সহকারী শিক্ষক
০২ জুন, ২০২১ ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা চালানো হয়। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর শুরু করা অপারেশন সার্চলাইট নামক হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত চলে এবং এই নয় মাসে জামায়াতে ইসলামীর রাজাকার, আলবদর ও আলশামসদের সহায়তায় বিপুল সংখ্যক বাঙালিকে হত্যা করা হয়। যুদ্ধের সময়, পাকিস্তানে একটি ফতোয়া ঘোষণা করা হয় যে, বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা হল হিন্দু এবং তাদের নারীদেরকে যুদ্ধের "গনিমতের মাল" বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।[১৩৬]
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে তা নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন রকম পরিসংখ্যান প্রচলিত রয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিশ্বকোষ ও বইতে এই সংখ্যাটিকে ২,০০,০০০ থেকে শুরু করে ৩০,০০,০০০ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।[১৩৭] বাংলাদেশে সরকার সংখ্যাটিকে ৩০,০০,০০০ হিসেবে অনুমান করে থাকে। বিবিসির বক্তব্যমতে, স্বাধীন গবেষকদের গবেষণা অনুযায়ী সংখ্যাটি ৩ লাখ থেকে ৫ লাখের মধ্যে।[১৩৮] পাকিস্তানি পত্রিকা ডনের দাবি মতে, হামিদুর রহমান কমিশনের মতে সংখ্যাটি ২৬০০০, আবার তৎকালীন অনেক বাঙালি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি একাডেমিক ব্যক্তিত্বের মতে, সংখ্যাটি তিন লাখ, যা বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের সময় ভুলবশত তিন মিলিয়ন হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে, যা বাংলায় ত্রিশ লক্ষের সমান।[১৩৯] যুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে, যারা সে সময় দেশত্যাগ না-করলে হয়তো গণহত্যার শিকার হত।[১৪০] স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে ১৪ ডিসেম্বর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী[১৪১] পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্দেশে বাংলাদেশের প্রায় ৩০০ জন বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে যায় এবং নির্মমভাবে হত্যা করে - যাঁদের মধ্যে ছিলেন শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী।[১৪২] পাকিস্তানপন্থী বাঙালি রাজাকারগণ ডিসেম্বরের শুরুতে যুদ্ধের পরিণতি বুঝতে পেরে স্বাধীনতার ঠিক আগে আগে সুপরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। ধারণা করা হয়, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রগতির পথ বন্ধ করে দেওয়া ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। ১৪ ডিসেম্বরে নিহত বুদ্ধিজীবীদের লাশ বিভিন্ন গণকবরে ফেলে আসা হয়, যার মধ্যে রায়েরবাজার বধ্যভূমি অন্যতম (বর্তমানে এ বধ্যভূমিতে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়েছে)। ঢাকা এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু গণকবর ও বধ্যভূমির সন্ধান পাওয়া গেছে এবং মাঝে মাঝেই এমন নতুন বধ্যভূমি আবিষ্কৃত হচ্ছে (উদাহরণস্বরূপ ঢাকায় অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় ১৯৯৯ সালের আগস্ট মাসে একটি কূপের ভেতর গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়)।[১৪৩] ঢাকায় অবস্থিত আমেরিকান কনসুলেট থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেটস ডিপার্টমেন্টে পাঠানো টেলিগ্রামেও যুদ্ধ শুরুর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও সাধারণ জনতার ওপর চালানো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে।[১৪৪] সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সেসময় বিপুল আকার ধারণ করে, যা শুধুমাত্র পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক সঙ্ঘটিত ও উৎসাহিত হয় নি,[১৪৫] বরং বাঙালি জাতীয়তাবাদীগণ কর্তৃক অবাঙ্গালি সংখ্যালঘুদের উপরও করা হয়েছিল, বিশেষ করে বিহারিদের উপর।[১৪৬] ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে, বিহারি প্রতিনিধিগণ দাবি করেন যে, ৫,০০,০০০ বিহারি বাঙালিদের হাতে নিহত হয়েছে।[১৪৭] আর. জে. রামেলের মতে, আনুমানিক প্রায় ১৫০,০০০ বিহারিকে সেসময় হত্যা করা হয়েছিল।[১৪৮]
স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে বহুসংখ্যক বাঙালি নারী ধর্ষিত হয়; যার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। বাংলাদেশে ধারণা করা হয় প্রায় ২,০০,০০০ থেকে ৪,০০,০০ নারী মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিকল্পিত ধর্ষণ ও হত্যা পরিকল্পনার অধীনে ধর্ষিত হয় এবং তাদের গর্ভে অনেক যুদ্ধশিশু জন্ম নেয়।[১৪৯][১৫০][১৫১] ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে পাকিস্তানি সৈন্যরা বহুসংখ্যক মেয়েকে ধরে নিয়ে গিয়ে নিজেদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করে, যাদের অধিকাংশই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাধারণ পরিবারের মেয়ে।[১৫২]