সহকারী শিক্ষক
১১ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৫১ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ নবম
বিষয়ঃ পৌরনীতি ও নাগরিকতা
অধ্যায়ঃ অধ্যায় ১
রাষ্ট্র কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করার জন্য যে কয়েকটি মতবাদ রয়েছে, তার মধ্যে সামাজিক চুক্তি মতবাদ অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় মতবাদ।
এই মতবাদের মূল কথা হলো— রাষ্ট্র কোনো দৈব বা প্রাকৃতিক কারণে তৈরি হয়নি, বরং সমাজের মানুষ নিজেদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র মানুষের তৈরি একটি কৃত্রিম প্রতিষ্ঠান।
এই মতবাদটিকে ভালোভাবে বুঝতে হলে ৩টি মূল ধাপ বা ধারণা জানতে হবে:
রাষ্ট্র সৃষ্টির পূর্বে মানুষ যেখানে বসবাস করত, তাকে বলা হতো ‘প্রকৃতির রাজ্য’। তখন কোনো আইন, আদালত, পুলিশ বা শাসক ছিল না। মানুষ সম্পূর্ণ প্রকৃতির নিয়মে চলত। তবে এই প্রকৃতির রাজ্য কেমন ছিল, তা নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কারও মতে এটি ছিল শান্তির, আবার কারও মতে এটি ছিল যুদ্ধ ও অশান্তির।
কোনো শাসন ব্যবস্থা না থাকায় একসময় মানুষের জীবন অনিরাপদ হয়ে পড়ে। শক্তিশালীরা দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করতে শুরু করে (যাকে বলা হতো 'মাৎস্যন্যায়' বা জোর যার মুল্লুক তার অবস্থা)। এই চরম অশান্তি, বিশৃঙ্খলা এবং জান-মালের নিরাপত্তাহীনতা থেকে বাঁচতে মানুষ একটি স্থায়ী সমাধানের কথা চিন্তা করে।
নিরাপত্তা ও শান্তির উদ্দেশ্যে প্রকৃতির রাজ্যের সমস্ত মানুষ এক জায়গায় মিলিত হয়ে নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তি (Contract) করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, সবাই তাদের নিজেদের শাসন করার ক্ষমতা একজন ব্যক্তি বা ব্যক্তিসংসদের (শাসক) হাতে তুলে দেয়। বিনিময়ে শাসক সবার জান-মাল রক্ষা এবং শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব নেন। এভাবেই চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
সামাজিক চুক্তি মতবাদের মূল প্রবক্তা বা চিন্তাবিদ হলেন তিনজন। তাঁদের একত্রে "চুক্তিাবাদী" বলা হয়:
টমাস হব্স (Thomas Hobbes): ইংল্যান্ডের এই দার্শনিকের মতে, প্রকৃতির রাজ্য ছিল ভীষণ হিংস্র, স্বার্থপর ও যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত। মানুষ নিজের জীবন বাঁচাতে চুক্তির মাধ্যমে একজন পরম ও চরম ক্ষমতাশালী শাসক (স্বৈরাচারী রাজা) নিয়োগ করে।
জন লক (John Locke): তিনিও ইংল্যান্ডের দার্শনিক ছিলেন। তাঁর মতে, প্রকৃতির রাজ্য প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরবর্তীতে সম্পত্তির অধিকার নিয়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তাই মানুষ চুক্তি করে। লকের মতে, শাসক যদি জনগণের অধিকার রক্ষা করতে না পারেন, তবে জনগণ তাঁকে পরিবর্তন করতে পারে (গণতন্ত্রের ভিত্তি)।
জঁ জাক রুসো (Jean-Jacques Rousseau): ফ্রান্সের এই বিখ্যাত দার্শনিকের মতে, প্রকৃতির রাজ্যের মানুষ প্রথমে খুব স্বাধীন ও সরল ছিল। কিন্তু সভ্যতার বিকাশ ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির কারণে সমাজে বৈষম্য তৈরি হয়। তাই মানুষ নিজেদের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার জন্য চুক্তি করে রাষ্ট্র গঠন করে। রুসোর বিখ্যাত উক্তি ছিল— "মানুষ স্বাধীনভাবে জন্মগ্রহণ করে, কিন্তু সর্বত্র সে শৃঙ্খলিত।"
গুরুত্ব: এই মতবাদটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রাজাদের "ঐশ্বরিক ক্ষমতা" (যে রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন)—এই ভুল ধারণাটি ভেঙে দেয় এবং প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের সম্মতি।
সমালোচনা: আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে ঐতিহাসিক দিক থেকে সত্য মনে করেন না। কারণ, আদিম যুগের মানুষ হঠাৎ করে একদিন একসাথে বসে এত জটিল রাজনৈতিক চুক্তি করে রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলবে—তা বাস্তবসম্মত নয়। এটি একটি কাল্পনিক মতবাদ।