সহকারী শিক্ষক
১৬ এপ্রিল, ২০২০ ০৪:১৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
আমাদের গ্রামটা দেখতে অনেক সুন্দর । রাস্তার পাশ দিয়ে নদী বয়ে চলেছে। আমাদের গ্রামে উভয় ধর্মের মানুষ বসবাস করত। দিনটি ছিল সোমবার। বেলা ১২ টা । মানুষজন চারদিকে ছোটাছুটি করছে। আমি তখন গরুগুলো বাড়ি নিয়ে আসার জন্য মাঠে যাই। মাঠে গরুগুলো ও ছোটাছুটি করছে । আমার বয়স তখন ১২ বা ১৩ বছর হবে। আমি অবাক চোখে দেখতে লাগলাম । হঠাৎ আমাকে কে যেন ধাক্কা দিল , বলল তাড়াতাড়ি বাড়ি চল। দেখলাম একদল অচেনা মানুষেরা গরুগুলো তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু বোবার মত দাঁড়িয়ে রইলাম। কেঊ কিছু বলতে গেলে তাদের কাছে মার খাচ্ছে। শুধু গরুগুলো তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা নয়, বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে । আমি দৌড়িয়ে বাড়ি গেলাম। বাবা-মা ,ভাই-বোন সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো, সবাই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে বলে। পাশের বাড়ি বৃদ্ধটি তার একমাত্র নাতনীকে নিয়ে থাকতো। বৃদ্ধটির ছিলো একটি মেয়ে। মেয়েটির বিয়ের পর জামাইসহ মারা যায় নদীতে মাছ ধরতে যেয়ে। আমি দৌড়িয়ে বৃদ্ধ ও নাতনীকে নিয়ে আসতে যাই। যাওয়ার পর দেখি হায়েনার দল বৃদ্ধ ও তার নাতনীর উপর জুলুম করছে। সে এক বিভৎস্য দৃশ্য। বৃদ্ধের বাড়ির উঠানে একটি গাভী বাধা ছিলো দুধ দোহনের জন্য। বাছুরটা কিছু দূরে বাধা ছিলো। হায়েনার দল এসে যখন গাভী ও বাছুরটাকে নিয়ে যেতে থাকে তখন বৃদ্ধ বাধা দিয়েছিলো । ওরা বৃদ্ধকে লাথি মেরে ফেলে দিল এবং লাঠি দিয়ে মারতে থাকলো। বৃদ্ধের নাতনী এসে বাধা দিলে নাতনীকে ও ওরা মারতে থাকে। কাছে যাওয়ার সাহস কারো হলো না। সবাই ভয়ে পালিয়ে গেল। আমি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারপর বৃদ্ধ ও তার নাতনীকে দড়ি দিয়ে বেধে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল। ওরা চলে যাওয়ার সাথে সাথে দুজনকে দড়ি খুলে নিয়ে আসি। সবাই নৌকায় উঠে নদী পথে ভারতে পালিয়ে যাবে। আমি ওদের দুজনকে নিয়ে রাস্তার উপর যখন উঠলাম তখন আমার বাবা আমার হাত ধরে জোর করে নৌকায় নিয়ে যায় কিন্তু আমি নৌকার থেকে লাফ দিয়ে এসে বৃদ্ধ ও তার নাতনীকে পাশের বাড়ীর আর একটা নৌকায় উঠিয়ে দিই। আমাদের নৌকায় আর জায়গা ছিল না। সবাই খুব ব্যস্ত। শুনেছে পাকিস্তানীরা নৌবহর নিয়ে আসছে। সবাই নৌকা ছেড়ে দিয়েছে। মনে হচ্ছে নৌকা প্রতিযোগিতা চলছে, কিন্তু বাস্তবতা ছিল জীবন বাচাঁনোর প্রতিযোগিতা । এই প্রতিযোগিতায় যে জিতবে সেই জীবন বাচাঁতে পারবে। আমাদের নৌকা পাকিস্তানী নৌবহররা কালিন্দী নদীতে আটকাতে না পারলে ও বৃদ্ধ ও তার নাতনী যে নৌকায় ছিলো সেই নৌকা আটকাতে পেরছিলো। বৃদ্ধ ও তার নাতনীসহ সবাইকে রাস্তার উপর তুলে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেছিল। সেদিন একদল পশুদের হাত থেকে বাঁচাতে পারলে ও আরেকদল হায়েনাদের কাছ থেকে বাঁচাতে পারিনি। সেই দিনের স্মৃতি আজ ও চোখের সামনে ভাসে।