ফরাসি সাহিত্যিক গী দা মোপাসা (Guy de Maupassant) রচিত বিশ্ববিখ্যাত ছোটগল্প
‘নেকলেস’ (The Necklace)-এর মূল সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো: [
1,
2]
মূল চরিত্রসমূহ
- মাতিলদা লুইসেল (Mathilde Loisel): গল্পের প্রধান চরিত্র। তিনি অত্যন্ত রূপবতী ও আকর্ষণীয় নারী হওয়া সত্ত্বেও এক সাধারণ মধ্যবিত্ত কেরানি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং বিবাহও করেন এক কেরানির সাথে।
- মি. লুইসেল: মাতিলদার স্বামী, যিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সাধারণ নম্র ও পরিশ্রমী কেরানি।
- মাদাম ফরেস্টিয়ার: মাতিলদার ধনী বান্ধবী, যিনি তাকে নেকলেসটি ধার দিয়েছিলেন।
গল্পের সারসংক্ষেপ (Summary)
১. মাতিলদার অতৃপ্তি ও বল নাচের আমন্ত্রণ:
মাতিলদা রূপবতী হলেও তার ভাগ্য ও মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে সবসময় অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি সবসময় ধনী ও বিলাসী জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখতেন। একদিন তাঁর স্বামী শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি জমকালো বল নাচের (পার্টি) আমন্ত্রণপত্র নিয়ে আসেন। কিন্তু মাতিলদা খুশি হওয়ার বদলে কেঁদে ফেলেন, কারণ এমন অভিজাত পার্টিতে যাওয়ার মতো ভালো পোশাক ও গয়না তাঁর ছিল না।
২. পোশাক কেনা ও নেকলেস ধার নেওয়া:
স্ত্রীর মুখে হাসি ফোটাতে মি. লুইসেল তাঁর জমানো ৪০০ ফ্রাঁ দিয়ে মাতিলদার জন্য একটি সুন্দর পোশাক কিনে দেন। কিন্তু পোশাকের সাথে মানানসই কোনো গয়না না থাকায় মাতিলদা আবার বিষণ্ণ হয়ে পড়েন। স্বামীর পরামর্শে তিনি তাঁর ধনী বান্ধবী মাদাম ফরেস্টিয়ারের কাছে যান এবং সেখান থেকে একটি চমৎকার হীরার নেকলেস ধার নেন।
৩. বল নাচের রাত ও নেকলেস হারিয়ে যাওয়া:
পার্টির রাতে মাতিলদাকে দেখতে অপরূপ লাগছিল। তিনি সবার আকর্ষণ ও প্রশংসার কেন্দ্রে পরিণত হন এবং মনের আনন্দে নাচেন। কিন্তু ভোররাতে বাড়ি ফেরার পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাতিলদা আবিষ্কার করেন যে তাঁর গলার নেকলেসটি হারিয়ে গেছে। তাঁরা সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও সেটি আর খুঁজে পান না।
৪. চরম বিপর্যয় ও ১০ বছরের কঠোর পরিশ্রম:
বান্ধবীর কাছে সত্য গোপন করে মাতিলদা ও তাঁর স্বামী সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা ঠিক একই রকম একটি নেকলেস কিনে ফেরত দেবেন। বাজারে হুবহু একই রকম একটি হীরার নেকলেসের দাম পড়ে ৩৬,০০০ ফ্রাঁ। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করতে লুইসেল তাঁর পৈতৃক সম্পত্তির সবটুকু ব্যয় করেন এবং চড়া সুদে ঋণ নেন।
এই বিশাল ঋণ শোধ করতে তাঁদের জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। তাঁরা চাকরানি বিদায় করে এক সস্তা চিলেকোঠার ঘরে আশ্রয় নেন। মাতিলদাকে ঘরের সব কঠিন কাজ একা হাতে করতে হয় এবং তাঁর স্বামী রাতে অতিরিক্ত কাজ শুরু করেন। এভাবে দীর্ঘ ১০ বছর হাড়ভাঙা খাটুনি আর চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়ে তাঁরা অবশেষে সমস্ত ঋণ পরিশোধ করেন। এই ১০ বছরে মাতিলদার রূপ-যৌবন সব হারিয়ে যায় এবং তিনি একজন বয়স্কা, রুক্ষ ও সাধারণ নারীতে পরিণত হন।
৫. গল্পের চূড়ান্ত মোচড় (The Twist Ending):
একদিন পার্কে হাঁটতে গিয়ে মাতিলদার সাথে মাদাম ফরেস্টিয়ারের দেখা হয়। ফরেস্টিয়ার মাতিলদার এই শীর্ণ ও বয়োবৃদ্ধ রূপ দেখে চিনতেই পারছিলেন না। তখন মাতিলদা তাঁর এই অবস্থার জন্য বান্ধবীর সেই নেকলেসটির কথা জানান এবং স্বীকার করেন যে আসল নেকলেসটি হারিয়ে যাওয়ায় তাঁরা ৩৬,০০০ ফ্রাঁ দিয়ে অন্য একটি নেকলেস কিনে ফেরত দিয়েছিলেন, যার ঋণ শোধ করতে তাঁদের ১০ বছর লেগেছে।
সব শুনে মাদাম ফরেস্টিয়ার হতবাক হয়ে মাতিলদার হাত দুটি জড়িয়ে ধরে বলেন— "হায় আমার দরিদ্র মাতিলদা! আমার ওই নেকলেসটি তো আসল হীরা ছিল না, ওটি ছিল নকল (ইমিটেশন)! ওটার মূল্য বড়জোর ৫০০ ফ্রাঁ ছিল!"
গল্পের মূল শিক্ষা (Moral Lesson)
গল্পটি আমাদের শেখায় যে—
- অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও লোকদেখানো মানসিকতা মানুষের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
- যার যতটুকু আছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত।
- বিপদের সময় সত্য গোপন না করে সততা ও সাহসিকতার সাথে সত্য প্রকাশ করা উচিত, কারণ একটি মিথ্যা বা ভুল সিদ্ধান্ত পুরো জীবনকে ওলটপালট করে দিতে পারে।