Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

০৬ জুন, ২০২৩ ০৫:০৬ অপরাহ্ণ

কবি গান

কবি গান
বাংলা লোকসঙ্গীতের একটি প্রকরণ বিশেষ।

বাংলা লোকসঙ্গীতের একটি প্রকরণ বিশেষ। খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে ঝুমর, কীর্তন এবং আঞ্চলিক গানের সুরের সংমিশ্রণে এই গান সৃষ্টি হয়েছিল। সুরের বিচারে কবিগান- ঝুমুর, ভাওয়াইয়া বা ভাটিয়ালি মতো কোনো সুনির্দিষ্ট সুরাঙ্গের প্রতিনিধিত্ব করে না। আবার বাণীর উচ্চারণ এবং বিষয়াঙ্গের বিচারেও কবি গানের কোনো আদর্শিক বৈশিষ্ট্য নেই। এই বিচারে কবিগান হলো- নানা সুরের না বিষয়ের সংমিশ্রণে গড়ে উঠা সঙ্কর শ্রেণির গান। এই গানের সৃষ্টি হয়েছিল বাংলার স্বভাবজাত কবিদের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশনের সূত্রে। মূলত দুজন কবি প্রতিযোগিতামূলক গানের আসরে, গানের লড়াইয়ের অবতীর্ণ হতেন। এদের প্রত্যেকের সাথে থাকতেন কবিদের নিজস্ব সহযোগী কণ্ঠ ও যন্ত্রশিল্পীরা। এই গানের লড়াই চলতো উন্মুক্ত আসরে অজস্র শ্রোতার সামনে। অনেক সময় প্রধান কবির সাথে থাকতেন সহযোগী আরও কিছু কবি।

গোড়ার দিকে প্রতি দলের প্রধান কবিদের বলা হতো- কবিওয়ালা। কালক্রমে এই নাম হয়ে গিয়েছিল কবিয়াল। কবিয়াল মুখে মুখে গান রচনা করে তা সুর সহযোগে পরিবেশন করতেন। এঁরা কিছু কিছু পদ আগে থেকেই তৈরি করে রপ্ত করে রাখতেন। আসরে সে সকল গানের ফাঁকে ফাঁকে তৎক্ষণিকভাবে নতুন নতুন গানও তৈরি করে পরিবেশন করতেন। গান তৈরির ক্ষমতা, পরিবেশনের ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দেওয়ার পারঙ্গমতা দিয়ে কবিয়ালের যোগ্যতা বিচার করা হতো। এরূপ কবিয়ালদের কবি হিসেবে বিশেষভাবে সম্বোধন করা হতোসে সময়ে কবিদ্বয়ের প্রতিযোগিতামূলক গান থেকে সৃষ্টি হয়েছে 'কবিগান' শব্দ।

প্রতিটি দলের কবি বা কবিয়ালের সাথে কিছু সহযোগী সঙ্গীত শিল্পী থাকতেন। এঁদেরকে বলা হতো দোহার। তাঁরা সাধারণত প্রধান কবির কথাগুলোই পুনরাবৃত্তি করতেন। বাদ্যযন্ত্রীদের মধ্যে ঢুলি কবিগানে বিশেষ ভূমিকা পালন করতেন। নানা ধরনের ছন্দ তুলে কবিয়াল যখন আসরকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করতেন, সে সময় ঢুলি কবির ভাবকে ঢোলের ছন্দে নিপুণভাবে ছন্দোময় করে তুলতেন। কখনো কখনো ঢুলি আসরের ভিতরে নেচে নেচে কবিগানকে নান্দনিক করে তুলতেন।  

কবি গানের শুরুর দিকে কোনো একজন কবিয়াল গানে গানে নিজের পরিচয় দিতেন। এরপর নানা রকম বন্দনা দিয়ে গান শুরু করতেন। এই বন্দনায় থাকতো কবির গুরুর শ্রদ্ধা নিবেদন। এছাড়া থাকতো হিন্দু পৌরাণিক দেবদেবীর বন্দনা। বিশেষভাবে কাব্যকলার দেবী সরস্বতীকে স্মরণ করা হতো। অপূর্ব কুশলতায় কবিয়াল উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম দিকের বন্দনা করতেন। একই সাথে কবিয়াল শ্রোতাদেরকে গানে গানে শ্রদ্ধা জানতেন। গানের এই অংশের পরে, প্রতিপক্ষের দিকে কোনো জটিল প্রশ্ন রেখে প্রতিপক্ষের উত্তর শোনার জন্য আসর ছেড়ে দিতেন। এরপর অন্য কবিয়াল আসরে হাজির হতেন। উত্তর দাতা কবি কিছু ভণিতা করে নিজের পরিচয় দিতেন। তারপর দুচারটি কথা ছন্দে ছন্দে বেঁধে বা গানে গানে প্রতিপক্ষের প্রশ্নের উত্তর দিতেন। রপর প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে এক বা একাধিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে আসরে বসে পড়তেন। পাল্লাক্রমে কবিয়ালারা এইভাবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য গানের যুদ্ধ চালিয়ে যেতেন। এই যুদ্ধে যেমন যোগ্য উত্তর থাকতো, তেমনি নানা ধরনের শ্লেষ দিয়ে প্রতিপক্ষকে আঘাত করার প্রচেষ্টা থাকতো। অনেক সময় কবিগানে কবি বিষয় ছেড়ে প্রতিপক্ষ কবিকে ব্যক্তিতগতভাবে আক্রমণ করতেন গানে গানে।  অনেক সময় আলাপচারিতার মতো করে শ্রোতাদের কাছে গানের বিষয় ব্যাখ্যা করতেন।

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট