Loading..

প্রকাশনা

কুলাউড়ার কালা পাহাডের ইতিবৃত্ত জেনে নেই চলুন
১৬ মার্চ, ২০২১

 কালা পাহাড় আসলেই কি কালো?

শ্রেণী : লংলা~হাড়ারগজ পর্বতশ্রেণী

উচ্চতা : 1,098 feet (GPS accuracy +/-3 m)

স্থানাঙ্ক : 24°24.586'N | 92°04.792'E

পরিচিতিঃ- পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় স্থান কালা পাহাড় হচ্ছে বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিন্দু বা চূড়া। এমনকি এটি সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ পর্বতশৃঙ্গ। এর অবস্থান মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নে।

ইতিহাসঃ- ২০১৫ সালের দিকে একদল ভ্রমণপিয়াসী অভিযাত্রী 'বিডি এক্সপ্লোরার' সর্বপ্রথম এই অনিন্দ্যসুন্দর চূড়াটি খোঁজে পায় এবং গারমিন চালিত জিপিএস দিয়ে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর সর্বোচ্চ বিন্দু সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ১১০০ ফুট পরিমাপ করে। সঠিক প্রচারণার অভাবে যা ছিলো তখন একদম লোকচক্ষুর আড়ালে। তারপর কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসনের পরামর্শে 'Kulaura Problem & Prospect - কুলাউড়া সমস্যা ও সম্ভাবনা' সাইবার কমিউনিটি পাহাড়টির চূড়া জয় করে, রোমাঞ্চকর তথ্যগুলো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় লেখালেখি করে অনলাইন প্রমোটিং দ্বারা এই ট্যুরিস্ট স্পট ব্রান্ডিং শুরু করে দেয়। ফলস্বরূপ কালা পাহাড়ের সৌন্দর্য এখন সমগ্র দেশব্যাপী প্রসারিত হয়ে তা বর্তমানে পর্যটকদের লাইমলাইটে চলে এসেছে।

অবস্থানঃ- এই পাহাড়টির এক পাশে বাংলাদেশের কুলাউড়া-জুড়ী সীমান্ত, অন্য পাশে ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত। উল্লেখিত সংরক্ষিত বন এলাকাকে লোকমুখের ভাষায় 'লংলা পাহাড়শ্রেণী' নামে ডাকা হয়। কালা পাহাড় হচ্ছে এখানকার সর্বোচ্চ চূড়ার স্থানীয় প্রচলিত নাম। বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক সোসাইটির মতে, এই পাহাড়টি 'হাড়ারগজ রিজার্ভ ফরেস্ট' নামেও পরিচিত। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় অবস্থান করা এই পাহাড়ের ৬০% বাংলাদেশে পড়েছে এবং বাকি অংশ ভারতের উত্তর ত্রিপুরায় অবস্থিত। ত্রিপুরায় এই পাহাড়টির বাকি অংশ রঘুনন্দন পাহাড় নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিক নিদর্শনঃ- উপমহাদেশের বিখ্যাত প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ধর্মীয় স্থান ঊনকোটি, এই পাহাড়টির পাদদেশে ভারতীয় অংশে অবস্থিত। এছাড়া পাহাড়টির চূড়ার কাছাকাছি বাংলাদেশ অংশে ছাতাচড়া নামের একটি মোকাম আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কালা পাহাড়ের উপর একটি বিমান ভূপাতিত হয়েছিলো।

প্রাকৃতিক আকর্ষণঃ- শরৎকালে আকাশ পরিষ্কার হলে, কালা পাহাড়ের সর্বোচ্চ বিন্দু থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকির নীল পানি স্বচ্ছভাবে অবলোকন করা যায়। বৃষ্টির দিনে পাহাড়টির চূড়া থেকে আকাশে মেঘের খেলা একদম কাছাকাছি উপভোগ করা যায়। যাত্রাকালে ঝিরিপথ দিয়ে হাটার সময় বেশ কয়েকটি ছোট ঝর্ণা পাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে আধিবাসীদের শান্তশিষ্ট পোষা হাতিগুলো দূর থেকে দেখা যায়। এছাড়া আন্ডর বা কুম তৈরী করার জন্য আধিবাসীরা ছড়ার মধ্যে অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখে সপ্তাহে একদিন ফ্ল্যাশ ফ্লাডে বাশের আটি সমতলের বাজারে নিয়া আসার জন্য, ভাগ্য ভালো থাকলে আপনিও ভেলায় চড়ে লোকালয়ে আসতে পারেন। পাহাড়ি মেঠোপথে খালের উপর গাছের গুড়ির সাঁকো খুবই আকর্ষণীয়।

