Loading..

প্রকাশনা

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর
০৫ আগস্ট, ২০২০

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর (জন্ম: ১১ মার্চ, ১৮৪০ – মৃত্যু: ১৯ জানুয়ারি, ১৯২৬) ছিলেন বিশিষ্ট বাঙালি কবি, সংগীতকার, দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ। তিনি বাংলা সংকেত লিপি (শর্ট হ্যান্ড) ও স্বরলিপি রচনার অন্যতম অগ্রপথিক ছিলেন।[১] পারিবারিক পরিচয়ে তিনি ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা।

প্রারম্ভিক জীবন

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ঠাকুর পরিবারের জোড়াসাঁকো শাখার দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্র এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তার বাল্যশিক্ষা মূলত গৃহশিক্ষকের নিকট। যদিও তিনি কলকাতার সেন্ট পল’স স্কুল ও হিন্দু কলেজেও (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) কিছুকাল পড়াশোনা করেছিলেন।[২] দ্বিজেন্দ্রনাথ তার পরের ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। যদিও দুই ভাইয়ের মধ্যে প্রকৃতিগত কিছু পার্থক্য ছিল। দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন সমাজের প্রচলিত সংস্কারগুলির একনিষ্ঠ অনুগামী। অন্যদিকে সত্যেন্দ্রনাথ এই সংস্কারগুলিকে ভেঙে নব্য আধুনিক সমাজ গঠনের পক্ষপাতী ছিলেন।[৩] অনাড়ম্বর সহজ সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন কাব্যামোদী, জ্ঞানতাপস ও পরীক্ষানিরীক্ষা-প্রিয় মানুষ।[১] যৌবনেই তার স্ত্রীবিয়োগ ঘটেছিল। অবশিষ্ট জীবন দ্বিজেন্দ্রনাথ বিপত্নীক অবস্থাতেই অতিবাহিত করেছিলেন।[১]

কাব্যচর্চা

বাংলা সাহিত্যে দ্বিজেন্দ্রনাথের প্রথম অবদান ছিল ধ্রুপদি সংস্কৃত ভাষায় রচিত কালিদাসের মেঘদূত কাব্যের বঙ্গানুবাদ। ১৮৬০ সালে, নোবেল পুরস্কার-বিজয়ী কনিষ্ঠ ভ্রাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের ঠিক এক বছর আগে, এই গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থ প্রকাশকালে দ্বিজেন্দ্রনাথের বয়স ছিল মাত্র কুড়ি বছর। এই অনুবাদটিই ছিল মেঘদূতের প্রথম বাংলা অনুবাদ। দ্বিজেন্দ্রনাথ এই গ্রন্থ অনুবাদকালে দু-টি ভিন্ন বাংলা ছন্দশৈলী ব্যবহার করেছিলেন।[১]

তার দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ স্বপ্নপ্রয়াণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৭৫ সালে। এই গ্রন্থ প্রকাশকালে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কিশোর মাত্র। এই কাব্যে এক যুবকের ভ্রমণবৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। এই গ্রন্থে বিভিন্ন ছন্দশৈলীর প্রয়োগের উপর তার আশ্চর্য নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। গ্রন্থটি সেই যুগের বাংলা কাব্যের এক দিকনির্দেশক এবং সেই কারণে এর ঐতিহাসিক মূল্যও অনস্বীকার্য।[১]

দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন কাব্যচর্চা শুরু করেন, তখন মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন স্বীয় সাফল্যের শীর্ষদেশে। ১৮৫৬ সালে মাদ্রাজ (অধুনা চেন্নাই) থেকে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করার পর থেকে ইউরোপ যাত্রার পূর্বে ছয় বছর মাইকেল মধুসূদন একাগ্রতার সহিত তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৫৯), পদ্মাবতী (১৮৬০), মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১), ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১), বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২) ইত্যাদি কাব্য ও নাটকের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য জগৎকে সমৃদ্ধ ও প্রভাবিত করেন। দ্বিজেন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলিষ্ঠ লেখনী বাংলা সাহিত্যকে গৌরবের শিখরদেশে স্থাপন করে’।[৪] সেই যুগে বাংলার প্রত্যেক কবিই অল্পবিস্তর মধুসূদন দ্বারা প্রভাবিত হলেও, দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন এই প্রভাবের ঊর্ধ্বে।[১] বরং মধুসূদনই দ্বিজেন্দ্রনাথকে ভবিষ্যতের কবি হিসাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।[৫]

উচ্চ প্রতিভাবান কবি হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তি দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত অগোছালো মানুষ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, স্বপ্নপ্রয়াণ কাব্যের ছেঁড়া পাণ্ডুলিপির পাতা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির যেখানে সেখানে ছড়িয়ে পড়ে থাকত। এগুলি সংগ্রহ করে প্রকাশ করা গেলে তা উক্ত গ্রন্থের একটি মূল্যবান সংস্করণ হত।[১]

মন্তব্য করুন

অন্যান্য