রস্তুতির শেষ প্রান্তের দিকে আরও একবার আপনি জানবেন যে, কোন ধারণাগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার বন্ধুদের সাহায্য নিন এবং শিক্ষকদের কাছ থেকেও একই বিষয়ে পরামর্শ নিতে পারেন।

 

 

মূখস্থ করার পরিবর্তে ধারণাগুলো বুঝুন

অনেক শিক্ষার্থী আছে দূর্বোধ্য বিষয় না বুঝে মুখস্থ করে। ফলে মুখস্থ বিষয় দ্রুত ভুলে যায়। এক্ষেত্রে সরাসরি মুখস্থ না করে মুখস্থ করার জন্য কৌশল ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে গণিত ও পদার্থবিদ্যার মতো কঠিন বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আগে বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করুন, পাশে খাতা নিয়ে কয়েকবার লিখুন, যা আপনাকে আরও ভালভাবে মুখস্থ করতে সহায়তা করবে। সর্বদা আপনার সন্দেহগুলো পরিষ্কার করুন, যাতে আপনার মূল ধারণা এবং পাঠের মৌলিক বিষয়গুলি পরিষ্কার হয়। কঠিন বিষয়সমূহ না বুঝে আত্মস্থ করার পরিবর্তে প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে বুঝার চেষ্টা করুন, কল্পনায় বিষয়টির একটি ভিজ্যুয়ালাইজেশন তৈরি করুন, পঠিত তাত্ত্বিক বিষয়কে বাস্তবের কোনো বিষয়বস্তু বা পরিবেশের সাথে ম্যাপিং করুন, গল্প বলার মতো করে উপস্থাপন করুন এবং পাশাপাশি অন্যান্য কৌশলগুলো ব্যবহার করতে পারেন।

 

স্কোরিং অংশগুলো স্ক্যান করুন

প্রতিটি পরীক্ষায় কমপক্ষে একটি বিভাগ এবং এমনকি একাধিক বিভাগ থাকে, যেখানে যে কেউ ন্যূনতম প্রচেষ্টায় সহজেই নম্বর পেতে পারে। নৈর্ব্যক্তিক বিষয়ে ধারাবাহিক উত্তর না দিয়ে প্রশ্নের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে কমন বা সহজ প্রশ্নগুলো খুঁজে চিহ্নিত করা এবং সবার আগে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করবেন। সাধারণত পরীক্ষায় এক বা দুই-মার্কের প্রশ্ন থাকে, যেমন সৃজনশীল ক ও খ প্রশ্ন, যেগুলোকে আপনি সহজে খুঁজে পেতে পারেন এবং কম সময়ের মধ্যে সেগুলো উত্তর দিতে নিজেকে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন। আপনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা বা স্কুল-কলেজ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন না কেন, এই স্কোরিং অংশগুলো খুঁজুন এবং সেগুলো আগে উত্তর দেয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন।

 

গ্রুপ স্টাডি করুন ও নিজে যা শিখেছেন তা অন্যদের শেখান

পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাওয়ার জন্য গ্রুপে স্টাডি বা একসাথে আলোচনা করে শিখন কার্যক্রম আরেকটি আকর্ষণীয় পদ্ধতি হতে পারে। সুতরাং যখন আপনি মনে করেন যে আপনি আপনার ঘরের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ একা একা অধ্যয়ন করছেন, তখন কিছু বন্ধুদেরকে একটি গ্রুপ স্টাডি সেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। ধারণাগুলো সংশোধন করুন এবং একে অপরকে বিভিন্ন ধারণা বুঝতে সাহায্য করুন, যা পরীক্ষার চাপের দিনগুলোতে মনোবল ও অনুপ্রেরণা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। এটি বেশ ভালভাবে পরীক্ষিত একটি কৌশল, যা আপনি কাউকে শেখানোর মাধ্যমে একটি বিষয় সম্পর্কে স্পষ্টতা অর্জন করতে পারেন। এখানেই গ্রুপ অধ্যয়ন একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কারণ এটি আপনাকে একে অপরের ধারণা এবং জ্ঞানকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে। একটি গ্রুপ স্টাডি সেশনের সময় একে অপরের মধ্যে ধারণাগুলো ভাগ করুন এবং অন্য কাউকে শেখানোর জন্য পালাক্রমে নিন। এটি অবশ্যই আপনার জ্ঞানকে জোরদার করতে এবং এইভাবে পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেতে সহায়তা করবে।

