চিত্র

মহাসাগরীয় তলদেশের ভূমিরুপ

অচিন্ত্য কুমার মন্ডল ৩০ ডিসেম্বর,২০২০ ১২৬ বার দেখা হয়েছে লাইক কমেন্ট ০.০০ রেটিং ( )

মহাসাগরগুলোর আয়তন ও গভীরতার জন্য এদের তলদেশের ভূ-প্রকৃতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। মহাসাগরের তলদেশ সমতল নয়। স্থলভাগের মতো সমুদ্রতলও অসমান। কারণ সমুদ্রতলে পাহাড়, পর্বত, মালভূমি, সমভূমি, গভীর খাত প্রভৃতি আছে। প্রাচীনকালে জাহাজ থেকে তারের মাথায় ভারী জিনিস বেঁধে সমুদ্রের মধ্যে নিক্ষেপ করে সমুদ্রের গভীরতা মাপা হতো। বর্তমানে শব্দ তরঙ্গের সাহায্যে সমুদ্রের গভীরতা মাপা হয়।

সমুদ্র তলদেশের ভূমিরূপের বর্ণনা : সমুদ্রের বিভিন্ন স্থানের গভীরতার তারতম্যের জন্য তার তলদেশের ভূমিরূপকে চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা-

১। মহীসোপান (continental Shelf) : পৃথিবীর মহাদেশগুলোর চতুর্দিকে স্থলভাগের কিছু অংশ অল্প অল্প ঢালু হয়ে সমুদ্রের পানির মধ্যে নেমে গেছে। এরূপে যেসব অংশে সমুদ্রের গভীরতা ১৮০ মিটারের (৬০০ ফুট) অনধিক, সেসব ক্রমনিম্ন নিমজ্জিত অংশকে মহীসোপান বলে। মহীসোপানের সবচেয়ে ওপরের অংশকে উপকূলীয় ঢাল বলে। মহীসোপানকে আবার দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়। যেমন-

ক. তটদেশীয় অঞ্চল : তীরভূমির যে স্থানের মধ্যে জোয়ার-ভাটার সময় পানি ওঠানামা করে তাকে তটদেশীয় অঞ্চল বলে। স্থল থেকে সাগর পর্যন্ত এ অঞ্চল প্রায় ৩.২ কিলোমিটার প্রশস্ত। সমগ্র পৃথিবীতে তটদেশীয় অঞ্চলের মোট আয়তন প্রায় ১৫৫ হাজার বর্গকিলোমিটার। সমুদ্রতট বলতে এ অঞ্চলকেই বোঝায়।

খ. ঝিনুক অঞ্চল : তটদেশীয় অঞ্চলের পর থেকে মহীসোপানের সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশকে ঝিনুক অঞ্চল বলা হয়। এ অঞ্চলে সমুদ্রতরঙ্গ সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল। সমুদ্রতরঙ্গের ক্ষয় ও গঠন ক্রিয়া এ অঞ্চলে সুস্পষ্ট। সমগ্র পৃথিবীতে এর মোট আয়তন প্রায় ২৫০ লাখ বর্গকিলোমিটার।

বিস্তৃতি : মহীসোপানের বিস্তৃতি সব জায়গায় সমান নয়। উপকূলভাগের বন্ধুরতার ওপর এর বিস্তৃতি নির্ভর করে। উপকূল যদি বিস্তৃত সমভূমি হয়, তবে মহীসোপান অধিক প্রশস্ত হয়। মহাদেশের উপকূলে পর্বত বা মালভূমি থাকলে মহীসোপান সংকীর্ণ হয়। ইউরোপের উত্তরে বিস্তৃত সমভূমি থাকায় উত্তর মহাসাগরের মহীসোপান খুবই প্রশস্ত।

২। মহীঢাল : মহীসোপানের শেষ সীমা থেকে ভূ-ভাগ খাড়াভাবে নেমে সমুদ্রের গভীর তলদেশের সঙ্গে মিশে যায়। এ ঢালু অংশকে মহীঢাল বলে। সমুদ্রে এর গভীরতা ১৮০ মিটার (৬০০ ফুট) থেকে ৩৬০০ মিটার। মহীঢাল অধিক খাড়া হওয়ায় খুব প্রশস্ত নয়। এটি গড়ে ১৬ থেকে ৩২ কিলোমিটার প্রশস্ত। মহীঢালের উপরিভাগ সমান নয়। অসংখ্য অন্তঃসাগরীয় গিরিখাত অবস্থান করায় তা খুবই বন্ধুর প্রকৃতির। এর ঢাল মৃদু হলে জীবজন্তুর দেহাবশেষ, পলি প্রভৃতির অবক্ষেপণ দেখা যায়।

৩। গভীর সমুদ্রের সমভূমি (উববঢ় ঝবধ ঢ়ষধরহং) : মহীঢাল শেষ হওয়ার পর থেকে সমুদ্র তলদেশে যে বিস্তৃত সমভূমি দেখা যায়, তাকে গভীর সমুদ্রের সমভূমি বলে। এর গভীরতা ৩ থেকে ৫ কিলোমিটার। এ অঞ্চলটিকে সমভূমি বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে তা এমন না। কারণ গভীর সমুদ্রের সমভূমির ওপর জলমগ্ন বহু মালভূমি, পাহাড়-পর্বত অবস্থান করে। আবার কোথাও রয়েছে নানা ধরনের আগ্নেয়গিরি। এসব উচ্চভূমির কোনো কোনোটি আবার পানিরাশির ওপর দ্বীপরূপে অবস্থান করে।

৪। গভীর সমুদ্র খাত : গভীর সমুদ্রের সমভূমি অঞ্চলের মাঝে মাঝে গভীর গর্ত দেখা যায়। এসব গর্তকে সমুদ্র খাত বলে। পাশাপাশি অবস্থিত মহাদেশীয় ও সামুদ্রিক পাতের সংঘর্ষের ফলে সমুদ্র খাতের উদ্ভব হয় বলে প্রতিটি গভীর সমুদ্র খাত পাত সীমানায় অবস্থিত। এ পাত সীমানায় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি অধিক হয় বলেই এসব খাত সৃষ্টি হয়েছে। হৃদের গভীরতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫৪০০ মিটারের অধিক।

মতামত দিন