Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

২৬ জুলাই, ২০২৬ ১০:৫২ অপরাহ্ণ

অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়: ‘বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠী’ অধ্যায়ের পূর্ণাঙ্গ রিভিশন ও বিশেষ হ্যান্ডনোট

নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী এমন এক জনগোষ্ঠী, যাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক আচার-আচরণ, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্য রয়েছে এবং যারা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে পরিচয় দেয়, তাদেরকে নৃগোষ্ঠী (Ethnic group) বলা হয়।
নৃগোষ্ঠীর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
• সাধারণ ইতিহাস ও ঐতিহ্য: নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের একটি শেয়ার করা অতীত বা যৌথ ইতিহাস থাকে।
• স্বতন্ত্র সংস্কৃতি: এদের নিজস্ব জীবনধারা, পোশাক-আশাক, খাদ্যভ্যাস, বিবাহরীতি এবং ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসব থাকে।
• নিজস্ব ভাষা বা উপভাষা: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা বা কথ্য ভাষা থাকে।
• ভৌগোলিক সীমানা: এরা সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল বা প্রাকৃতিক পরিবেশে একত্রে বসবাস করে বা গড়ে ওঠে।
• আত্মপরিচয়: ওই গোষ্ঠীর প্রতিটি সদস্য নিজেদের একই দলের অংশ বলে মনে করে এবং নিজেদের একটি আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে।

উদাহরণ: বাংলাদেশে বসবাসকারী বাঙালি, চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো—এদের প্রতিটিই আলাদা আলাদা নৃগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
পাঠ-১: বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভৌগোলিক অবস্থান
বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের নৃগোষ্ঠীর মানুষ বাস করে পাহাড়ি ও সমতলবাসী । পাহাড়িদের অধিকাংশই দক্ষিণ-পূর্বাংশের পার্বত্য জেলাগুলোতে বাস করে, আর সমতলবাসীরা দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বাস করে ।
উৎস অনুসারে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান নৃগোষ্ঠীর নাম, আবাসস্থল এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের একটি তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো:
শ্রেণিবিভাগ: দুই ধরনের ১. পাহাড়ি নৃগোষ্ঠী (দক্ষিণ-পূর্ব পার্বত্য) ও ২.  সমতলবাসী নৃগোষ্ঠী (উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম)।
উল্লেখযোগ্য: বেশিরভাগ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী নৃতাত্ত্বিকভাবে মঙ্গোলীয় শ্রেণীর; সাঁওতালরা অস্ট্রালয়েড শ্রেণীর।
চাকমা, মারমা: রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি — মঙ্গোলীয়।
গারো: বৃহত্তর ময়মনসিংহ (শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল) ও গাজীপুর — মঙ্গোলীয়।
সাঁওতাল: রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া — অস্ট্রালয়েড/সমতলবাসী।
রাখাইন: পটুয়াখালী, বরগুনা, কক্সবাজার — মঙ্গোলীয় (মিয়ানমার থেকে আগত)।
খাসি, মণিপুরি: বৃহত্তর সিলেট — মঙ্গোলীয়।
ওরাওঁ, মাহালি: দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, বগুড়া — সমতলবাসী।
ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা: পার্বত্য চট্টগ্রাম — মঙ্গোলীয়।

