দৈনিক ইত্তেফাক
১২ জুন, ২০২৫
"শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা"
=======================================
একটা সময় ছিল যখন শিক্ষার মান নির্ধারিত হতো কতটা বই মুখস্থ করা গেল, কতটা নির্ভুলভাবে প্রশ্নের উত্তর লেখা গেল। সে সময় চক আর ডাস্টার-এ গড়ে উঠত শ্রেণিকক্ষ। কিন্তু আজ সময় বদলেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে শিক্ষা তার চিরাচরিত কাঠামোকে ভেঙে নতুন পথে হাঁটছে। সেই পথে এক নতুন আলো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial intelligence (AI)।
AI শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে আসে রোবটের ছবি, যন্ত্রের সাহায্যে চলা কোনো সুদূর ভবিষ্যতের কল্পনা। অথচ বাস্তবতা হলো, AI আমাদের চারপাশেই। গুগল ট্রান্সলেট থেকে শুরু করে ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট, এমনকি ইউটিউবের অ্যালগরিদম পর্যন্ত সবখানেই AI আমাদের প্রতিনিয়ত শেখার অভিজ্ঞতাকে নিয়ন্ত্রণ ও সমৃদ্ধ করছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় এর ব্যবহার মানে শুধু ডিজিটাল ক্লাস নয়, বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার এক নতুন দিগন্ত।
একজন শিক্ষার্থী কেমনভাবে শেখে, কোন বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ, কোথায় তার দুর্বলতা AI সে সব তথ্য বিশ্লেষণ করে তাকে ঠিক তার মতো করে শেখার অভিজ্ঞতা দিতে পারে। এই জায়গাটি এমনকি অভিজ্ঞ শিক্ষকও সব সময় অনুধাবন করতে পারেন না। সেখানে প্রযুক্তি হয় নিরব অথচ নির্ভুল সহকারী। AI ভিত্তিক শিক্ষামূলক অ্যাপ্লিকেশন বা প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে এমন অনেক কাজ করছে - কেউ ভাষা শেখাচ্ছে, কেউ গাণিতিক সমস্যা সহজ করছে, কেউ আবার শিক্ষার্থীকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখাচ্ছে।
তবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা যেমন বিস্তৃত, তেমনি এর কিছু দুর্বলতা ও ঝুঁকিও অস্বীকার করার নয়। মানবিক সম্পর্কের জায়গাটি এখানে তুলনামূলক দুর্বল। একজন শিক্ষকের স্পর্শ, একটুখানি অনুপ্রেরণা, দৃষ্টিতে ভরসা দেওয়ার মতো শক্তিশালী কিছু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিতে পারে না। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যদি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করা তাহলে সেখানে AI কখনোই একক ভূমিকা রাখতে পারে না। বরং এটি হতে পারে শিক্ষকের সহায়ক, বিকল্প নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সূচনালগ্নে। যদিও ‘মুক্তপাঠ’, ‘শিক্ষক বাতায়ন’, কিংবা কিছু বেসরকারি উদ্যোগ শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে, তবু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার এখানকার শিক্ষাপদ্ধতিতে সেভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এর পেছনে আছে একাধিক চ্যালেঞ্জ যেমন ইন্টারনেটের দুর্বল অবকাঠামো, গ্রামীণ এলাকায় ডিভাইসের অভাব, শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা, আর ভাষাগত সীমাবদ্ধতা।
তবু আশাবাদের জায়গা আছে। যদি এই AI ব্যবস্থাকে বাংলাভাষাভিত্তিক করে তোলা যায়, যদি শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, যদি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কম খরচে প্রযুক্তির সহায়তা পৌঁছানো যায় তবে AI হতে পারে শিক্ষায় সাম্যের বাহক।
এক শ্রেণিকক্ষে ৮০ জন শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে শেখানো যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে AI একেকজনকে আলাদা করে বুঝিয়ে দিতে পারে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য তো এটি যেন এক আশীর্বাদ, যেখানে ভয়েস কমান্ড বা টেক্সট-টু-স্পিচ ফিচার তাদের নতুন করে শেখার পথ দেখাতে পারে।
তবে এই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, শিক্ষকের জায়গা তাহলে কোথায়? বাস্তবতা হলো, শিক্ষক সব সময়ই থাকবেন শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে। AI হয়তো বিষয় বুঝিয়ে দেবে, সঠিক উত্তর খুঁজে দেবে, এমনকি দ্রুত মূল্যায়নও করবে। কিন্তু শিক্ষকই শেখাবেন কীভাবে ভুল থেকে শেখা যায়, কীভাবে নিজের মতো করে ভাবা যায়, কীভাবে মানুষ হওয়া যায়। শিক্ষকের ভূমিকা প্রযুক্তির যুগে আরও বিশ্লেষণধর্মী, আরও মানবিক, আরও গভীর হয়ে উঠছে।
আমাদের প্রয়োজন একটি ভারসাম্যমূলক ও দূরদর্শী চিন্তা, যেখানে প্রযুক্তি থাকবে সহায়ক শক্তি হিসেবে, আর শিক্ষা থাকবে মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সময়োপযোগী হয়ে উঠবার পথে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষকে আরও ভালো মানুষ করে তোলা। শিক্ষা তখনই সফল হবে, যখন প্রযুক্তি ও মানবিকতা একসঙ্গে চলবে হাত ধরাধরি করে।
রুবাইয়া সুলতানা
সহকারী শিক্ষক
হাফিজ আহমেদ উচ্চ বিদ্যালয়
বরুড়া, কুমিল্লা।