প্রধান শিক্ষক
১৭ এপ্রিল, ২০২০ ০৪:১৮ অপরাহ্ণ
প্রধান শিক্ষক

কোভিড ১৯ নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছেই। বিশ্বজুড়ে বিরামহীনভাবে বেড়েই চলেছে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। মানুষ থেকে মানুষের দেহে এই ভাইরাস কিভাবে ছড়ায় সে বিষয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। তবে সাধারণ কিছু সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এসব সতর্কতা অবলম্বন করলে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হবার সম্ভাবনা কিছুটা হলেও কমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যেমন-গণপরিবহন এড়িয়ে চলা কিংবা সতর্কতার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাস, ট্রেন কিংবা অন্য যে কোন ধরনের পরিবহনের হাতল কিংবা আসনে করোনাভাইরাস থাকতে পারে। সেজন্য যে কোন পরিবহনে চলাফেরার ক্ষেত্রে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করা এবং সেখান থেকে নেমে ভালোভাবে হাত পরিষ্কার করার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, হাঁচি-কাশি থেকে করোনাভাইরাস ছড়ায়। যে কোন জায়গায় করোনাভাইরাস কয়েক ঘন্টা এমনকি কয়েকদিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। তাই সর্বাবস্থায় দূরত্ব বজায় রেখে সতর্কতা মেনে চলাই একমাত্র ভরসা। এছাড়া মানবিক বলয়ে যখন দূরত্ব শব্দটি ব্যবহার করা হয়, তার একটি নেতিবাচক মাত্রিকতা আছে। প্রায়ই বলি আমরা, তুমি অনেক দূরে সরে গেছো কিংবা চিন্তার ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তা কিন্তু সাময়িক একথা মনে রাখতে হবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মানুষে মানুষে দূরত্ব মানুষ চায় না, কিন্তু ওই দূরত্বের ব্যাপারটি আবার ফিরে এসেছে জোরেশোরে বর্তমান সময়ের করোনা কিংবা কভিড-১৯ ভাইরাস সংকটকালে।
প্রতিটা গণমাধ্যমে বারবার বলা হচ্ছে যে এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার অন্য কোনো বিকল্প নেই। সংক্রমণ রোধে এটা অত্যাবশ্যকীয়। পথে-ঘাটে, দোকান-পাটে, বিদ্যালয়-পাঠাগারে অর্থাৎ সামাজিক মেলামেশার প্রতিটি স্থানেই একটি মানুষের সঙ্গে আরেকটি মানুষের ন্যুনতম শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা বড় প্রয়োজন। এটি নিশ্চিত করার ব্যাপারে রাষ্ট্রের যেমন একটি বিরাট সামষ্টিক ভূমিকা আছে, তেমনি ব্যক্তি মানুষেরও। রাষ্ট্র মানুষকে নৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারে, প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করতে পারে এবং সে আইন প্রয়োগও করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি ব্যক্তি মানুষ দায়িত্বশীল না হয়, তাদের নিজেদের দায়িত্বের কথা বিস্মৃত হয়। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে তাদের এই দায়িত্বহীন কাজের ফলে তারা তাদের পরিবারের মধ্যে, আশে পাশের বয়োবৃদ্ধদের সংক্রমিত করতে পারেন এবং চূড়ান্ত বিচারে তাদের মৃত্যুর কারণও হতে পারেন। তরুণ বন্ধুদের প্রতি আমার একটিই শুধু আবেদন-গৃহের অভ্যন্তরে থাকুন, অপ্রয়োজনে বাইরে যাবেন না এবং বাইরে গেলেও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন। সংকটের যে বিশাল ব্যাপ্তি এবং যে গভীর স্বরূপ, তাতে আমাদের পরস্পরের খোঁজ নিতে হবে, পরস্পরকে সাহস জোগাতে হবে, পরস্পরকে সাবধান করতে হবে এবং সে কাজটি করতে হবে নানান যোগাযোগের মাধ্যমে। সংবাদ ও তথ্য আমরা সহভাগ করে নেব ঠিকই, কিন্তু তা যেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো বিশ্বাসযোগ্য সূত্র হয়। চিন্তাভাবনা না করে, সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে যা-ই আমাদের কাছে আসে, তা যেন আমরা সহভাগ না করে নিই। এতে অন্যের উপকার না করে অন্যের ক্ষতি করার সম্ভাবনাই বেশি।
