হুনাইনের যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী পরাজিত হাওয়াজিন গোত্রের পিছু ধাওয়া করে এবং তাইফ অবরোধ করে। [1]
তাইফ অভিযান ও অবরোধ
আউতাসের যুদ্ধ: হুনাইনে পরাজিত হয়ে শত্রুসেনাদের একটি অংশ আউতাসে এবং প্রধান সেনাপতি মালিক ইবনে আউফসহ একটি দল তাইফের সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় নেয়। মুসলিমরা আউতাসের পর তাইফ অভিমুখে রওনা হয়। [1, 2]
তাইফ অবরোধ: মহানবী (সা.) তাইফ দুর্গ ঘেরাও করেন। দুর্গটি অত্যন্ত মজবুত ও সুরক্ষিত থাকায় এবং শত্রুরা ভেতর থেকে তীর ও পাথর নিক্ষেপ করায় সরাসরি তা দখল করা সম্ভব হয়নি। প্রায় ২০ দিন বা কিছুদিন অবরোধের পর কৌশলগত কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাইফ অবরোধ তুলে নেন এবং জি’আরণা নামক স্থানে ফিরে আসেন। [1]
গনিমতের মাল ও বন্দী বিতরণ
বন্দীদের মুক্তি: হুনাইনের যুদ্ধে হাওয়াজিন গোত্রের ৬,০০০ এর বেশি নারী-পুরুষ বন্দী এবং প্রচুর সম্পদ ও গনিমতের মাল অর্জিত হয়। পরবর্তীতে হাওয়াজিন প্রতিনিধিদল ক্ষমা প্রার্থনা করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের সমস্ত বন্দীকে নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেন। তাঁর এই মহানুভবতা দেখে সমগ্র হাওয়াজিন গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। [1, 2]
গনিমতের মাল বণ্টন: জি’আরণায় গনিমতের মাল বণ্টনকালে রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কার নতুন মুসলিমদের (যাদের মন জয় করা প্রয়োজন ছিল, যেমন কুরাইশ নেতা ও মুয়াল্লাফাতুল কুলুব) বেশি পরিমাণে দান করেন। [1, 2]
আনসারদের মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনা
মদিনার আনসার সাহাবিদের কেউ কেউ মনে সামান্য কষ্ট পেয়েছিলেন যে, নিজেদের তরবারির রক্ত ঝরলেও গনিমতের বড় অংশ কুরাইশ ও নতুন মুসলিমদের দেওয়া হলো।
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) আনসারদের এক বিশেষ সমাবেশে ডেকে অত্যন্ত দরদি ও প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষণ দেন। তিনি বলেন, "তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, লোকেরা ছাগল-উট নিয়ে তাদের বাড়িতে ফিরবে আর তোমরা রাসূলকে নিয়ে তোমাদের ডমানায় (মদিনায়) ফিরবে?" এই সান্ত্বনায় আনসারগণ কেঁদে বুক ভাসান এবং সন্তুষ্টচিত্তে ফিরে যান।
হুনাইনের যুদ্ধের পরবর্তী এই ঘটনাবলির মধ্যে কোন নির্দিষ্ট ঘটনাটি (যেমন তাইফ অবরোধের কৌশল, বন্দীদের মুক্তি নাকি আনসারদের সাথে রাসূলের (সা.) বিশেষ কথোপকথন) সম্পর্কে আপনি আরও বিস্তারিত জানতে চান?
