মানুষ মাত্রই নতুন কিছু খুঁজে বেড়ানোর আকাঙ্ক্ষা,নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য হন্যে হয়ে পড়া। নতুন কিছু উদ্ভাবনের এই যে প্রয়াস, এই যে ত্যাগ-তিতিক্ষা তা তখন-ই সাফল্য এনে দেয় যখন সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে। ক্রমবর্ধমান আধুনিক সভ্যতার এই যুগে নিত্য নতুন জ্ঞান মানুষের আচার-আচরণ ও চিন্তাধারাকে পরিশীলিত করে,তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। নতুনত্বের জন্ম দেয়ার এক দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা মানব সভ্যতাকে নতুন রুপ দিয়েছে।
সৃজনশীলতা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কখনো তা উদ্ভাবনী সৃজনশীলতা, কখনোবা তা কারিগরি সৃজনশীলতা,কখনোবা আবার তা বিশ্লেষণধর্মী সৃজনশীলতা।
উদ্ভাবনী সৃজনশীলতাঃ
নতুন কিছু তৈরী করা কিংবা আবিষ্কার করাই হলো উদ্ভাবন। যারা নতুন কিছু উদ্ভাবন করেন তারা উদ্ভাবনী সৃজনশীল ব্যক্তি। মানুষের প্রয়োজনের সাথে উদ্ভাবনী শক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় হলো উদ্ভাবনী সৃজনশীলতা। যেমন মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির প্রয়োজনে টমাস আলভা এডিসন এর বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিষ্কার পরবর্তীতে বিদ্যুৎ আবিষ্কার এর পথ সহজতর করে। আমেরিকান প্রকৌশলী মার্টিন কুপার এর মোবাইল আবিষ্কার। এসব-ই হচ্ছে উদ্ভাবনী সৃজনশীলতার উৎকৃষ্ট নমুনা।
কারিগরি সৃজনশীলতাঃ
কারিগরি জ্ঞান ও কাজেকর্মে উৎকর্ষতা প্রয়োগের মাধ্যমে শিল্প সৃষ্টি করাকে কারিগরি সৃজনশীলতা হিসেবে অভিহিত করা যায়। কারিগরি জ্ঞান মানুষের শৈল্পিক চিন্তাভাবনাকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করে,এজন্য সৃজনশীল মনন ও চিন্তাধারার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। যেকোন হস্তশিল্পের কাজ, নিজ উদ্যোগে কোন ব্যবসা শুরু করা ইত্যাদি কারিগরি সৃজনশীলতার অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্লেষণী সৃজনশীলতাঃ
এ ধরনের সৃজনশীলতার অভাব বর্তমানে আমাদের দেশে প্রকট। এক সময়ে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে স্বনামধন্য গায়ক-গায়িকা, গীতিকার,সুরকার এর অবাধ বিচরণ ছিল। অনেক বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকরা বাংলা সাহিত্যকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করে গেছেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে গান, কবিতা,গল্প,চিত্র এসব বিশ্লেষণী সৃজনশীলতা চর্চা এখন আর হয় না।
সৃজনশীলতা কেন গুরুত্বপূর্ণঃ
সৃজনশীলতার একটি অন্যতম গুণ হল তা যেকোন কাজকে সহজবোধ্য করে তোলে। যে কাজ অনেক চেষ্টা, অনেক সাধনার ফলেও সমাধান করা যায় না সে কাজের সহজ-সরল সমাধান এনে দেয় সৃজনশীলতা। একজন সৃজনশীল ব্যক্তি তার তীক্ষ্ণ চিন্তা চেতনা ও বুদ্ধিদীপ্ততার সমন্বয়ে যেকোন কাজ সম্পন্ন করতে প্রাধান্য দেন। ফলে সে কাজের ফল খুব সহজেই তার হাতে ধরা দেয়। সঠিক কর্মপন্থা ও সুচারু মানসিকতার সুবাদে সৃজনশীলতা যেকোন কাজে আশানুরূপ অগ্রগতি আনতে বিশেষ ভূমিকা রাখে৷
বর্তমানে শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণাবলী হলো যে,শিক্ষা হতে হবে প্রয়োগধর্মী। শিক্ষা বাস্তবতার চাহিদা পূরণে কাজ করবে। আর শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যক্তিজীবনের নানাবিধ ক্ষেত্রে থেকে সেই বাস্তবধর্মী জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটাবে। বাস্তবধর্মী তথা সৃজনশীল শিক্ষার আলোকে সে হবে সৃষ্টিশীল গুণসম্পন্ন একজন ব্যক্তি। সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই শিক্ষা বিপ্লব শুরু হয়েছে। আর জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই সে শিক্ষা বিপ্লবের অগ্রযাত্রা চলমান রাখা সম্ভব। কিন্তু আমাদের জ্ঞানের পরিধি কি আদৌ বৃদ্ধি পাচ্ছে?উত্তর হচ্ছে "না।" আমাদের দেশের সর্বত্র এখন শিক্ষার হার আগের তুলনায় বাড়ছে কিন্তু আমাদের শিক্ষার্জনের মধ্যে সৃজনশীলতার অভাব প্রকট। পুরনো ধ্যান-ধারণার কোন পরিবর্তন ঘটছে না। গতানুগতিকতা থেকে বের হয়ে একটি কল্যাণময় ও আদর্শ সমাজ গঠন করতে যে সৃজনশীলতা ও কর্মদক্ষতা প্রয়োজন তা আমাদের অনেকের মধ্যে অনুপস্থিত।
সৃজনশীলতা চর্চাঃ
অতি দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রজীবনে সৃজনশীলতা চর্চার সুযোগ অতি নগণ্য। কিন্তু তাই বলে মনোবল হারানো চলবে না। যে যৎসামান্য সুযোগ সমাজে বিদ্যমান সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ ঘটানোই হবে প্রধান কাজ।