আমরা ভাগ্যবান যে বর্তমান সময়ের তথ্যপ্রযুক্তি শারীরিক উপস্থিতি ব্যতিরেকে আমাদের উপযুক্ত কাজগুলো করার সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা যাতে সেগুলো দায়িত্বের সঙ্গে ব্যবহার করি। আজকের করোনা সংকটের কালে একটি নির্দেশিকা শব্দযুগল বলতে চেয়েছে এক কথা, কিন্তু বলে ফেলেছে অন্য কথা-নিজের অজান্তেই হয়তো। বলতে চেয়েছে ঘরের বাইরে নানান স্থানে দুজন মানুষ একটি নিরাপদ দূরত্বে থাকবেন, মানে ন্যুনতম একটি শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখবেন, যাতে সংক্রমণ না হয়। কিন্তু যেহেতু সামাজিক কর্মকান্ড ও সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে এই দূরত্বের কথা বলা হয়েছে, তাই অনেকটা বিভ্রমেই এর নাম দেয়া হয়েছে সামাজিক দূরত্ব বিধান। এটা তাই পরিষ্কার, যা বলতে চেয়েছে, তা বোঝাতে পারেনি; আর যা বোঝাতে চেয়েছে, তা বলতে পারেনি। এরপরও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে নিজেকে অনেক আড়াল করা যায় যানবাহনের পেছনে আমরা প্রায়ই একটা বাক্য লেখা থাকতে দেখি, ১০০ হাত দূরে থাকুন। আরেকটা ব্যাপার হলো, কথা বলতে গিয়ে একেবারে মুখোমুখি দাঁড়ানো। এতে যার সঙ্গে কথা বলছেন, তিনি বিব্রত হতে পারেন অথবা আপনার অনিচ্ছা সত্বেও কথা বলার সময় থুতু তার গায়ে লাগতে পারে অথবা হুট করেই আপনার হাঁচি-কাশি চলে এল! ভাবুন তো, ব্যাপারটা কী রকম অস্বস্তিকর! এসব বদভ্যাস দূর করার জন্য একটু দূরত্ব বজায় রেখে চললে তা কিন্তু আপনার জন্যই ভালো। উনিশশো আঠারো সালে যখন ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ মহামারি আকার ধারণ করে, তখন এবং তার প্রায় এক শ বছর পর ২০১৪ সালে ইবোলা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ও সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
আমাদের সবারই কমবেশি মনে আছে, ষাটের দশকে যখন ‘এশিয়ান ফ্লু’ মারাত্মক আকার ধারণ করে, তখন সামাজিক দূরত্বই এর সংক্রমণ হার ৯০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে কমিয়ে নিয়ে আসে। সামাজিক দূরত্ব হলো কিছু নীতিমালা, যেগুলো সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগের দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোধ করে। অতিসম্প্রতি বিশ্বজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করা কোভিড-১৯-এর ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়া রোধেও ইতিমধ্যেই সামাজিক দূরত্ব’ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া এ ব্যাপারে আশাব্যঞ্জক সাফল্য লাভ করেছে। চীনা সাংবাদিক ডেনিশ নরমিলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৯ ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়াতে আক্রান্তের সংখ্যা ৯০৯-এ পৌঁছে গিয়েছিল সেখানে ১৭ মার্চ এ সংখ্যা কমে ৮৪ জনে নেমে আসে। সর্বশেষ ২১ মার্চে সংখ্যা ছিল ১৪৭। আশ্চর্য হলেও সত্যি যে এটা সম্ভব হয়েছে কোনো রকম লকডাউন ছাড়াই! সামাজিক দূরত্ব’-এর ভূমিকা নিয়ে সম্প্রতি একটি চমৎকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। ষাটের দশকে ‘এশিয়ান ফ্লু’ যখন মারাত্মক আকার ধারণ করে, তখন সামাজিক দূরত্বই এ সংক্রমণের হার ৯০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে কমিয়ে নিয়ে আসে। কতগুলো কার্ভ, সিমুলেশন দিয়ে তারা খুব ভালোভাবে