স্থানীয় সংস্কৃতিঃ- এই পাহাড় সংলগ্ন কিছু খাসিয়া গ্রাম রয়েছে; যেমন- বেগুনছড়া পুঞ্জি, লবণছড়া পুঞ্জি ও পুঁটিছড়া পুঞ্জি। এখানে বসবাসকারী প্রায় পাঁচশত পরিবারের খাসিয়া জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বেশিরভাগই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। সেখানকার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে পান চাষ।

রোডম্যাপঃ- কালা পাহাড়ে যেতে হলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ট্রেন অথবা বাসে করে প্রথমে কুলাউড়ায় আসতে হবে খুব সকালে। কুলাউড়া পৌর শহর থেকে কালা পাহাড়ের দূরত্ব আনুমানিক ৩০ কি.মি। শুরুতে কুলাউড়া থেকে গাড়িযোগে রবিরবাজার হয়ে কর্মধার আজগরাবাদ চা বাগান গেইটে পৌঁছাতে হবে। তারপর ৪৫ মিনিট পায়ে হেটে বেগুনছড়া পুঞ্জিতে যেতে হয়। এরপর বেগুনছড়া পুঞ্জির দায়িত্বশীল মন্ত্রীর কাছ থেকে স্থানীয় অভিজ্ঞ গাইড নিয়ে টানা ২ ঘন্টা পাহাড় আরোহণ করা লাগবে। গাইড রেডি রাখার ব্যাপারে ট্রিপের আগেরদিন বেগুনছড়া পুঞ্জির দায়িত্বে থাকা বর্তমান হেডম্যান বা মন্ত্রী লেম্বু দাদার সাথে টেলিফোনে(০১৯৫১৬৪৯৮৮১) যোগাযোগ করে গেলে ভালো হবে। কালা পাহাড়ের একদম শীর্ষস্থান যেখানে ট্যুরিস্টরা কলম দিয়ে কাগজে আরোহীদের নাম সহ স্মৃতিচারণ নোট লিখে তা বোতলবন্দী করে গাছে ঝুলিয়ে রাখে, সেই বিখ্যাত সামিট পয়েন্টে গেলেই আপনি মনে করবেন আপনার অসাধ্য সাধন হয়ে গেছে। তখন ভিউ দেখে এক নিমিষের জন্য পিছনের সব কষ্ট ভুলে যাবেন। কালা পাহাড়ের উপরে উঠার রাস্তা একটা (পাহাড়ি পথ) কিন্তু একই রাস্তা দিয়ে নামার ক্ষেত্রে ঝিরি পথ ও পাহাড়ি পথ দুইটা। বিকালে রবিরবাজার এসে দুপুরের লাঞ্চ করতে পারবেন। এখানকার বিখ্যাত মসজিদে নামাজ পড়ার সুযোগ মিস করবেন না। আর হাতে সময় থাকলে বোনাস হিসেবে পৃথিমপাশার ঐতিহ্যবাহী নবাববাড়ি ঘুরে যেতে পারেন। এছাড়া কালা পাহাড়ের চূড়া থেকে আসার সময় অন্য আরেকটি সময়সাপেক্ষ, জুড়ী উপজেলার ফুলতলা বাজারের কাছে অবস্থিত রাজকি চা বাগান হয়েও লোকালয়ে ফিরা যায়। তবে এই রুট অনেক সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

