Loading..

উদ্ভাবনের গল্প

রিসেট

১৮ নভেম্বর, ২০২০ ০২:৩২ অপরাহ্ণ

যোগ্যতা অর্জন করাই প্রধান লক্ষ্য


আসসালামু আলাইকুম,

শিক্ষার কিছু শাশ্বত লক্ষ্য আছে, আবার সমাজ পরিবর্তনের ধারায় যুগে যুগে শিক্ষার কিছু লক্ষ্যের সামান্য পরিবর্তনও হয়। আমেরিকান শিক্ষা মনোবিজ্ঞানী বেঞ্জামিন স্যামুয়েল ব্লুম ১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি দীর্ঘ গবেষণার পর শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য বিন্যস্ত করেছেন তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে। সেগুলো হলো চিন্তন, ভাবাবেগ এবং মনোপেশিজ। প্রথম ক্ষেত্রটি কোনো বিষয় জানা, বোঝা, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, সংশ্লেষণ (সৃষ্টি) এবং মূল্যায়ন করতে পারার। দ্বিতীয়টি কোনো বিষয়ের প্রতি আবেগ বা দরদ তৈরি হওয়াবিষয়ক; প্রথম ক্ষেত্রের বিষয়গুলো ভালোমতো জানা-বোঝা হলে সেগুলোর প্রতিও শিক্ষার্থীর দরদ আসে। আর এরূপ দরদ তৈরি হলে ‘জ্ঞানী’ ও ‘দরদি’ শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং ‘মনোপেশিজ দক্ষতা’ অর্জন করে।

শিক্ষার্থী এসব দক্ষতা বা যোগ্যতা কাজে লাগিয়ে ‘নিবেদিত কর্মী’ হয়ে ওঠে। তাই যোগ্যতা বা দক্ষতা বলতে কিছু করার সামর্থ্য বোঝায়। এসব সামর্থ্যের কিছু সরাসরি চিন্তাক্ষেত্রে পড়তে পারে; তবে এগুলো প্রধানত চিন্তন-পরবর্তী মনোপেশিজ ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সাধারণ শিক্ষা সচরাচর শিক্ষার্থীকে কোনো পেশায় যোগ্য করে তোলে না। তাই তাকে হয় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হয় অথবা কোনো পেশার উপযোগী আনুষ্ঠানিক কারিগরি শিক্ষা বা উপানুষ্ঠানিক বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়ে যোগ্যতা অর্জন করে কর্মে নিয়োজিত হতে হয়।

পেশাভিত্তিক যোগ্যতার এই প্রচলিত ধারণার ভিত্তিতে এতকাল সারা বিশ্বে শিক্ষকতা, চিকিৎসা শাস্ত্র, নার্সিং, গাড়ি চালনা ইত্যাদি কারিগরি ও পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের জন্য যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম তৈরি করা হতো। কর্মে যোগ্য হওয়ার জন্য দক্ষতা পুরোপুরি অর্জন করতে হয় বলে এসব প্রশিক্ষণ-কোর্সের শিখন হতে হয় ওস্তাদি পর্যায়ের; সাধারণ শিক্ষার মতো ৩৩-৪০ শতাংশ শেখা হলেই পাস করা যায় না। শিখন সম্পূর্ণ করতে যতবার অনুশীলন করা দরকার হোক, পেশায় পটুত্ব অর্জনের জন্য ততবারই তা করতে হয়। কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী স্তরের শিক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি যথাযোগ্য নৈতিক মানসম্পন্ন, মননশীল ও দেশপ্রেমিক করে গড়ে তোলার জন্য তাদের শিক্ষার সব উদ্দেশ্যই অর্জন করা প্রয়োজন; এতে শিক্ষা সার্বিক হয়। তাই এই স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্দেশ্যভিত্তিক শিক্ষাক্রম তৈরি করা হতো।

কিন্তু আমরা যদি শিক্ষার সব উদ্দেশ্যকেই একত্রে ‘যোগ্যতা’ নাম দিয়ে একটা ককটেল বানিয়ে ফেলি, তাহলে অবস্থাটা কেমন হয়? সে কথায় আসার আগে বিশ্বব্যাপী যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষা আন্দোলনের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে কিছু বলা দরকার।

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দা এবং বেকারত্ব বৃদ্ধির ফলে ফ্রান্স, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) স্কুলসহ শিক্ষার সব স্তরে যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষার ধারণা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। ওইসিডির ১৯৯৫ সালের রিপোর্টে দক্ষতা এবং যোগ্যতাকে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। এই সংস্থা ১৯৯৭ সালে পিসা (প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট) উদ্ভাবন করে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করে।

যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষার ধারণা ও বাস্তবায়ন সারা বিশ্বেই একটি চ্যালেঞ্জ। ধারণাগত চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে সব যোগ্যতাকে ‘পরিমাপযোগ্য’ হিসেবে বর্ণনা করা। শিক্ষার্থীর মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি এখনো দীর্ঘ সময়ব্যাপী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয় এবং এর মান পর্যবেক্ষকের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যবোধ নৈর্ব্যক্তিকভাবে পরিমাপ করার জন্য টেস্ট তৈরি করতে না পারা পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জ থেকে যাবে। বাস্তবায়ন ক্ষেত্রের প্রধান সমস্যা মাস্টারি লার্নিং অর্জন করা। যদিও বলা হয় যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষা সময়ভিত্তিক না হয়ে শিখনভিত্তিক হবে, বাস্তবে স্কুলশিক্ষা বার্ষিক সময়ের নিগড়ে বাঁধাই থাকবে; ওই নির্দিষ্ট সময়ে মাস্টারি অর্জন মোটেই সহজ হবে না। আর সব শিক্ষার্থীর নানা রকম চাহিদা পূরণ করে সবাইকে কাছাকাছি মানে উন্নীত করা এবং যার যেদিকে ঝোঁক সেদিকে দক্ষতা অর্জন করাতে হলে যে নানা রকম শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া (মাল্টিপল লার্নিং পাথওয়েজ) অবলম্বন করতে হবে, তার জন্য দরকার হবে সে রকম যোগ্য শিক্ষক ও শিক্ষা পরিবেশ।




মন্তব্য করুন