Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

২২ জুলাই, ২০২৬ ১২:২৪ অপরাহ্ণ

দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে ইন্টারনেটের ভূমিকা

দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে ইন্টারনেটের ভূমিকা

মনিরুল হক,

একটা সময় ছিল যখন একটা সরকারি ফরম সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হতো, ব্যাংকে টাকা পাঠাতে পুরো একটা দিন খরচ হয়ে যেত, আর অচেনা জায়গায় রাস্তা খুঁজে পেতে পথচারীর কাছে বারবার জিজ্ঞেস করতে হতো। আজকের বাংলাদেশে এই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। ইন্টারনেট এখন আর শুধু বিনোদন বা যোগাযোগের মাধ্যম নয়এটি হয়ে উঠেছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা সমাধানের একটি অপরিহার্য হাতিয়ার। শহর থেকে গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হাসপাতাল, কৃষিক্ষেত্র থেকে সরকারি অফিসসর্বত্র ইন্টারনেট আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করে তুলেছে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, যাদের একটি বড় অংশ মোবাইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংযুক্ত। এই সংযোগ শুধু তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম নয়, বরং একজন সাধারণ নাগরিকের জীবনের বাস্তব সমস্যা সমাধানের সেতুবন্ধন।

শিক্ষাক্ষেত্রে ইন্টারনেটের অবদানঃ

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইন্টারনেট এক বিপ্লব ঘটিয়েছে। করোনা মহামারির সময় যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, তখন সংসদ টিভি, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পাঠদান চালিয়ে যেতে পেরেছিল। আজও

  • অনলাইন শিক্ষা উপকরণ: শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে পাঠ্যপুস্তক, প্রশ্নপত্র, ফলাফলসবকিছু এখন কয়েক ক্লিকেই পাওয়া যায়।

  • ইউটিউব ও ফেসবুক ভিত্তিক শিক্ষামূলক কনটেন্ট: দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখন ঢাকার সেরা শিক্ষকদের ক্লাস দেখতে পারছে বিনামূল্যে।

  • ভর্তি ও পরীক্ষার আবেদন: এসএসসি, এইচএসসি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত সবকিছু এখন অনলাইনে সম্পন্ন হয়, যা সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় করে।

  • উচ্চশিক্ষার সুযোগ: কোর্সেরা, edX-এর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স এখন হাতের মুঠোয়।

স্বাস্থ্যসেবায় ইন্টারনেটের ভূমিকাঃ

গ্রামীণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ, আর এখানেই ইন্টারনেট এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

  • টেলিমেডিসিন সেবা: দূরবর্তী অঞ্চলের রোগীরা এখন ভিডিও কলের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছেন, যা আগে কল্পনাতীত ছিল।

  • স্বাস্থ্য তথ্য প্রাপ্তি: রোগের লক্ষণ, প্রাথমিক চিকিৎসা, ওষুধের তথ্যএসব বিষয়ে দ্রুত সচেতনতামূলক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনে।

  • হাসপাতালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং: বড় বড় হাসপাতালে এখন অনলাইনে সিরিয়াল বুকিং করা যায়, ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন কমেছে।

  • মহামারি মোকাবিলা: কোভিড-১৯ এর সময় টিকা নিবন্ধন থেকে শুরু করে সংক্রমণের সর্বশেষ তথ্যসবকিছুই মানুষ ইন্টারনেটের মাধ্যমে পেয়েছে।

আর্থিক লেনদেন ও মোবাইল ব্যাংকিংঃ

বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির (financial inclusion) ক্ষেত্রে ইন্টারনেট-নির্ভর সেবাগুলো এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।

  • বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস: গ্রামের একজন কৃষকও এখন শহরে থাকা সন্তানের কাছে মুহূর্তেই টাকা পাঠাতে পারেন।

  • অনলাইন ব্যাংকিং: বিল পরিশোধ, ফান্ড ট্রান্সফার, অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স চেক করাসবকিছুই এখন ব্যাংকে না গিয়ে করা সম্ভব।

  • ই-কমার্স ও ডিজিটাল পেমেন্ট: দারাজ, চালডাল, ফেসবুক পেজভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমে মানুষ ঘরে বসেই কেনাকাটা ও পেমেন্ট করতে পারছেন।

কৃষিক্ষেত্রে ইন্টারনেটের প্রভাবঃ

বাংলাদেশ মূলত কৃষিনির্ভর একটি দেশ, আর এখানেও ইন্টারনেট এনেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।

  • আবহাওয়ার পূর্বাভাস: কৃষকরা এখন মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সঠিক আবহাওয়ার তথ্য পেয়ে ফসল রোপণ ও কাটার সময় নির্ধারণ করতে পারেন।