 

স্মার্টফোনে ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার কমিয়ে দিন

আপনার স্মার্টফোনের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়া সহজ এবং সেই কারণেই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সময় আপনার মোবাইল ব্যবহার করার জন্য একটি ন্যূনতম সময় সেট করা অপরিহার্য। শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচুর সময় ব্যয় করে যা পড়াশোনায় মনোযোগে বাধা সৃষ্টি করে। মোবাইলফোন ব্যবহার থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করুন এবং পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে আপনার মোবাইলফোনের ব্যবহারের সময়সীমা ন্যূনতম পর্যায়ে রাখুন।

পরীক্ষার কয়েক মাস আগে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার এড়িয়ে চলুন, তবে আপনার বিভ্রান্তি কম হবে। তবে অনেকসময় পরীক্ষার নোট বা তথ্য শেয়ার করার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ কাজে আসে। তাই আপনাকে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলো একেবারে বন্ধ না করে ব্যবহারে বিরতি দিন, লগআউট করে ডিভাইস নাগালের বাইরে রাখুন। পড়াশোনার সময় মোবাইলফোন বন্ধ বা সাইলেন্ট মোডে দূরে রাখুন। অতি আবশ্যকীয় যোগাযোগের জন্য কিংবা আপনার মনকে শিথিল রাখার জন্য  পড়াশোনার মাঝে খুব কম সময় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করুন।  

 

দেহঘড়ি বজায় রাখুন ও যোগব্যায়াম করুন

পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় শিক্ষার্থীরা প্রচুর চাপ এবং উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যেতে থাকে। ক্রমাগত পড়াশোনার চাপ ভালো নয় এবং সেই কারণেই আপনার শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ অধ্যয়নের সময়ের মধ্যে একটি ঘুম বা বিরতি নেওয়া উচিত। আপনি যদি 2-3 ঘন্টা অধ্যয়ন করেন, চেষ্টা করুন এবং 15/২০ মিনিটের বিরতি নিন যা আপনার মনকে শিথিল করবে এবং আপনি যা শিখেছেন তা সঞ্চয় করতে এবং এইভাবে আপনার পরীক্ষায় ভাল নম্বর পেতে সহায়তা করবে। এছাড়া রাতে ন্যূনতম 7-8 ঘন্টা ঘুমের মাধ্যমে আপনার ঘুমের সময়সূচিকে নিয়মিত করুন, যা পড়াশোনায় আপনার মনোযোগকে আরও জোরদার করবে।

পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় সুস্থ থাকার জন্য অন্যতম কৌশল হচ্ছে যোগব্যায়াম। নিয়মিত ব্যায়াম ও কয়েকটি যোগাসন শেখার চেষ্টা করুন, যা পরীক্ষার চাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সাথে সাথে আপনার শরীর-মনকে সতেজ রাখতে সাহায্য করবে। তাছাড়া দিনে 30 মিনিট যোগব্যায়াম আপনার স্মৃতিশক্তি 20% বৃদ্ধি করতে সাহায্য করতে পারে। অধ্যয়নের শুরুতে কিংবা বিরতির সময় 5 মিনিটের জন্য ক্রস-লেগড পজিশনে বসুন এবং আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর ফোকাস করার চেষ্টা করুন। তাছাড়া নিয়মিত পানি পান করে নিজেকে হাইড্রেটেড রাখুন, ডায়েটে ভালো পরিমাণে প্রোটিন নিন এবং ফল ও সবুজ শাকসবজি খান, যা শরীরে শক্তি যোগাবে ও পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে সাহায্য করবে।

 

লেখক:

মনির আহমেদ

সহকারী অধ্যাপক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি

বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা।

[email protected]

 

মন্তব্য করুন