মহামারির প্রকোপ রোধে সামাজিক দূরত্ব কীভাবে কাজ করে তার ব্যাখ্যা দিয়েছে। সবাই অবাধে মেলামেশা করলে সংক্রমণের মাত্রা অনেক উপরে। অর্থাৎ্ একেবারে সর্বাধিক উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। যেটা আমরা বর্তমানে ইতালির দিকে তাকালে দেখতে পাই। দুশ্চিন্তা আর আতংকের প্রহর পেরিয়ে এক একটা দিন কেটে যাচ্ছে। সবাই বলছে বাসায় থাকুন, নিরাপদ থাকুন, নিরাপদ রাখুন। করোনা মহামারীকে রুখে দেয়ার এই একটাই মোক্ষম উপায় এখন পর্যন্ত মানুষের আয়ত্বে আছে, যতদিন পর্যন্ত না এর কোন প্রতিষেধক বাজারে আসছে। এখন আমরা আসলে বায়ুসমুদ্রে ভাসমান করোনার জালের মধ্যে বেঁচে আছি। দুঃখজনক হলেও সত্য, কখন যে করোনার কারেন্ট জাল কার গলার ফাঁস হবে কেউ বলতে পারে না। আর এই জাল কে বড় আর কে ছোট সেই বাছ বিচার করছে না। শত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং সাবধানতাও এই জীবাণুর প্রাদুর্ভাব রুখতে পারছে না। জানি না কোথায় গিয়ে এর শেষ হবে। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে মহামারীর আসল রূপটা এখনও আমাদের সামনে আসেনি। এখন পর্যন্ত এটা বিস্তারের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আমি কল্পনা করতেও ভয় পাই মানুষ তখন কতটা অসহায় হয়ে যাবে। যাই হোক দুঃস্বপ্ন এবং দুর্ভাবনাকে সাথে করে জীবনের এক একটা দিন তার নিজস্ব নিয়মে চলে যাচ্ছে। আর আমরা আশাবাদী হচ্ছি একদিন এই মহামারী কাটিয়ে উঠে আমরা আবারও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবো। ইতোমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার একদল বিজ্ঞানী দাবি করেছেন, তারা করোনার টিকা আবিষ্কার করে ফেলেছেন। এখন চলছে তার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ। একসময় এই টিকা বাজারে চলে আসবে সেদিন হয়তোবা আর বেশি দূরে নয় ততদিন আমাদেরকে একটু কষ্ট করে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। অবশ্য কোয়ারেন্টাইনে থাকাটা একেবারে খারাপ না কারণ অনেক বন্ধন নতুন করে জোড়া লাগছে। কোয়ারেন্টাইনের এই দিনগুলোতে আমাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না যে আমাদের পাশেই অনেক মানুষ অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। আমরা প্রত্যেকেই যদি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়াই তাহলে আবারও আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে করোনার এই মহামারী কাটিয়ে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারবো আর পাশাপাশি প্রকৃতির সাথেও বিমাতাসুলভ আচরণ করা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে কারণ একটা প্রাকৃতিক, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং সুন্দর পৃথিবী গড়তে হলে আমাদের সবাইকেই একসাথে কাজ করতে হবে।
আমরা সবাই জানি এবং দেখতে পাচ্ছি, দেশে দেশে শহরে শহরে তাই ‘লকডাউন। তবু বহু জায়গায় দেখা যাচ্ছে, পরিস্থিতির গুরুত্ব না বুঝে অনেকে প্রায় অকারণেই পথে ঘাটে বেরিয়ে, ছোট বড় জমায়েত করে ‘সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং’ বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মূল উদ্দেশ্যটাকেই জলাঞ্জলি দিচ্ছেন। দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু বাড়ি, দুবাইয়ের বুরজ খলিফা তাই আলোক সজ্জায় বার্তা দিচ্ছে, ‘স্টে হোম, স্টে সেফ’। বিশ্ব জুড়ে এখন একটাই বার্তা। বাড়িতে থাকুন। নিরাপদ থাকুন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। না হলে ভাঙা যাবে না নভেল করোনা ভাইরাসের অভিঘাতের শৃঙ্খল।