সহকারী শিক্ষক
১০ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৩৫ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ সপ্তম
বিষয়ঃ সপ্তবর্না বাংলা
অধ্যায়ঃ অধ্যায়-১১ (কবিতা)
'কুলি-মজুর' সাম্যবাদী ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, কালজয়ী এবং মানবিক কবিতা। এটি তাঁর বিখ্যাত 'সর্বহারা' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এই কবিতায় কবি সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও শোষিত শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে এবং পুঁজিপতি বা শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রকাশ করেছেন।
নিচে কবিতাটির মূলভাব ও প্রধান দিকগুলো সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
কবিতার শুরুতে কবি একটি বাস্তব ঘটনার বর্ণনা দেন। কবি রেলে চড়তে গিয়ে দেখলেন, এক বাবুসাব (ধনী বা উচ্চবিত্ত ব্যক্তি) একজন কুলি শ্রমিককে সামান্য কারণে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিল। শ্রমিকের চোখ ফেটে জল চলে এলো। এই নিষ্ঠুর দৃশ্য দেখে কবির মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম নেয় এবং তিনি প্রশ্ন তোলেন—টাকা আর ক্ষমতার জোরে এভাবে মানুষের মনুষ্যত্বকে কতদিন পিষে মারা হবে?
কবি মনে করিয়ে দেন, আজকের এই আধুনিক সভ্যতা—রেলগাড়ি, কলকারখানা, অট্টালিকা, বড় বড় রাস্তা—সবকিছুই তৈরি হয়েছে এই কুলি, মজুর আর মেহনতি মানুষের হাত ধরে। তাদের হাড়ভাঙা খাটুনি আর রক্তের বিনিময়েই মানবসভ্যতা এগিয়ে চলেছে। অথচ তারাই সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত, অপদস্থ এবং শোষিত।
সভ্যতার আসল কারিগর: কবি খুব স্পষ্ট করে বলেছেন যে, যারা হাতুড়ি, শাবল আর কোদাল দিয়ে পাহাড় কেটে পথ বানায়, ইঁট ধুয়ে রাজপ্রাসাদ গড়ে তোলে, তারাই সভ্যতার আসল কারিগর। কবি তাদের বলেছেন 'মহাপথিক'।
শোষক শ্রেণীর নিষ্ঠুরতা: ধনী ও পুঁজিপতি শ্রেণী (যাদের কবি 'বাবুসাব' বা 'ঠগ' বলেছেন) নিজেরা কোনো পরিশ্রম না করে শ্রমিকদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। তারা শ্রমিকদের সামান্য মজুরি দিয়ে নিজেরা কোটিপতি হচ্ছে, অথচ তাদের মানুষ বলেই গণ্য করতে চায় না।
সাম্যের আহ্বান ও আগমনী বার্তা: কবি বিশ্বাস করেন যে এই অন্যায় বেশিদিন চলবে না। যুগ যুগ ধরে জমে থাকা এই শোষণের অবসান ঘটবে। দিন বদলের সময় এসেছে, যেখানে শ্রমজীবী মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান ফিরে পাবে।
"দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি ব'লে এক বাবু সা'ব তারে ঠেলে দিল নিচে ফেলে! চোখ ফেটে জল এল, এমনি ক'রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?"
"তোমার অট্টালিকা কার খুনে রাঙা?—ঠাওর ক'রে দেখ, প্রতি ইঁটে আছে লেখা!"
"আসিতেছে শুভদিন, হাতে হাত রেখে কেটেছে যাহারা পাথরের প্রাচীর, দিন!"
'কুলি-মজুর' কবিতার মূল শিক্ষা হলো—শ্রেণী ও পেশা নির্বিশেষে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা। কোনো কাজই ছোট নয়। সমাজে যারা শ্রম দিয়ে আমাদের জীবনকে সহজ করে তুলছেন, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তাদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করাই একটি মানবিক সমাজের দায়িত্ব।