তাইফ অবরোধের কৌশল
তাইফ অবরোধে (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ / হিজরি ৮ম সন) সাকিফ ও হাওয়াজিন গোত্রের সুরক্ষিত দুর্গের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বেশ কিছু আধুনিক, উদ্ভাবনী এবং মনস্তাত্ত্বিক সামরিক কৌশল অবলম্বন করেছিল। ইসলামের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম কোনো সুরক্ষিত দুর্গ দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা। [1, 2, 3]
অবরোধের মূল কৌশলগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. নতুন যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবহার (মিনজানিক ও দাব্বাবাহ)
মিনজানিক (Catapult): সাকিফ গোত্রের সৈন্যরা দুর্গের ভেতর থেকে অনবরত তীর বর্ষণ করছিল, যার ফলে মুসলিমদের সরাসরি প্রাচীরের কাছে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে。 এর জবাবে সালমান আল-ফারিসি (রা.)-এর পরামর্শে মহানবী (সা.) ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মিনজানিক বা ক্যাটাপল্ট (পাথর নিক্ষেপক যন্ত্র) ব্যবহার করেন। এটি দিয়ে দুর্গের ভেতর ও প্রাচীরে বড় বড় পাথর নিক্ষেপ করা হয়। [1, 2, 3, 4]
দাব্বাবাহ / টেস্টুডো (Testudo): দুর্গের দেয়াল ভাঙার জন্য মুসলিম সৈন্যরা কাঠের তৈরি এক ধরণের বিশেষ চলন্ত ছাউনি বা সাঁজোয়া যান (দাব্বাবাহ) ব্যবহার করেন। এর ভেতরে থেকে সৈন্যরা তীরের আঘাত থেকে নিজেদের রক্ষা করে দুর্গের দেয়ালের গোড়ায় পৌঁছানোর কৌশল নেন। তবে শত্রুরা উপর থেকে জ্বলন্ত লোহা ও গরম তেল নিক্ষেপ করায় এই কৌশলটি পূর্ণ সফল হতে পারেনি। [1, 2]
২. অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ
আঙ্গুর ও ফলের বাগান কাটা: তাইফ ছিল অত্যন্ত উর্বর এবং তাদের প্রধান অর্থনৈতিক উৎস ছিল আঙুর ও ফলের বাগান। শত্রুদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করতে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের বাগানের কিছু অংশ কাটার নির্দেশ দেন。 শত্রুরা যখন আল্লাহর দোহাই দিয়ে এটি বন্ধ করার অনুরোধ করে, তখন দয়াপরশ হয়ে তিনি তা বন্ধ করেন। [1, 2]
দাসদের মুক্তি ও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা: তাইফ দুর্গের ভেতরের সম্পদশালী সাকিফদের অধীনে প্রচুর দাস-দাসী ছিল। অবরোধ চলাকালে মহানবী (সা.) ঘোষণা করেন, "দুর্গ থেকে যে দাস বেরিয়ে আমাদের কাছে চলে আসবে, সে স্বাধীন"। এই কৌশল দারুণ কাজ করে; প্রায় ২০ জনের মতো দাস দুর্গ থেকে পালিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে, যা দুর্গের ভেতরের যোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে দেয়। [1, 2]
৩. কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন ও কাঁটার ব্যবহার
শিবির নিরাপদ দূরত্বে সরানো: প্রথম দিকে মুসলিমদের ক্যাম্প দুর্গের খুব কাছে থাকায় তীরের আঘাতে বেশ কয়েকজন সাহাবি শহীদ হন। তখন রণকৌশল বদলে ক্যাম্পটিকে তীরের সীমানার বাইরে নিরাপদ দূরত্বে (যেখানে বর্তমানে 'মসজিদুত তায়েফ' অবস্থিত) সরিয়ে নেওয়া হয়। [1, 2]
কাঁটা বিছিয়ে অবরুদ্ধ করা: দুর্গের চারপাশের প্রধান পথগুলোতে লোহার বা কাঠের তীক্ষ্ণ কাঁটা (Caltrops) ও কাঁটাযুক্ত গাছের ডাল ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যেন শত্রুরা অতর্কিত রাতের বেলা বাইরে বের হতে না পারে কিংবা বাইরে থেকে কোনো খাদ্য রসদ ভেতরে ঢুকতে না পারে। [1, 2]
৪. অবরোধ প্রত্যাহার ও দূরদর্শী কৌশল
প্রায় ২০ দিনের মতো অবরোধ চলার পর, যখন দেখা গেল যে শত্রুরা ১ বছরের খাদ্য মজুত করে রেখেছে এবং দুর্গের দেয়াল সম্পূর্ণ ভাঙা যাচ্ছে না, তখন অপ্রয়োজনীয় রক্তপাত এড়াতে নওফেল ইবনে মুয়াবিয়ার পরামর্শে রাসূলুল্লাহ (সা.) কৌশলগতভাবে অবরোধ তুলে নেন। [1, 2, 3, 4]
নওফেল (রা.) বলেছিলেন, "ওরা গর্তের শিয়াল, বসে থাকলে আপনার ক্ষতি করতে পারবে না, আর ছেড়ে দিলে গর্ত থেকেই বের হয়ে আসবে।" এই দূরদর্শী কৌশলটিই পরবর্তীতে সত্য প্রমাণিত হয়, কারণ সামরিক শক্তির পরিবর্তে মুসলিমদের এই সহনশীলতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে এক বছরের মধ্যেই তাইফবাসী নিজে থেকেই মদিনায় এসে নিঃশর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। [1]
১৫
২৫ মন্তব্য