  • বাজারদর জানা: বিভিন্ন অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের সর্বশেষ বাজারদর জেনে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাচ্ছে।

  • কৃষি পরামর্শ সেবা: সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন হেল্পলাইন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষকরা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পাচ্ছেন।

সরকারি সেবা প্রাপ্তি সহজীকরণঃ

"ডিজিটাল বাংলাদেশ" ও পরবর্তীতে "স্মার্ট বাংলাদেশ" ভিশনের আওতায় সরকারি সেবাগুলো ধীরে ধীরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

  • জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন: এখন অনলাইনে আবেদন করা যায়।

  • পাসপোর্ট আবেদন: ই-পাসপোর্ট সেবার মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া অনেকটাই সহজ ও স্বচ্ছ হয়েছে।

  • ভূমি সেবা: জমির খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করএসব সেবা এখন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে, যা আগে ভূমি অফিসে গিয়ে দুর্ভোগের কারণ ছিল।

  • ই-জিপি (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট): সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কর্মসংস্থান ও আয়ের নতুন দুয়ারঃ

ইন্টারনেট বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

  • ফ্রিল্যান্সিং: বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ফ্রিল্যান্সিং দেশ হিসেবে পরিচিত। গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট রাইটিংএসব কাজ করে অনেক তরুণ-তরুণী স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

  • অনলাইন উদ্যোক্তা: ফেসবুক পেজ বা ই-কমার্স সাইটের মাধ্যমে ছোট ছোট ব্যবসা গড়ে তুলে অনেকে আত্মকর্মসংস্থান তৈরি করছেন।

  • রিমোট জব: বিদেশি কোম্পানিতে ঘরে বসেই কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ভূমিকা রাখছে।

যোগাযোগ ও সামাজিক সংযোগঃ

প্রবাসী পরিবারের কথা চিন্তা করলেই বোঝা যায় ইন্টারনেট কতটা গুরুত্বপূর্ণ। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, মেসেঞ্জারের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিদিন পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে পারছেনএটি এক সময় কল্পনাও করা যেত না। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়া, দুর্যোগকালীন তথ্য আদান-প্রদান, স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে সংযুক্ত থাকাএসব ক্ষেত্রেও ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দৈনন্দিন ছোট ছোট সমস্যা সমাধানে ইন্টারনেটঃ

বড় বড় খাতের বাইরেও আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সমস্যাতেও ইন্টারনেট অবিশ্বাস্য রকম কাজে আসে

  • গুগল ম্যাপের মাধ্যমে অচেনা রাস্তা খুঁজে বের করা

  • রান্নার রেসিপি থেকে শুরু করে ঘরোয়া মেরামতের টিউটোরিয়াল দেখা

  • রাইড শেয়ারিং অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত যানবাহন পাওয়া

  • ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে খাবার অর্ডার করা

  • বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি) অনলাইনে পরিশোধ করা

চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতাঃ

তবে এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে, যেগুলো আলোচনা না করলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে

  • ডিজিটাল বিভাজন (Digital Divide): শহর ও গ্রামের মধ্যে ইন্টারনেট প্রাপ্তি ও ব্যবহারের দক্ষতায় এখনো বড় ফারাক রয়েছে।

  • ইন্টারনেটের মূল্য ও গতি: তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল ডেটা প্যাকেজ এবং অনেক অঞ্চলে ধীরগতির সংযোগ এখনো একটি বাধা।

  • ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব: বিশেষত প্রবীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের দক্ষতা কম।

  • ভুল তথ্য ও গুজব: সহজলভ্য ইন্টারনেট কখনো কখনো অপব্যবহার হয়ে ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মাধ্যমও হয়ে ওঠে।

  • সাইবার নিরাপত্তা: অনলাইন প্রতারণা, তথ্য চুরির মতো ঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে।

 

সামগ্রিকভাবে বিচার করলে বলা যায়, ইন্টারনেট আজ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যাংকিং, কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ছোট ছোট প্রয়োজন পূরণ পর্যন্তপ্রতিটি ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট আমাদের সমস্যা সমাধানের গতি ও সহজতা বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এই সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছে দিতে হলে ইন্টারনেটের মূল্য সহনশীল রাখা, গ্রামীণ অঞ্চলে সংযোগ সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির উপর জোর দিতে হবে। "স্মার্ট বাংলাদেশ" গড়ার পথে ইন্টারনেট শুধু একটি প্রযুক্তিগত মাধ্যম নয়, বরং একটি সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবেই বিবেচিত হওয়া উচিত।

 

মোঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক

আমলাবাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

০১৭২২ ২৭৩২৭২

 

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট