সহকারী শিক্ষক
১৩ ডিসেম্বর, ২০২৩ ০৯:৫২ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
একটি ঝরা ফুলের কাহিনী
২০০৬ সালে আমি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করি। সেখানে তৃতীয় শ্রেনির একটি ছাত্র ছিল, নাম তার ফয়সাল। দেখতে হালকা পাতলা ছিল, গায়ে থাকত হাটু পর্যন্ত লম্বা সাদা সার্ট। দেখলেই বুঝাযেত যে অত্যন্ত দরিদ্র ঘরের গ্রামের একটি পরিবারের সন্তান। নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসত কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি তেমন কোন আগ্রহ ছিলনা। যথারীতি বার্ষিক পরীক্ষায় ৬ বিষয়ের মধ্যে ৬টিতেই ফেল করে এবং সর্বমোট ১৪ নম্বর পায়।
আমি তার ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার পর জানতে পারি, তার বাবা একজন দিনমজুর। মায়ের অসুস্থতায় তিনি একাই পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করেন। ফয়সালের ছোট ছোট দুই ভাইবোন আছে। দারিদ্রতার কারণে ফয়সালের লেখাপড়া চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
আমি তার ব্যাপারে অভিভাবকদের সাথে কথা বলি এবং তাকে উৎসাহ প্রদান করি। ফলে ছেলেটি আস্তে আস্তে আমাদের সহযোগীতায় আগাতে থাকে। অত্যধিক দারিদ্রতার জন্য অবসরে পরের কাজ করে ছেলেটি তার লেখাপড়ার খরচ যোগাত। পরের বছর সে বার্ষিক পরীক্ষায় ১ নম্বরের জন্য প্রথম হতে পারেনি। এভাবেই সে এগুতে থাকে।
ইতিমধ্যে সে যখন ৫ম শ্রেণিতে উঠে তখন আমি বদলি হয়ে অন্য বিদ্যালয়ে চলে আসি। সমাপনী পরীক্ষায় ডিওটিতে গিয়ে সেই ছাত্রটির সাথে পরীক্ষার হলে দেখা হয়। এটাই ছিল তার সাথে আমার শেষ দেখা।
এভাবেই হত দারিদ্রতার মধ্যেও সে তার লেখাপড়ার খরচ নিজে যোগার করে লেখাপড়া চালিয়ে যায়। আমি অন্যান্য ছাত্রদের সাথে ওর খবরটাও মাঝে মাঝে নিতাম। ইতিমধ্যে সে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক পাশ করে। শুনে অনেক আনন্দ পেয়েছিলাম যে একটি পথহারা পাখিকে উড়তে শিখতে সহায়তা করেছিলাম।
কিন্তু হঠাৎ করে একদিন এক ছাত্রকে ফোন করে ওর খবর নিতেই ছাত্রটি কেদে ফেলে এবং বলে যে স্যার ও তো গত মাসে মারা গেছে। সেদিন সেই দূঃসংবাদটি শুনার পরে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম দিনমজুরের কাজ করতে গিয়ে ভারী ওজনের একটি বস্তা বহন করার সময় পরে যায় এবং বস্তাটি তার বুকের ওপর পরে তৎক্ষনাত মারা যায়। তখন সে কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল।
ফয়সালের মৃত্যুতে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছিলাম। তার কথা আমি কখনো ভুলতে পারব না। সে আমার কাছে একটি ঝরা ফুলের মতোই ছিল। যার সম্ভাবনা ছিল অনেক, কিন্তু দারিদ্র্য তাকে নিয়ে গেল চিরদিনের জন্য।
ফয়সালের মৃত্যু আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমাদের সমাজে এমন অনেক হতদরিদ্র পরিবার রয়েছে যারা তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার সুযোগ দিতে পারে না। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সকলের দায়িত্ব। আমরা যদি তাদেরকে সহযোগিতা করতে পারি, তাহলে হয়তো আরও অনেক ফয়সালের মতো প্রতিভাবান মানুষ তৈরি হবে।
ফয়সালের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। এবং আমাদের সকলকে তার মতো প্রতিভাবান মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।
গল্পের শেষে আমি আরও কিছু কথা যোগ করতে চাই।
ফয়সালের মৃত্যু একটি বেদনার্ত ঘটনা। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদেরকে শিক্ষা দিল যে, আমাদের সমাজে এখনও অনেক প্রতিভাবান মানুষ আছে যারা দারিদ্র্যের কারণে তাদের সম্ভাবনাকে বিকাশ করতে পারে না। আমরা যদি তাদেরকে সহযোগিতা করি, তাহলে তাদের জীবনকে আলোকিত করতে পারি।
ফয়সালের মতো প্রতিভাবান মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আমরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারি:
হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি