প্রভাষক
১৩ মার্চ, ২০১৯ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ
প্রভাষক
যুক্তিবিদ্যার উৎপত্তি
মানুষ চিন্তাশীল জীব। কিন্তু আমরা প্রায় সময়ই যৌক্তিক চিন্তা সম্পর্কে সচেতন থাকি না। নিভুল চিন্তাই হচ্ছে আমাদের জীবনচক্রে চলার পথে ও কাজকর্মে যথার্থতা অর্জনের মূল কৌশল। আমাদের সমগ্র জীবনই হচ্ছে চিন্তার ফল। যুক্তিবিদ্যার ইতিহাস মানুষের চিন্তার ইতিহাস। এ ইতিহাস অনেক পুরাতন। এর যাত্রা আরম্ভ হয় প্রাচীন কালে গ্রিস, ভারত ও চীনে। কিন্তু গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটলের মাধ্যমে এর সূত্রপাত হয়। এজন্য এরিস্টটলকে যুক্তিবিদ্যার জনক বলা হয়।
যুক্তিবিদ্যার ক্রমবিকাশ হিসেবে চারটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে।
১. প্রাচীন যুগ
২. মধ্যযুগ
৩. আধুনিক যুগ
৪. সমকালীন যুগ বা সম্প্রতিক কাল
১. প্রাচীন যুগ: খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে পিথাগোরাসের জ্যামিতিক পদ্ধতি গড়ে তোলার মাঝে আমরা যুক্তিতত্ত্বের সর্বপ্রথম স্ফুরণ দেখতে পাই। পরবর্তীতে সক্রেটিসীয় পদ্ধতিতেও আমরা অবরোহ পদ্ধতির প্রয়োগ দেখতে পাই। কিন্তু এরিস্টটরের মাধ্যমেই যুক্তিবিদ্যার সূত্রপাত হয় এবং তা পূর্ণরূপ লাভ করে। এজন্য এরিস্টটলকে যুক্তিবিদ্যার জনক বলা হয়।
২. মধ্যযুগ: মধ্যযুগীয় যুক্তিবিদ্যা বলতে স্কলাস্টিক যুক্তিতত্ত্বকেই নির্দেশ করে। মধ্যযুগীয় যুক্তিবিদ বোথিয়াস ও পরফিরি এরিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যান।
এ ছাড়াও মধ্যযুগের মুসলিম দার্শনিক আল ফারাবী, ইবনে সিনা, আল গাজ্জালী তারাও এরিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যার পক্ষে বিপক্ষে অনেক যুক্তি অবতারণা করেন। এর ফলে যুক্তিবিদ্যার ধারাবাহিক ক্রমবিকাশ পরিলক্ষিত হয়।
৩. আধুনিক যুগ: আধুনিক যুগের শুরুতেই যুক্তিবিদ বেকন অবরোহ সমালোচনা করে আরোহ পদ্ধতি দৃঢ় সমর্থন করেন। এর ফলে যুক্তিবিদ্যা এক নতুন পথ নির্দেশনা লাভ করে। এরপর হোয়েটলি, আইজাক ওয়াট, জে এস মিল পরীক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করে যুক্তিবিদ্যার বিজ্ঞানসম্মত অগ্রগতিকে তুলে ধরে।
আধুনিক যুক্তিবিদ্যার বিকাশ ৫টি ধারায় পরিলক্ষিত হয়।
প্রাথমিক পর্যায়: লাইবনিজ এর যৌক্তিক অন্তরকলন (Logical Calculus) একটি বিশেষ রূপ লাভ করে।
বীজগণিতীয় পর্যায়: জজ বুল, জেভন্স, ভেন তারা গাণিতিক পদ্ধতির যৌক্তিক বিকাশ ঘটান।
যুক্তিবাদী পর্যায়: রাসেল, হোয়াইটহেড প্রমুখ যুক্তিবিদগণ একটি একক ঐক্যবদ্ধ পদ্ধতিতে যুক্তিবিদ্যাকে গণিত ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যথাযোগ্য চিন্তাধারার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান করেন।
অধিগণিতীয় পর্যায়: যুক্তিবিদ হিলবার্ট, লোভেনহেইম, গডেল, টার্স্কি প্রমুখ পরানীতিবিদ্যার প্রবর্তন করে যুক্তিবিদ্যায় নতুন মাত্রা যোগ করেন।
শেষ পর্যায়: দ্বিতীয় বিম্বযুদ্ধের পর গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার ক্ষেত্রে ‘মডেল তত্ত্ব’, ‘প্রমাণ তত্ত্ব’ ‘সেট তত্ত্ব’ ইত্যাদি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান ও আবিষ্কারে ব্যবহৃত হতে থাকে।
৪. সমকালীন যুগ: বিংশ শতাব্দী গাণিতিক যুক্তিবিদ্যার বিকাশ ও অগ্রগতি লক্ষণীয়। বিশেষ করে ১৯৫০ সালের পর থেকে ‘মোডাল যুক্তিবিদ্যা’, ‘টেম্পোরাল যুক্তিবিদ্যা’, ‘ডিওস্টিক যুক্তিবিদ্যা’ এবং ‘রিলিভেন্স যুক্তিবিদ্যা’ গণিত, সেট তত্ত্ব, কম্পিউটার টেকনোলজি তথ্য বিজ্ঞানের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে বিকাশ লাভ করে এবং বর্তমান সময়ে এর ব্যবহারিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়ে আসছে।
যুক্তিবিদ্যার ইংরেজী প্রতিশব্দ ‘Logic’ এর উৎপত্তি হয়েছে গ্রীক শব্দ ‘ Logike’ থেকে । ‘Logike’ শব্দটি আবার গ্রীক শব্দ ‘ Logos’ এর বিশেষণ ।‘ Logos ’ শব্দের অর্থ হলো চিন্তা বা ভাষা । আমরা জানি যে, চিন্তার সাথে ভাষার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য । কারণ ভাষা ছাড়া আমরা কখনো চিন্তা করতে পারি না। আমাদের মনের চিন্তাধারাকে আমরা সব সময়েই ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করি । সুতরাং উৎপত্তিগত অর্থ যুক্তিবিদ্যা হলো ভাষায় প্রকাশিত চিন্তার বিজ্ঞান ।
চিন্তা: ব্যাপক অর্থে চিন্তা কথাটিকে জ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন মানসিক প্রক্রিয়াকে বুঝিয়ে থাকি।
যেমন, সংবেদন বা অনুভূতি, প্রত্যক্ষণ, স্মৃতি, কল্পনা, যুক্তি বা অনুমান ইত্যাদি। এক্ষত্রে যুক্তি বা অনুমানই হচ্ছে যুক্তিবিদ্যার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অনুমান বা যুক্তি: কোন জানা বিষয়ের মাধ্যমে অজানা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় অনুমান। এখানে ঐ বিষয় বা বস্তু বা ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জানা থাকতে হবে। আর এর মধ্য দিয়ে অজানা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে।
যেমন, দূরে কোথাও ধুয়া দেখে অনুমান করালম সেখানে আগুন লেগেছে। এখানে ধুয়া হলো আমাদের জানা বিষয়। তবে অনুমান হলো একটি মানসিক প্রক্রিয়া।
যুক্তিবিদ ‘যোসেফ’ বলেন , “যুক্তিবিদ্যা হল চিন্তার বিজ্ঞান”।
যুক্তিবিদ ‘জেভন্স’ বলেন , “যুক্তিবিদ্যা হল যুক্তি-পদ্ধতির বিজ্ঞান”।
যুক্তিবিদ ‘অলড্রিচ’ বলেন’ “যুক্তিবিদ্যা হল যুক্তি সংক্রান্ত কলা”।
যুক্তিবিদ ‘হোয়েটলি’ বলেন, “যুক্তিবিদ্যা হল যুক্তিপদ্ধতির বিজ্ঞান ও কলা”।