পরামর্শঃ- একাএকা না গিয়ে কমপক্ষে ৫ জনের টিম বানিয়ে গেলে বেশি মজা পাবেন। কালা পাহাড় আরোহী প্রত্যেকের ব্যাকপ্যাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ শুকনো খাবার যেমন কেক, ব্রেড, কলা ও জনপ্রতি কমপক্ষে ২ লিটার পানীয় জল সাথে নিতে হবে। কাপড় হিসেবে ফুল হাতা শার্ট বা জিন্স প্যান্ট না পড়ে নরমাল গেঞ্জি ও ট্রাউজার পড়বেন আর পায়ের জন্য পিছন দিকে ফিতাওয়ালা মজবুত জুতা অথবা যেসব কেডস-শূ ভিজলেও সমস্যা হবেনা, অর্থাৎ এমন জিনিস পরিধান করে যাবেন যাতে পাহাড় এবং খাল দিয়ে সহজে চলাফেরা করা যায়। চূড়ার উপর পর্বত বিজয়ের সুন্দর ছবি তোলার জন্য দলের যেকোনো একজনের সাথে একটি দেশের পতাকা রাখতে পারেন। আর যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির আপনাদের এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করতে আমরা নিরুৎসাহিত করছি। তবে পুরুষের পাশাপাশি এখন অনেক অদম্য নারীরা এই অসম্ভবকে নিয়মিত সম্ভব করতেছেন। আসলে আপনার যদি প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকে তাহলে মন থেকে চাইলে যেকোনো বাধা টপকানো অবশ্যই সম্ভব।

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ- প্রকৃতিতে কোনো অপচনশীল আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করে আসবেন না। উচ্ছিষ্ট ময়লা ব্যাগের সাথে নিয়ে এসে লোকালয়ের নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবেন। আর দয়া করে পুঞ্জি এলাকায় এমন কোনো আচরণ করবেন না যা স্থানীয় আধিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতিতে আঘান হেনে তাদের মনে কষ্ট দেয়। আপনাদের উষ্ণ আতিথেয়তা দেওয়ার জন্য কুলাউড়াবাসী সবসময় মুখিয়ে আছে।

নিমন্ত্রণবাণীঃ- বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখন ট্যুরিস্টরা মূলত এক্সট্রিম হিল ট্রেকিং ও এডভেঞ্চারাস ট্রেইলের ট্রিপ এক্সপিডিশন করার জন্য নিয়মিত কালা পাহাড়ে ঘুরতে আসেন। আপনার যদি ঢাকার ফ্যান্টাসি কিংডম কিংবা সিলেটের ড্রীমল্যান্ড পার্ক জাতীয় স্থানগুলো পছন্দ তবে কালা পাহাড় আপনার জন্য আদর্শ না। আপনি যদি পর্বতমালা ভালোবাসেন এবং শহুরে যান্ত্রিকতা ছেড়ে মায়াবী প্রকৃতির নিসর্গ সৌন্দর্যের মাঝে নিজেকে কিছুটা সময়ের জন্য হারিয়ে সৃষ্টিকর্তার অপরূপ পৃথিবী প্রাণভরে উপভোগ করতে চান, তাহলে জীবনে একবার হলেও সুউচ্চ কালা পাহাড় আরোহন করে কল্পনার রাজ্যে নেপালের হিমালয় এভারেস্ট বিজয় স্বাদের সামান্য অনুভূতি এখান থেকে নিতে পারেন। যেকোনো সহযোগিতার জন্য কুলাউড়া সমস্যা ও সম্ভাবনা পেইজের ইনবক্সে যোগাযোগ করবেন অথবা Kulaura Problem & Prospect গ্রুপে পোস্ট করে বিনামূল্যে কাঙ্ক্ষিত ভ্রমণ সেবা নিতে পারেন। আমাদের পক্ষ থেকে আপনার কালা পাহাড় জয়ের ব্যাপারে অগ্রীম অভিনন্দন ও শুভকামনা রইলো...

©Mahfuj Hamid ও এ্যাডভোঃহারিস এর সৌজন্যে ব্যাংকার্স ট্রাভেলার্স গ্রুপ এর পেজ থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

অন্যান্য