“আগামী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা”
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক মহামারি, কর্মসংস্থানের নতুন রূপ, এবং নৈতিক অবক্ষয়; এসব চ্যালেঞ্জ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। এই বাস্তবতা মোকাবেলায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষত মাধ্যমিক শিক্ষা, হতে হবে আরও গতিশীল, যুগোপযোগী এবং মানবিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, কোডিং ও ডিজিটাল দক্ষতা এখন ভবিষ্যতের কর্মজীবনের মূল চাবিকাঠি। পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সুশিক্ষিত ও কর্মঠ জনশক্তির কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুপ্তমেধা ও অবারিত সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে জ্ঞানের পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে হবে।
শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের প্রধান উপাদানগুলো হলো- শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষাক্রম, শিখন-শিক্ষণ পদ্ধতি, উপযুক্ত মূল্যায়ন, শিক্ষার প্রয়োজনীয় পরিবেশ এবং ধারাবাহিক পরিবীক্ষণ। এসব উপাদানের উন্নয়ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মানের টেকসই উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব। এক্ষেত্রে সকলের অংশীজনের অংশগ্রহণ সমান গুরুত্ব বহন করে।
বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তির অবারিত সম্ভাবনার যুগ। ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত প্রত্যেকটি মুঠোফোন তথ্যের গ্রন্থাগারও বটে। কিন্তু তথ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে জ্ঞানে রূপান্তর এবং জ্ঞানকে প্রক্রিয়াজাত করে প্রজ্ঞার স্তরে পৌঁছে দিতে হবে। আমাদের শিক্ষার সংকটের মূলে রয়েছে শিক্ষা সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ প্রাপ্তির অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অভিভাবকগণ সন্তানদের ফেলে দিয়েছে দোদুল্যমানতায়। প্রণিত কারিকুলাম, শিক্ষক, অভিভাবকরা পরীক্ষার অবস্থান থেকে এখনো বের হয়ে আসতে পারেননি। জ্ঞানচর্চা নয় বরং ফলাফল নিয়ে অভিভাবকদের গগনচুম্বী প্রত্যাশা এবং অপ্রাপ্তির হতাশা শিশুদের পারিবারিক জীবনকে বিষিয়ে তুলছে।
শিক্ষার্থীরা নিজের সৃজনশীল শক্তিকে কাজে না লাগিয়ে নোট বই মুখস্থ করে। যা প্রায়োগিক জ্ঞান বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায়। অনেক প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ও বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি না থাকায় নিয়মিত ব্যবহারিক ক্লাস হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের নানা বিষয় হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাছাড়া শিক্ষা উপকরণের অপ্রতুলতা, মানসম্পন্ন শ্রেণিকক্ষ, মাল্টিমিডিয়ার সুযোগ ও গ্রন্থাগারের অপর্যাপ্ততা, , শিক্ষকদের স্বল্প বেতন ও পদমর্যাদা, দুর্বল ও গ্রামীণ অবকাঠামো শিক্ষার্থীদের মেধা ও মনন বিকাশের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে। ভবিষ্যতের শিক্ষক হতে হবে প্রযুক্তিনির্ভর, গবেষণামুখী ও শিক্ষার্থী-মনস্ক। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে অন্বেষণকে উৎসাহিত করতে হবে।
শিক্ষকতার এই মহান পেশাটির সামাজিক মর্যাদা তেমন নেই, নেই আর্থিক নিরাপত্তাও। ফলে মেধাবীরা এই পেশাটিতে আকৃষ্ট হচ্ছে না। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ে পড়াতে হয় এবং দিনে প্রায় পাঁচ-ছয়টি ক্লাস নিতে হয়, কখনও একটানা। এ ছাড়া খাতা দেখা ও বিদ্যালয় পরিচালনার অন্যান্য দায়িত্ব মিলিয়ে শিক্ষকরা ক্লান্ত।
আমাদের দেশের জাতীয় শিক্ষা সেই ঔপনিবেশিক ধারাতেই রয়ে গেছে, ফলে আমরা শিক্ষাকে এখনো আশানুরূপ মানে নিয়ে যেতে পারিনি! বিশেষ করে দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা এখনো পশ্চাৎপদই রয়ে গেছে। ফলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে। শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাতে রয়েছে বিশাল তারতম্য, যা কমিয়ে আনা জরুরী।
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে মোকাবেলায় কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের যদি স্কুল পর্যায় থেকে কর্মমুখী শিক্ষার আওতায় আনা যায় তাহলে এই জাতি অনেক অসাধ্যকে সাধন করে ফেলবে খুব সহজে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, শিক্ষকতা পেশাকে সম্মানজনক অবস্থানে উন্নীত করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, সুষ্ঠু নিয়োগ ও পদোন্নতি, শিক্ষক দায়িত্ব ও অধিকার সংরক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, শৃঙ্খলাবিধান এবং পেশাগত স্বাধীনতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ একটি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পরিবেশবান্ধব চিন্তা, অভিযোজন ক্ষমতা ও সচেতনতা শেখাতে হবে। প্রযুক্তির প্রভাব যত বাড়ছে, মানবিক মূল্যবোধ তত কমছে। তাই নৈতিক শিক্ষা, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরী। আমাদের শিক্ষার্থীরা শুধু দেশের নয়, বৈশ্বিক শ্রমবাজারেও প্রতিযোগিতা করবে। এজন্য তাদেরকে ভাষাগত দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও নেতৃত্বগুণে দক্ষ হতে হবে।
মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের পাশাপাশি দক্ষতা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতি অর্জন করে। আগামী বিশ্ব হবে জ্ঞাননির্ভর, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মূল্যবোধনির্ভর। বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা যদি এই তিন ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়, তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীরাই হবে আগামী বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী নাগরিক। আমাদের শিক্ষকরা যদি পরিবর্তনের দূত হয়ে কাজ করে, তবে বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা হবে সেই আলো, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করবে- আর আমরা গর্বের সাথে বলতে পারব,“বাংলাদেশ প্রস্তুত আগামী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়।”
ইউনেস্কো, ২০২৩ মতে, আগামী দুই দশকে বিশ্বের প্রায় ৬০% পেশা প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার উপর নির্ভর করবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সর্বশেষ ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯২ মিলিয়ন চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার পথে, তেমনি আবার ১৭০ মিলিয়ন নতুন ধরনের চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ নিট হিসাবে ৭৮ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান যুক্ত হতে চলেছে। ভবিষ্যতের কর্মজীবন হবে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতার সমন্বিত মঞ্চ। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদেরও প্রস্তুত হতে হবে “শুধু চাকরির জন্য নয়, বরং উদ্ভাবনের জন্য।”
বর্তমানে দেশে প্রায় ৮০% মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও, ইন্টারনেট সংযোগ আছে মাত্র ৪২% বিদ্যালয়ে (ব্যানবেইস, ২০২৩)। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ একা দেশের পক্ষে মোকাবেলা সম্ভব নয়- কিন্তু সুশিক্ষিত, দক্ষ ও মানবিক প্রজন্ম তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ নিজ অবস্থানেই এক নতুন দৃষ্টান্ত গড়বে। আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা যদি হয় জ্ঞান, প্রযুক্তি ও মূল্যবোধের সমন্বিত কেন্দ্র, তবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ নয়- সেগুলোই হবে আমাদের সুযোগ। ২০২২ সালে ইউনিসেফ এর এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ৩০% কিশোর-কিশোরী মানসিক চাপে ভুগছে। সুতরাং, পাঠ্যসূচির পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও কাউন্সেলিং অপরিহার্য।
শিক্ষক হচ্ছেন পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। একজন সদ্য শিক্ষার্থী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে প্রশিক্ষণবিহীন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করায় শিক্ষকতার আদর্শ, শিখন, শিক্ষণ এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ঘাটতির ফলে শিখনফল আশানুরুপ পাওয়া যায় না। তথ্যপ্রযুক্তি ও নতুন শিক্ষাদর্শনের সাথে সঙ্গতি রাখতে প্রতি বছর এনটিআরসি এর মাধ্যমে নিয়োগ প্রাপ্ত শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠানোর পূর্বেই বেসরকারি শিক্ষকদের পেডাগোজির উপর প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত বলে মনে করি। এনটিআরসিএ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, এনসিটিভি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে শিক্ষক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে।
বিদেশ শিক্ষায় নজর দিলে, ফিনল্যান্ড শিক্ষার্থীদের উপর পরীক্ষার চাপ খুব কম। সৃজনশীলতা, দলগত কাজ, চিন্তাশক্তি ও সুখী শিক্ষাজীবনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সব শিশু একই মানের শিক্ষা পায়- শহর বা গ্রামভেদে পার্থক্য নেই। জাপানের শিক্ষা খুবই শৃঙ্খলাপূর্ণ ও সময়নিষ্ঠ। প্রাথমিক পর্যায়ে নৈতিকতা, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক দায়িত্ব শেখানো হয়। দেয়া হয় প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর আগ্রহ অনুযায়ী বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে। ব্যবহারিক শিক্ষা, প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন ও গবেষণায় জোর দেওয়া হয়। শিক্ষকদের উচ্চমানের প্রশিক্ষণ ও বেতন দেওয়া হয়। মানসিক স্বাস্থ্য সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। অপরদিকে বাংলাদেশ শিক্ষা পদ্ধতি মুখস্থভিত্তিক ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক, মূল্যায়ন ব্যবস্থা লিখিত ও পরীক্ষানির্ভর, প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত, শিক্ষকের মর্যাদা ও প্রশিক্ষণ একান্তই নগন্য, শিক্ষায় বৈষম্য শহর-গ্রামভেদে স্পষ্ট, শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত।
বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে-প্রযুক্তি, জলবায়ু, অর্থনীতি ও কর্মক্ষেত্রে আসছে নানা রকম নতুন চ্যালেঞ্জ। এসব পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে মাধ্যমিক শিক্ষাকে হতে হবে আরও আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও গবেষণামুখী। আধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তি, যোগ্য শিক্ষক ও সৃজনশীল পাঠ্যক্রমের সমন্বয়ে গড়ে উঠুক এমন এক মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে আগামী পৃথিবীর নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য করে তুলবে।
মোঃ বিল্লাল হোসেন জুয়েল, সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বাংলাবাজার ফাতেমা খানম কলেজ, ভোলা