যুক্তিবিদ ‘থমসন’ বলেন , “যুক্তিবিদ্যা হল চিন্তার নিয়ম সম্পর্কিত বিজ্ঞান”।
যুক্তিবিদ ‘আলবার্টাস মেঘনাস’ বলেন , “যুক্তিবিদ্যা হল যুক্তি বিষয়ক বিজ্ঞান”।
যুক্তিবিদ ‘হ্যামিলটন’ বলেন , “যুক্তিবিদ্যা হল চিন্তার আকারগত নিয়ম সম্পর্কিত বিজ্ঞান”।
যুক্তিবিদ ‘ইউবারওয়েগ’ বলেন , “ মানুষের জ্ঞান সম্পর্কিত নিয়মসমূহ নিয়ন্ত্রণকারী বিজ্ঞানই হল যুক্তিবিদ্যা”।
যুক্তিবিদ ‘ওয়েলটন’ বলেন , “যুক্তিবিদ্যা হল নির্ভুল চিন্তার নিয়ম সংক্রান্ত বিজ্ঞান”।
যুক্তিবিদ ‘স্পলডিং’ বলেন , “যুক্তিবিদ্যা হল অনুমান বিষয়ক বিজ্ঞান”।
যুক্তিবিদ ‘আরনল্ড’ বলেন , “ সত্য অনুসন্ধানের লক্ষ্যে বোধশক্তির ক্রিয়া সম্পর্কিত বিজ্ঞানই হল যুক্তিবিদ্যা”।
যুক্তিবিদ ‘মিল’ বলেন , “যুক্তিবিদ্যা হল এমন বিজ্ঞান যা বিচার বা প্রমাণের মাধ্যমে জ্ঞাত সত্য থেকে অজ্ঞাত সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বৌদ্ধিক ক্রিয়া এবং বৌদ্ধিক ক্রিয়ার সহায়ক মানসিক প্রক্রিয়াসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করে”।
যে ব্যবহারিক বিজ্ঞান ভ্রান্তিকে পরিহার করে সত্যকে অর্জন করার উদ্দেশ্যে সঠিক যুক্তিপদ্ধতি বা অনুমান এবং তার সহায়ক প্রক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে যুক্তিবিদ্যা বলে ।
যুক্তিবিদ ‘আই. এম .কপি’র মতে, “ যুক্তিবিদ্যা হচ্ছে বৈধ যুক্তি হতে অবৈধ যুক্তির পার্থক্য নির্দশ করার জন্য ব্যবহৃত পদ্ধতি ও নীতিসমুহের একটি বিশিষ্ট বিদ্যা”।
সুতরাং বলা যায়, যে বিষয় যুক্তি ও তার সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলোর সাহায্যে যথার্থ যুক্তি প্রয়োগ ও অযথার্থ যুক্তি পরিহার করতে সহায়তা করে তাকে যুক্তিবিদ্যা বলে।
যুক্তিবিদ্যার ধরণ (Types of Logic)
সামগ্রিক দৃষ্টিতে যুক্তিবিদ্যাকে ৩ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়ঃ
3.পরা-যুক্তিবিদ্যা(Meta Logic)
যুক্তিবিদ্যার স্বরূপ(Nature of Logic)
যুক্তিবিদ্যার পরিধি ও পরিসর
(Scope or Subject matter of Logic)
১. জ্ঞান সংক্রান্তঃ জ্ঞান প্রধানত দুই প্রকার।
ক. প্রত্যক্ষ জ্ঞান: সরাসরি বা সাক্ষাতের মাধ্যমে কোন জ্ঞানের বিষয়কে যখন জানা যায় তখন সেই জ্ঞানকে প্রত্যক্ষ জ্ঞান বলে।
খ. পরোক্ষ জ্ঞান: সরাসরি বা সাক্ষাতের মাধ্যমে না জেনে এর কোন লক্ষণের সাহায্যে জ্ঞারে বিষয়কে জানা হয় তাকে পরোক্ষ জ্ঞান বলে।
প্রত্যক্ষ জ্ঞানের সাথে জ্ঞাত বস্তুর সাথে ইন্দ্রিয়ের সাক্ষাৎ ঘটে। কিন্তু পরোক্ষ জ্ঞানে এরূপ জ্ঞাত বস্তুর সাথে ইন্দ্রিয়ের সাক্ষাৎ ঘটে না।
যেমন, সালামকে কাঁদতে দেখলাম। এ ক্ষেত্রে কাঁদার জ্ঞান প্রত্যক্ষ জ্ঞান। কারণ কাঁদার সাথে আমার ইন্দ্রিয়ের প্রত্যক্ষ সংযোগ ঘটেছে।
কিন্তু কাঁদা দেখে অনুমান করলাম তার মনে দুঃখ আছে। এখানে দুঃখের জ্ঞান পরোক্ষ জ্ঞান।