পাঠ-২: চাকমা
সারাংশ: চাকমারা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নৃগোষ্ঠী, যারা মূলত রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে বাস করে ।
• সামাজিক: চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। কয়েকটি পরিবার নিয়ে 'আদাম' বা পাড়া গঠিত হয়, যার প্রধান হলেন 'কার্বারি' ।
• অর্থনৈতিক: এদের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ, যাকে ‘জুম’ চাষ বলা হয় ।পাহাড়ি অঞ্চলে বন বা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে কয়েক বছর ফসল উৎপাদন করে পরে অন্য স্থানে গিয়ে চাষ করার পদ্ধতিকে জুম চাষ বলে।এ পদ্ধতিতে প্রথমে পাহাড়ের একটি অংশের ঝোপঝাড় ও ছোট গাছ কেটে শুকিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়। এরপর সেই জমিতে কয়েক বছর ফসল চাষ করা হয়। জমির উর্বরতা কমে গেলে কৃষকেরা অন্য একটি পাহাড়ি জমিতে গিয়ে একইভাবে চাষ শুরু করেন। এই পদ্ধতিকেই জুম চাষ বলা হয়।
◦ পোশাক: চাকমা মেয়েদের পরনের কাপড়ের নাম ‘পিনোন’‘হাদি’ । আগে চাকমা পুরুষেরা এক রকম মোটা সুতার জামা, ধুতি ও গামছা পরত এবং মাথায় এক রকম পাগড়ি বাঁধত, তবে বর্তমানে তারা শার্ট, প্যান্ট ও লুঙ্গি পরিধান করে।
◦ খাবার: প্রধান খাদ্য ভাত । তারা ভাতের সাথে মাছ, মাংস ও শাকসবজি খেতে ভালোবাসে। তাদের প্রিয় খাদ্য হচ্ছে ‘বাঁশ কোড়ুল’, যা দিয়ে তারা বেশ কয়েক ধরনের রান্না করে ।

• সাংস্কৃতিক: চাকমাদের প্রধান উৎসবের নাম ‘বিজু’
পাঠ-৩: গারোদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের বৈশিষ্ট্যগুলো বর্ণনা
বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসবাসকারী গারো নৃগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হলো:
১. সামাজিক জীবন
• মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা: পরিবারে মা হলেন প্রধান; বংশ-উপাধি মা থেকে যায়।
• উত্তরাধিকার: সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রধানত নারীরাই পায়; সর্বকনিষ্ঠ কন্যা প্রধান উত্তরাধিকারী।
• সংসার ও সিদ্ধান্ত: পরিবারের পিতা বা মায়ের ভাই (মামা) সংসার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখেন।
• মাহারি ও বিবাহ-বিধি: মাহারি (মাতৃগোত্র) ভিত্তিক; একই মাহারির মধ্যে পুরুষ–নারীর বিয়ে নিষিদ্ধ। প্রধান পাঁচ মাহারি: সাংমা, মারাক, মোমিন, শিরা, আরেং।
২. অর্থনৈতিক জীবন
• প্রধান জীবিকা: কৃষি।
• চাষপদ্ধতি ও ফসল: ঐতিহ্যগত জুমচাষ থেকে আধুনিক কৃষিতে রূপান্তর; মূল ফসল ধান ও নানা সবজি, বিশেষভাবে আনারসের বড় উৎপাদন।
৩. সাংস্কৃতিক জীবন
• ভাষা: নিজস্ব ভাষা ‘আচিক’, তিব্বতীয়-বর্মী ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত; কোন নিজস্ব বর্ণমালা নেই।
• পোশাক: নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘দকমান্দা’ ও ‘দকশাড়ি’; পুরুষদের ঐতিহ্যগত পোশাক ছিল ‘গান্দো’।
• খাদ্য: প্রধানত ভাত, সাথে মাছ ও শাকসবজি; জনপ্রিয় বিশেষ খাবার: কচি বাঁশের গুঁড়ি (‘মেওয়া’), কলাপাতা মোড়ানো পিঠা ও তেলের পিঠা।
• উৎসব: প্রধান উৎসব ‘ওয়ানগালা’, যা কৃষিভিত্তিক আনন্দ-উৎসব।
• ধর্ম: প্রাচীন ধর্ম ‘সাংসারেক’; বর্তমানে অধিকাংশ গারো খ্রিষ্টান এবং বড়দিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালন করেন।
পাঠ-৪: সাঁওতাল মূলত রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর জেলায় বাস করে ।
• সামাজিক: সাঁওতাল সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। তাদের গ্রাম পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী ‘পঞ্চায়েত’ ব্যবস্থা রয়েছে।
• সাংস্কৃতিক: এদের প্রধান উৎসব ‘সোহরাই’‘বাহা’। সাঁওতালদের বিশেষ নাচের নাম ‘ঝুমুর নাচ’।
◦ পোশাক: সাঁওতাল মেয়েরা সাধারণত শাড়ি পরে । পুরুষেরা আগে ধুতি পরত, তবে বর্তমানে লুঙ্গিও পরে [৯৩]। সাঁওতাল নারীরা হাতে ও গলায় পিতল বা কাঁসার গয়না পরতে খুব পছন্দ করে ।
◦ খাবার: সাঁওতালদের প্রধান খাদ্য ভাত।
পাঠ-৫: মারমা
সারাংশ: মারমারা পার্বত্য অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম নৃগোষ্ঠী, যারা প্রধানত বান্দরবানে বাস করে ।
• সাংস্কৃতিক: এদের প্রধান উৎসব ‘সাংগ্রাই’। এই উৎসবে মারমারা ‘পানিখেলা’ বা ‘জলোৎসব’-এ মেতে ওঠে ।
• কাজ: মারমাদের জীবনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো ছক আকারে তুলে ধরা।
পোশাক: মারমা পুরুষেরা মাথায় ‘গবং’ (পাগড়ি), গায়ে জামা ও লুঙ্গি পরে [৯৪]। নারীরা গায়ে যে ব্লাউজ পরে তার নাম ‘আঞ্জি’, এছাড়া তারা ‘থামি’ পরিধান করে।
◦ খাবার: মারমারা ভাতের সাথে মাছ, মাংস ও নানা ধরনের শাকসবজি খেয়ে থাকে ।

পাঠ-৬: রাখাইন
রাখাইনরা মূলত পটুয়াখালী, বরগুনা ও কক্সবাজারে বাস করে। এরা মিয়ানমারের আরকান অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে এসেছে ।
পোশাক: রাখাইন পুরুষেরা সাধারণত ফতুয়া ও লুঙ্গি পরে। ধর্মীয় ও লোকজ অনুষ্ঠানে তারা মাথায় ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি পরে । রাখাইন মেয়েরা লুঙ্গির ওপর ব্লাউজ পরিধান করে ।
খাবার: রাখাইনদের নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ খাবারের নাম উৎসগুলোতে উল্লেখ করা হয়নি, তবে তারা প্রধানত কৃষির ওপর নির্ভরশীল ।
জীবনধারা: রাখাইনরা সাধারণত নদীর পাড় বা সমুদ্র উপকূলের সমতল ভূমিতে মাচা পেতে ঘর তৈরি করে বাস করে [৯৫]। এদের প্রধান উৎসবও সাংগ্রাই বা পানিখেলা [৯৫]।
পাঠ-৭: নৃগোষ্ঠীর সাথে বাঙালি সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ও আদান-প্রদান
বাঙালি ও বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের ফলে উভয় সংস্কৃতির মধ্যে গভীর মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে ।
• ভাষা: বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অনেক শব্দ (যেমন—কুলা, দড়ি, কাস্তে, বাত) নৃগোষ্ঠীর ভাষা থেকে এসেছে ।
• উৎসব: পার্বত্য নৃগোষ্ঠীর প্রধান তিন উৎসবের প্রথম অক্ষর নিয়ে গঠিত ‘বৈসাবি’ আজ বাঙালির পহেলা বৈশাখের সাথে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে ।
• রাজনীতি ও অর্থনীতি: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নৃগোষ্ঠীর অবদান অনস্বীকার্য। এছাড়া তাদের উৎপাদিত তাঁতপণ্য ও ফলমূল (যেমন—আনারস, পান) জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে ।

সারকথা: বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে এদেশের জাতীয় সংস্কৃতিকে আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ করেছে ।

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট