কৃত্তিম উপগ্রহ (Artificial Satellite) হলো মানুষের তৈরি যন্ত্র যা পৃথিবী বা অন্য কোনো গ্রহের চারপাশে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। এগুলো মহাকাশে পাঠিয়ে যোগাযোগ, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, নেভিগেশন (GPS), বৈজ্ঞানিক গবেষণা ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করা হয়।
কীভাবে কক্ষপথে থাকে?
উপগ্রহ কক্ষপথে থাকে মূলত মহাকর্ষ বল এবং কেন্দ্রমুখী বলের ভারসাম্যের কারণে।
- পৃথিবীর মহাকর্ষ বল উপগ্রহকে নিচের দিকে টানে।
- উপগ্রহকে খুব উচ্চ গতিতে (সাধারণত প্রতি সেকেন্ডে কয়েক কিলোমিটার) পাঠানো হয়, যাতে এটি সোজা নিচে পড়ে না গিয়ে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকে।
- এই গতি এমনভাবে হিসাব করা হয় যাতে উপগ্রহ পৃথিবীর বক্রতা অনুসরণ করে চলতে পারে। ফলে এটি ক্রমাগত “পড়তে” থাকে কিন্তু পৃথিবীর পৃষ্ঠে পৌঁছাতে পারে না — এটাই কক্ষপথ।
এই নীতিটি আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র এবং কক্ষপথের গতিবিদ্যার ওপর ভিত্তি করে।
কীভাবে মহাকাশে পাঠানো হয়?
- রকেটের সাহায্যে উপগ্রহকে বায়ুমণ্ডলের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
- রকেট ধাপে ধাপে জ্বালানি পুড়িয়ে গতি বাড়ায় এবং উপগ্রহকে নির্দিষ্ট উচ্চতা ও গতিতে ছেড়ে দেয়।
- উপগ্রহ নিজেই ছোট থ্রাস্টার (ছোট ইঞ্জিন) দিয়ে কক্ষপথ ঠিক রাখে বা সামান্য পরিবর্তন করে।
উপগ্রহ কীভাবে কাজ করে?
একটি সাধারণ উপগ্রহে থাকে:
- সোলার প্যানেল — সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করে।
- ব্যাটারি — রাতের সময় বা সূর্য না থাকলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
- অ্যান্টেনা — পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের জন্য।
- পেলোড — মূল কাজের যন্ত্র (ক্যামেরা, সেন্সর, ট্রান্সপন্ডার ইত্যাদি)।
- কন্ট্রোল সিস্টেম — অবস্থান ও দিক নিয়ন্ত্রণ করে।
যোগাযোগের প্রক্রিয়া:
- পৃথিবী থেকে রেডিও সিগন্যাল পাঠানো হয়।
- উপগ্রহ সেই সিগন্যাল গ্রহণ করে, প্রয়োজনমতো প্রক্রিয়া করে এবং আবার পৃথিবীতে পাঠায় (বা অন্য উপগ্রহে রিলে করে)।
- যোগাযোগ উপগ্রহগুলো সাধারণত জিওস্টেশনারি কক্ষপথে (প্রায় ৩৬,০০০ কিমি উচ্চতায়) থাকে, যেখানে তারা পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে মিলে একই জায়গায় স্থির দেখায়।
প্রধান ধরনের কক্ষপথ
| কক্ষপথের ধরন | উচ্চতা (প্রায়) | ব্যবহার |
|---|
| নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথ (LEO) | ২০০–২,০০০ কিমি | আইএসএস, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, স্টারলিংক |
| মধ্যম পৃথিবী কক্ষপথ (MEO) | ২,০০০–৩৬,০০০ কিমি | GPS নেভিগেশন |
| জিওস্টেশনারি (GEO) | ~৩৬,০০০ কিমি | টিভি, যোগাযোগ, আবহাওয়া উপগ্রহ |
সংক্ষেপে কাজের ধাপ
- রকেট দিয়ে উৎক্ষেপণ।
- নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন।
- সোলার প্যানেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
- সেন্সর/অ্যান্টেনা দিয়ে তথ্য সংগ্রহ বা যোগাযোগ।
- পৃথিবীতে তথ্য পাঠানো।
- প্রয়োজনে থ্রাস্টার দিয়ে অবস্থান ঠিক করা।
উপগ্রহগুলো মহাকাশে দীর্ঘদিন কাজ করতে পারে, কিন্তু জ্বালানি শেষ হলে বা যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রিতভাবে বায়ুমণ্ডলে পুড়িয়ে ফেলা হয় বা “গ্রেভইয়ার্ড” কক্ষপথে সরিয়ে দেওয়া হয়।