২. অনুমান সংক্রান্তঃ জানা বিষয়ের মাধ্যমে অজানা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করাই হলো অনুমান। যথার্থ অনুমান নিয়ে কাজ করাই যুক্তিবিদ্যার কাজ। এখানে অযথার্থ অনুমানের কোন স্থান নেই।
অনুমান সাধারণত দুই প্রকার। যথা,
১. অবরোহ অনুমান ২. আরোহ অনুমান
৩. মানসিক প্রক্রিয়া সংক্রান্তঃ যুক্তিবিদ্যা সাধারণত ধারণা গঠন, অবধারণ এবং অনুমান নিয়ে আলোচনা করে।
৪. সত্যতা সংক্রান্তঃ যুক্তিবিদ্যার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সত্যের সন্ধান এবং সত্য প্রতিষ্ঠা।
সত্যতা দুই প্রকার। যথা,
১. রূপগত সত্য বা আকারগত সত্য: মনের দুই বা ততোধিক ধারণার মধ্যে যদি কোন বিরোধ না থাকে অথাৎ অর্থের দিক থেকে যদি তারা পরস্পর সংগতিপূর্ণ হয় তাহলে যে ধারণা লাভ করা হয় তাকে রূপগত সত্য বলে।
২. বস্তুগত সত্য: আর চিন্তা বা ধারণার সাথে যথন বাস্তবে কোন বস্ত বা বিষয়ের মিল থাকে তাকে বস্তুগত সত্য বলে।
পূণাঙ্গ সত্য অর্জনের ক্ষেত্রে রূপগত ও বস্তুগত সত্য উভয় জরুরি।
৫. মৌলিক সূত্র বা স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম সংক্রান্তঃ স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম আলোচনা হলো যুক্তিবিদ্যার আলোচ্য বিষয়। (কার্যকারণ নিয়ম, প্রকৃতির নিয়ম আনুবর্তিতার নিয়ম)
৬. সম্পর্ক সংক্রান্তঃ বিভিন্ন বিজ্ঞানের বা বিষয়ের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা। যেমন, যুক্তিবিদ্যা ও কম্পিউটারের সম্পর্ক।
৭. ভাষা সংক্রান্তঃ যুক্তিবিদ্যা চিন্তার বিজ্ঞান। ভাষা ব্যতিত চিন্তা সম্ভব নয়।
৮. অনুমান সহায়ক সংক্রান্তঃ অনুমানকে বৈধ হতে হলে কতকগুলো সহায়ক প্রক্রিয়ার জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। যেমন, সংজ্ঞা, বিভাগ, প্রকল্প, ব্যাখ্যা, শ্রেণিকরণ ইত্যাদি।
৯. যুক্তিবিদ্যার অন্যতম আলোচ্য বিষয় হলো পরীক্ষণ। কোন ঘটনাকে মনের মতো করে কৃত্রিমভাবে সংঘটিত করে তা নিরীক্ষণ করার নামই পরীক্ষণ।
১০. যুক্তিবিদ্যার আরেকটি মহৎ উদ্দেশ্য হলো কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা।
১১. প্রতীক সংক্রান্তঃ প্রতীকী যুক্তিবিদ্যা সনাতনী যুক্তিবিদ্যার একটি উন্নত সংস্কার। জটিল যুক্তির বৈধতা ও অবৈধতা সাধারণত প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে করা হয়।
১২. অনুপপত্তি সংক্রান্তঃ অনুমান যাতে সঠিক হয় সে জন্য যুক্তিবিদ্যায় কতকগুলো নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এ নিয়মগুলো মেনে না চললে যে দোষ হয় যুক্তিবিদ্যার ভাষায় তাকে অনুপপত্তি বলা হয়।
মোঃ আবু সাঈদ
প্রভাষক-যুক্তিবিদ্যা
যশোর শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল এন্ড কলেজ