সিনিয়র শিক্ষক
১৫ মার্চ, ২০২৩ ০৭:০৩ পূর্বাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
ধরনঃ মাদ্রাসা শিক্ষা
শ্রেণিঃ সপ্তম
বিষয়ঃ জীবন ও জীবিকা
অধ্যায়ঃ ষষ্ঠ অধ্যায়
মাছ রান্না
‘ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙ্গালী সকল
ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।’
বহুকাল আগে কবি ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছেন এই লাইন দুটো। মাছ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে রয়েছে নানা ছড়া,
কবিতা ও গল্প। মাছে ভাতেই যে বাঙালির যুগ যুগ ধরে পরিচয়! অষ্টম শতাব্দী থেকে বাংলাদেশের পাহাড়পুর
ও ময়নামতিতে যেসব পোড়ামাটির ফলক মাটি খড়েুঁ বের করা হয়েছে, তার বেশ কয়েকটিতে মাছের ছবি
দেখা যায়। কোনো কোনো মন্দির থেকে বঁটি দিয়ে মাছ কোটা বাঙালি রমণীর দৃশ্য সংবলিত পোড়ামাটির
ফলক পাওয়া গেছে। মাছ যে বাঙালির একটা অতি প্রাচীন জনপ্রিয় খাবার, এ ফলকগুলো তারই পরিচায়ক।
বাঙালির বিয়েবাড়িতে কিংবা গায়েহলুদে রুই মাছ সাজিয়ে পাঠানো হয় শুভাশিসের প্রতীক হিসেবে ।
আমাদের মাছপ্রীতির আরও পরিচয় পাওয়া যায় সংস্কৃতির নানা প্রকাশে-আলপনায়, শাড়ির পাড়ে, আঁচলে,
কানের দুলে, গলায় হারের নকশায় ! বাঙালির সুস্বাস্থ্যের প্রতীক হলো মাছ। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এত
জাতের মাছ পাওয়া যায় না। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে আমাদের দেশ এখন সারা বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে
আছে।
আমাদের দেহের ক্ষয় পূরণ ও বৃদ্ধিতে মাছের ভূমিকা অনন্য। মাছে রয়েছে প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম,
ফসফরাস, ভিটামিন-সি, ভিটামিন বি-৩ এবং ভিটামিন-ডি, ভিটামিন বি২, ফ্যাটি অ্যাসিড, লাইসনিন ও
পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে, নিরাপদ ও সহজ উপায়ে (পরিবেশ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে) মাছ রান্না করতে
পারব।
এই পাঠ ও অনুশীলন শেষে আমরা-
137
মিথিওনিন যার প্রতিটিই আমাদের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। দাঁত ও হাড়ের গঠন মজবুত করতে এবং
রাতকানা রোগ প্রতিরোধসহ শরীরের নানা সমস্যা প্রতিকারে মাছ অতুলনীয়। নদী-নালা, হাওর-বাঁওড়ের এই
দেশে সেই প্রাচীনকাল থেকেই তাই বাঙালির রসনাবিলাসে মাছ রাজত্ব করে আসছে। এই মাছ রান্না তাই
আমাদের আয়ত্ত্ব করা জরুরি।
মাছ রান্নার আগে আমাদের যা যা শিখে নিতে হবে:
● সরঞ্জাম ও তৈজসপত্র পরিষ্কার করার কৌশল
● ধারালো সরঞ্জামের ব্যবহার
● পেঁয়াজ ও রসুন কুঁচি করে কাটা
● সবজি কাটা
● চুলা জ্বালানো
● গুঁড়ামসলার ব্যবহার
তবে এলাকাভেদে মাছ রান্নার অনেক পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। আবার সব ধরনের মাছ রান্নার কৌশলও এক
নয়। মাছ কখনও কড়কড়ে ভাজা, কখনও ঘন ঝোলে ভুনা, কখনও বা সবজি দিয়ে , কখনও শাক দিয়েও
রান্না করা হয়। মাছের রকমারি রান্না দেখা যায় আমাদের রোজকার মেন্যুতে।
এসো করি
মাছ রান্না নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের রয়েছে দারুণ উপমা-
খেঁদুবাবুর এঁধো পুকুর, মাছ উঠেছে ভেসে
পদ্মমণি চচ্চড়িতে লঙ্কা দিল ঠেসে।’
বেলাল হোসেন গত বছর সরকারি একটা প্রশিক্ষণে সুইডেন গিয়েছিলেন। একই প্রশিক্ষণে অন্য আরও ৮টি
দেশের কর্মকতারা অং র্ম শ নেন। এক মাসের প্রশিক্ষণে তাদেরকে সেখানকার খুব নামকরা একটা হোটেলে
রাখা হয়েছিল। ডিনারে তাদের প্রায় ৪০/৫০ পদের খাবার বুফে পরিবেশন করা হয়। প্রথম সপ্তাহ ভালোই
খেয়ে কাটালেন তিনি। কিন্তু সপ্তাহখানেক পরেই তার প্রাণ মাছের জন্য ছটফট শুরু করল। একটা বুদ্ধি বের
করলেন তিনি। হোটেলের ইনচার্জকে মেন্যুতে ৮ দেশের একটা করে আইটেম যোগ করতে রাজি করিয়ে
ফেললেন (বাকি যে কয়েক দিন তারা এখানে আছেন, সেই দিনগুলোর জন্য)। কিন্তু শর্ত হশর্ত লো, তাদের
শেফকে সেই পদ/ রান্নাটা শিখিয়ে দিতে হবে। এক বাক্যে শর্ত কবুল ক শর্ত রে নিলেন বেলাল সাহেব। তিনি
প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে বেছে নিলেন, রূই মাছের তরকারি। প্রথম সপ্তাহেই বাজিমাত করে
ফেললেন তিনি। প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিরাই খেয়ে ব্যাপক প্রশংসা শুরু করলেন এবং রীতিমতো ডিস খালি
হয়ে গেল। পরিস্থিতি দেখে হোটেলের ইনচার্জ তাদের র্জ হোটেলের নিয়মিত মেন্যুতেই রুই মাছ যুক্ত করলেন।
বেলাল সাহেব ভিনদেশি শেফকে যেভাবে রুই মাছ রান্না শিখিয়েছিলেন, এসো আমরাও তা শিখে নিই।
কুকিং
জীবন ও জীবিকা
138
রুই মাছের তরকারি রান্না করতে যা যা দরকার হবে-
1. পেঁয়াজ (বড়)-২টি
2. রসুন (বাটা)- ১ চা-চামচ
3. হলুদ, মরিচ, জিরা গুঁড়া ও লবণ- ১ চা-চামচ করে
4. কাঁচা মরিচ- ২/৪টি
5. তেল- ২ টেবিল চামচ
6. রুই মাছ -৬ টুকরা
7. আলু-২টা
8. টমেটো- ২টা
প্রক্রিয়া
ধাপ-১
বেলাল সাহেবের নির্দেশ না অনুযায়ী প্রথমেই সুইডিশ শেফ মাছ কেটে ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে
নিলেন।
এরপর পেঁয়াজ ও রসুন কুচি কুচি করে কেটে নিলেন এবং ২টা আলু ও ২টা টমেটো লম্বা লম্বা করে
কেটে নিলেন।
ফ্রাইপ্যান, চামচ, বাটি ইত্যাদি পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিলেন।
সতর্কতা র্ক
কাজের শুরুতেই মাথার চুল যেন পরিপাটি থাকে
সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে, তা না হলো বাতাসে
চুল উড়ে গিয়ে এগুলোতে পড়তে পারে। সম্ভব
হলে টুপি পরে নিতে হবে।
কাটার সময় খুব সতর্কভা র্ক বে কাটতে হবে,
একদম অন্যদিকে তাকানো যাবে না, তাতে হাত
কেটে যেতে পারে। সম্ভব হলে, হাতে গ্লাভস পরে
নিতে হবে।
ধোয়ার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে পরনের
জামাকাপড় যেন ভিজে না যায়। সম্ভব হলো অ্যাপ্রোন পরে নিতে হবে।
139
ধাপ-২
এরপর তিনি মাছের টুকরাগুলো একটু হলুদ, মরিচের
গুড়া ও লবণ দিয়ে মাখিয়ে নিলেন।
সতর্কতা র্ক
হলুদ ও লবণের পরিমাণ যেন ঠিক থাকে
সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে; খুব বেশি বা
কম যেন না হয়।
ধাপ-৩
এবার তিনি কম আঁচে চুলায় একটি ফ্রাইপ্যান চাপিয়ে তাতে দুই
টেবিল চামচ তেল দিয়ে দিলেন। তেল গরম হওয়ার পর এর মধ্যে
মাখানো মাছের টুকরাগুলো ছেড়ে দিলেন এবং চুলার আঁচ মাঝারি
করে দিলেন।
সতর্কতা র্ক
একেক রকমের চুলা একেকভাবে
জ্বালাতে হয়, তাই চুলা জ্বালানোর
বিষয়টি আগেই বড়দের কাছ থেকে
শিখে নিতে হবে।
যদি দেশলাই কাঠি দিয়ে চুলা জ্বালানো
হয়, সে ক্ষেত্রে চুলায় আগুন ধরানোর
পরপরই হাতের দেশলাইয়ের কাঠিটি
পানি দিয়ে ভালোভাবে নিভিয়ে
ফেলতে হবে ।
তেলের মধ্যে মাছ ছাড়ার সময় তেল
ছিঁটে আসতে পারে, সে ক্ষেত্রে একটা ঢাকনা কাত করে
ধরে রেখে মাছ ছাড়া যেতে পারে, তাতে তেলের ছিঁটে এসে
গায়ে লাগবে না
কুকিং
জীবন ও জীবিকা
140
ধাপ-৪
এবার তিনি মাছের এক পিঠ ভালোভাবে ভাজা হওয়ার পর
সেগুলোকে উল্টে দিলেন। এভাবে উভয় পিঠ ভাজার পর একটি
চামচ দিয়ে মাছের টুকরাগুলো ফ্রাইপ্যান থেকে তুলে
নিলেন। বেলাল সাহেব তাকে কড়াভাবে মাছ ভাজতে
নিষেধ করেছেন, তাই তিনি হালকা ভেজেছেন।
সতর্কতা র্ক
তেলের মধ্যে মাছ উল্টে দেওয়ার সময়
তেল ছিঁটে আসতে পারে, সে ক্ষেত্রে একটা
ঢাকনা কাত করে ধরে রাখা যেতে পারে,
তাতে তেল ছিঁটে এসে গায়ে লাগবে না।
ধাপ-৫
এরপর তিনি নির্দেশ না অনুযায়ী অল্প আঁচে তেলের মধ্যে কুঁচি করে
রাখা পেঁয়াজ ছেড়ে দিলেন। একটু নাড়াচাড়া করে পেঁয়াজ ভাজার
পর ১ চা চামচ করে রসুনবাটা, হলুদগুঁড়া, মরিচগুঁড়া, জিরার গুঁড়া
ও লবণ দিলেন । এগুলো দেওয়ার পর মাঝারি আঁচেই ৩০ সেকেন্ড
নেড়ে মশলাগুলো ভালোভাবে মিশিয়ে নিলেন।
এরপর সামান্য একটু পানি দিয়ে ২ মিনিট
ধরে কষিয়ে নিলেন।
সতর্কতা র্ক
নাড়ার সময় হাত নিরাপদ দূরুত্বে
রাখতে হবে । সম্ভব হলে হাতে কিচেন
গ্লাভস পরে নেওয়া যেতে পারে।
141
ধাপ-৬
এবার লম্বা করে কেটে রাখা আলুগুলো প্যানে ঢেলে দিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকলেন। এভাবে ৩/৪
মিনিট ধরে আলুগুলো মসলায় কষিয়ে নিয়ে এককাপ পানি দিলেন এবং নেড়ে ঢাকনা দিয়ে রাখলেন
মিনিট পাঁচেক। এরপর ঢাকনা তুলে আবারও ভালোভাবে নেড়ে দিয়ে ফালি করে রাখা টমেটো ছেড়ে
দিলেন এবং চুলার আঁচ কমিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলেন ।
এরপর ঢাকনা তুলে নেড়ে দিয়ে এর মধ্যে এমন পরিমাণ পানি দিলেন যেন যাতে সব সবজি পানিতে
ডুবে যায়। এবার মাঝারি আঁচে রেখে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিলেন।
সতর্কতা র্ক
ঢাকনা উঠানো বা দেওয়ার সময় তাপরোধী কিছু দিয়ে (কাপড়/ধরনি) ধরে নিতে হবে, তা
না হলে হাতে তাপ লাগতে পারে।
কুকিং
জীবন ও জীবিকা
142
ধাপ -৭
৩/৪ মিনিট পর ঢাকনা তুলে ভেজে রাখা মাছগুলো উপরে সুন্দরভাবে বিছিয়ে দিয়ে আবারও ঢাকনা
দিয়ে দিলেন। ২/৩ মিনিট পর ঢাকনা খুলে মাছের টুকরাগুলো আলতোভাবে উল্টে দিলেন এবং ২/৩
টি কাঁচামরিচ দিয়ে দিলেন। ঝোল ঘন হয়ে এলে একটু নেড়ে লবণ চেখে নিলেন। (লবণ কম হওয়ায়
সামান্য একটু দিয়ে নেড়ে দিলেন।) এবার একটু ধনে পাতা কুঁচি ছিটিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে চুলা বন্ধ
করে মিনিট পাঁচেক রেখে দিলেন চুলার উপর। এভাবেই রান্না হয়ে গেল দারুণ স্বাদের রুই মাছের
তরকারি।
রান্না শেষে শেফ চামচে করে একটু তুলে নিয়ে টেস্ট করে মিষ্টি হাসলেন আর বেলাল সাহেবকে বুড়ো
আঙুল তুলে লাইক সাইন দেখালেন।
সতর্কতা র্ক
লবণ হয়েছে কি না, তা চেখে দেখার সময় অবশ্যই ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করে তারপর মুখে দিতে
হবে, নতুবা গরমে ঠোঁট পুড়ে যেতে পারে।
কড়াই তাপরোধী কিছু দিয়ে (কাপড়/ধরনি) ধরে নামাতে হবে যাতে হাতে তাপ না লাগে।
143
এসো ভেবে দেখি
● রুই ছাড়া আর কী কী মাছ এই পদ্ধতিতে রান্না করা যাবে?
● আলু ছাড়া আর কী কী সবজি দিয়ে এভাবে মাছ রান্না করা যাবে?
● মাছ সবজি ছাড়া ভুনা করলে কীভাবে করা যা? সে ক্ষেত্রে কখন, কীভাবে, কতটুকু পানি যোগ
করতে হবে?
● মাছ শুধু ভেজে খেতে চাইলে কীভাবে করা যায়?
● কড়াই বা ফ্রাইপ্যান ভালোমতো গরম না হতেই মাছ ছেড়ে দিলে কী সমস্যা পারে?
● টমেটো, ধনে পাতা না থাকলে কি মাছের তরকারি রান্না হবে না?
● মাছের সঙ্গে আলু বা অন্য সবজি লম্বা করে না কেটে আর কীভাবে কাটা যায়?
● মাছের তরকারির জন্য মাছ কড়া করে ভেজে ফেললে কী সমস্যা হতে পারে?
● না ভেজে কি মাছ রান্না করা যায়?
● মাছ রান্নার সময় কী কী সতর্কতা র্ক মেনে চলা প্রয়োজন?
কী শিখলাম
● সকল উপকরণ ও সরঞ্জাম পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া।
● ছুরি, বঁটি ইত্যাদি ধারালো সরঞ্জাম সাবধানে ব্যবহার করা ও কাজ শেষে সঠিক স্থানে গু