প্রভাষক
১০ জুন, ২০২৬ ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ
চন্দ্রপাহাড়ের ডাক
চন্দ্রপাহাড়ের ডাক: কর্ণফুলীর বুকে এক নতুন অধ্যায়
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কোদলা আর শিলক গ্রামের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে চলেছে প্রমত্তা কর্ণফুলী নদী। ওপারে দূরে দাঁড়িয়ে আছে সবুজে ঘেরা চন্দ্রপাহাড়। এই অঞ্চলের মানুষের জীবন যেমন পাহাড়ি ঝরনার মতো চঞ্চল, তেমনি কর্ণফুলীর জোয়ার-ভাটার মতোই অনিশ্চিত।
বছরের পর বছর ধরে এই দুই গ্রামের মানুষের ভরসা ছিল একটি বড় কাঠের সাম্পান এবং তার প্রবীণ মাঝি, রহমত সর্দার। কিন্তু বয়স আর অসুস্থতার কারণে সর্দার এবার অবসরের সিদ্ধান্ত নিলেন। ঘাটের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে—এই নিয়ে পঞ্চায়েত বসল। শেষ পর্যন্ত দুই তরুণকে বেছে নেওয়া হলো: জাবেদ এবং আরিফ।
জাবেদ: দীর্ঘদেহী এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী। পাহাড় থেকে ভারী লাকড়ির বোঝা একাই পিঠে করে নামিয়ে আনতে পারত সে। তবে জাবেদের অহংকার ছিল আকাশচুম্বী, সে ভাবত শক্তিই সব।
আরিফ: শান্ত, পরোপকারী এবং ভীষণ বিচক্ষণ। কর্ণফুলীর কোন বাঁকে কখন চোরাবালি জাগে, আর মেঘের রঙ দেখে কখন পাহাড়ি ঢল নামবে—তা আরিফের নখদর্পণে ছিল।
রহমত সর্দার দুজনকে ডেকে বললেন, "রাঙ্গুনিয়ার এই ঘাট সামলানো শুধু সাম্পান চালানো নয়, মানুষের জীবন বাঁচানো। আজ আষাঢ়ের ঘোর অমাবস্যা, কাপ্তাইয়ের জল ছাড়ায় নদী উত্তাল। তোমরাই আজ সদরের হাটের মানুষদের ওপারে পৌঁছে দেবে। যে নিরাপদে ফিরবে, সেই হবে এই ঘাটের নতুন সর্দার।"
সেই কালরাতের পরীক্ষা
বিকেলের শেষ আলোয় দুই তরুণের সাম্পানে মানুষ আর হাটের সওদা বোঝাই করা হলো। জাবেদ নিজের শক্তির বড়াই করে সবার আগে সাম্পান ভাসাল। কিন্তু মাঝনদীতে পৌঁছাতেই হঠাৎ চন্দ্রপাহাড়ের দিক থেকে ধেয়ে এলো প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড়। সাথে যোগ হলো ওপর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোত।
জাবেদের সাম্পানের পরিস্থিতি:
ঢেউয়ের ধাক্কায় জাবেদের সাম্পান দুলতে লাগল। জাবেদ রাগে আর অহংকারে একাই জোরে বৈঠা টানতে লাগল। যাত্রীরা ভয়ে চিৎকার শুরু করলে সে ধমক দিয়ে বলল, "সবাই চুপচাপ বসে থাকো! আমার চেয়ে শক্তিশালী কেউ নেই, আমি একাই পার করব।" কিন্তু স্রোতের তীব্রতার কাছে জাবেদের গায়ের জোর বেশিক্ষণ টিকল না। সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল, আর যাত্রীরা আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করায় সাম্পানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সেটি একটি ডুবোচরের দিকে ভেসে যেতে লাগল।
আরিফের সাম্পানের পরিস্থিতি:
অন্যদিকে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আরিফ এক মুহূর্তের জন্যও মাথা গরম করল না। সে জানত, প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তির সামনে একা গায়ের জোরে জেতা অসম্ভব। সে অত্যন্ত শান্ত গলায় চাটগাঁইয়া ভাষায় সবাইকে অভয় দিয়ে বলল—"অনরা কেউ ডর ন পাইয়ুন, আঁরা বেগগুন মিলিয়ি পার হইয়ুম" (আপনারা কেউ ভয় পাবেন না, আমরা সবাই মিলে পার হব)।
আরিফ দ্রুত সবাইকে একতাবদ্ধ করে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে দিল:
সে সাম্পানের মাঝের শক্তপোক্ত দুজনকে বলল ভারী বৈঠা জোড়া ধরে তাকে সাহায্য করতে।
নদীর দিক চিনতে দুজনকে বলল হাতের টর্চ জ্বালিয়ে তীরের আলো খুঁজতে।
বাকিদের বলল হাটের ভারী বস্তাগুলো সাম্পানের ঠিক মাঝখানে চেপে ধরে রাখতে, যাতে কোনোভাবেই নৌকা কাত না হয়।
আরিফ নিজে হালের বৈঠা শক্ত করে ধরে সবাইকে নির্দেশনা দিতে লাগল। তার এই শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী রূপ দেখে যাত্রীরা ভয় ভুলে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে লাগল।
প্রকৃত নেতার জয়
জাবেদ একাই সব কৃতিত্ব নিতে গিয়ে মাঝনদীতে সাম্পান প্রায় ডুবিয়ে ফেলেছিল। শেষ মুহূর্তে কোদলা গ্রামের অন্য মাঝিরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। আর আরিফ তার দলগত প্রচেষ্টা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্তের কারণে সবাইকে নিয়ে নিরাপদে নদীর ঘাটে এসে পৌঁছায়।
নদীতীরে সাম্পান ভেড়ানোর পর বৃদ্ধ রহমত সর্দার আরিফকে জড়িয়ে ধরে বললেন:
"নেতৃত্ব মানে গায়ের জোর বা একনায়কতন্ত্র নয় রে পুত। আসল নেতা তো সেই—
যে সংকটের সময় নিজে শান্ত থেকে অন্যকে ভরসা দিতে পারে।
যে একা একনায়ক হতে চায় না, বরং সবাইকে সাথে নিয়ে একটা ‘টিম’ বানিয়ে কাজ করে।
যার মধ্যে অহংকার থাকে না, থাকে মানুষের প্রতি সহমর্মিতা।"
সেদিন থেকে আরিফ শুধু সেই ঘাটের সর্দারই হলো না, বরং গোটা অঞ্চলের মানুষের কাছে নেতৃত্বের এক জীবন্ত আদর্শ হয়ে উঠল।