Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ মার্চ, ২০২৬ ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ

পিসি এবং কিবোর্ড পরিষ্কার রাখার সঠিক পদ্ধতি

লেখক: মোঃ মাসুম খান, কম্পিউটার অপারেশন সুপারভাইজার

আমি দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে আসছি। এই সময়ের মধ্যে একটা জিনিস বারবার দেখেছি — অনেকেই কম্পিউটার কিনে ঠিকঠাক ব্যবহার করেন, কিন্তু পরিষ্কার রাখার বিষয়টা প্রায়ই এড়িয়ে যান। অথচ একটু নিয়মিত যত্ন নিলেই পিসি এবং কিবোর্ড অনেক বেশি দিন ভালো থাকে।

আজকের এই লেখায় আমি সহজ ভাষায় বলব — পিসি এবং কিবোর্ড কীভাবে সঠিকভাবে পরিষ্কার করবেন, কী কী জিনিস লাগবে, এবং কোন ভুলগুলো করা উচিত না।

কেন পিসি ও কিবোর্ড পরিষ্কার রাখা দরকার?

অনেকে মনে করেন, কম্পিউটার তো বাইরে থেকে দেখতে ঠিকঠাক আছে, পরিষ্কার করার কী দরকার? কিন্তু আসলে ভেতরে ধুলা জমে যাওয়াটা অনেক বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।

ধুলা জমলে কম্পিউটারের ভেতরে ঠিকমতো বাতাস চলাচল করতে পারে না, ফলে প্রসেসর এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ গরম হয়ে যায়। একটু বেশি গরম হলেই পিসি স্লো হয়ে যায়, হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে হার্ডওয়্যার নষ্টও হতে পারে।

আর কিবোর্ডে? প্রতিদিন যেটাতে আঙুল দিচ্ছেন, সেখানে কতটা ময়লা জমে — সেটা ভাবলে একটু অবাক হবেন। গবেষণা বলছে, কিবোর্ড টয়লেট সিটের চেয়েও বেশি জীবাণু বহন করতে পারে। তাই স্বাস্থ্যের কথা ভেবেও পরিষ্কার রাখাটা জরুরি।

কম্পিউটার কীভাবে কাজ করে এবং এর বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন: কম্পিউটার কী, কীভাবে কাজ করে – সব প্রশ্নের উত্তর এখানে

কিবোর্ড পরিষ্কার করার আগে যা জানা দরকার

কিবোর্ড পরিষ্কার করতে যাওয়ার আগে কিছু সাধারণ সতর্কতা মেনে চলা উচিত। না হলে উপকারের বদলে ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

পরিষ্কার শুরুর আগে যা করবেন:

  1. কিবোর্ড প্লাগ খুলে ফেলুন অথবা কম্পিউটার বন্ধ করুন
  2. ওয়্যারলেস কিবোর্ড হলে ব্যাটারি খুলে নিন
  3. কোনো তরল সরাসরি কিবোর্ডের উপর ঢালবেন না — কাপড়ে লাগিয়ে তারপর মুছুন

কিবোর্ড পরিষ্কারের জন্য যা যা লাগবে

বেশি কিছু লাগে না। সাধারণ কিছু জিনিস দিয়েই কাজ হয়ে যায়:

  1. মাইক্রোফাইবার কাপড় (নরম কাপড়)
  2. কম্প্রেসড এয়ার ক্যান (বাজারে পাওয়া যায়)
  3. আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল (৭০% বা বেশি)
  4. কটন বাড / তুলার কাঠি
  5. ছোট নরম ব্রাশ (পুরনো টুথব্রাশও চলবে)
  6. কি-ক্যাপ পুলার (মেকানিক্যাল কিবোর্ড হলে)

কিবোর্ড পরিষ্কারের ধাপগুলো

ধাপ ১: উল্টো করে ঝাঁকান

প্রথমে কিবোর্ডটা উল্টো করে ধরুন এবং আস্তে আস্তে ঝাঁকান। ভেতরে আটকে থাকা বিস্কুটের গুঁড়া, ধুলা, চুলসহ বিভিন্ন ময়লা বেরিয়ে আসবে। এটা সবচেয়ে সহজ এবং প্রথম কাজ।

ধাপ ২: কম্প্রেসড এয়ার দিয়ে ফুঁ দিন

কম্প্রেসড এয়ার ক্যান দিয়ে চাবির ফাঁকে ফাঁকে হাওয়া দিন। এতে যে ময়লাগুলো আটকে আছে সেগুলো বেরিয়ে আসবে। ক্যানটা সোজা রাখুন, উল্টো করবেন না — তাহলে ভেতর থেকে তরল বেরিয়ে ক্ষতি করতে পারে।

ধাপ ৩: মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে মুছুন

একটু আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল মাইক্রোফাইবার কাপড়ে লাগিয়ে কিবোর্ডের উপরের অংশটা মুছুন। এটা চাবির উপরের তেলতেলে দাগ ও জীবাণু দূর করে। সরাসরি কিবোর্ডের উপর কখনো তরল স্প্রে করবেন না। Market

ধাপ ৪: কটন বাড দিয়ে চাবির ফাঁক পরিষ্কার করুন

চাবির পাশের অংশে কটন বাড দিয়ে আলতো করে ঘষুন। ছোট জায়গাগুলো এভাবে ভালো পরিষ্কার হয়।

ধাপ ৫: (মেকানিক্যাল কিবোর্ডের জন্য) কি-ক্যাপ খুলে ডিপ ক্লিন করুন

মেকানিক্যাল কিবোর্ড হলে একটু গভীরভাবে পরিষ্কার করার সুযোগ আছে। কি-ক্যাপ পুলার দিয়ে চাবিগুলো খুলে ফেলুন। তারপর হালকা গরম পানিতে সামান্য সাবান মিশিয়ে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। ভালো করে ধুয়ে সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিন — তারপর আবার লাগান। ভেজা অবস্থায় লাগালে শর্ট সার্কিট হতে পারে।

কিবোর্ড ব্যবহারে আরও দক্ষ হতে চান? এই লেখাটা কাজে আসবে: কিবোর্ড শর্টকাট – কাজ দ্রুত করার সহজ উপায়

পিসি (ডেস্কটপ) পরিষ্কার করার পদ্ধতি

পিসির ভেতরে ধুলা জমে যাওয়াটা অনেক বড় সমস্যা। বিশেষত বাংলাদেশের মতো ধুলাবালিময় পরিবেশে এটা আরও দ্রুত হয়।

কতদিন পরপর পরিষ্কার করবেন?

সাধারণভাবে ৩-৬ মাসে একবার পিসির ভেতর পরিষ্কার করা ভালো। আপনার পরিবেশ বেশি ধুলাময় হলে আরও ঘন ঘন করুন।

ভেতর পরিষ্কারের ধাপ

১. পিসি সম্পূর্ণ বন্ধ করুন এবং প্লাগ খুলুন বিদ্যুৎ সংযোগ না কাটলে কাজ করবেন না — এটা খুবই জরুরি।

২. কেসিং খুলুন সাধারণত একটা বা দুটো স্ক্রু খুললেই পাশের প্যানেল খুলে যায়।

৩. কম্প্রেসড এয়ার দিয়ে ধুলা পরিষ্কার করুন CPU ফ্যান, গ্রাফিক্স কার্ডের ফ্যান, পাওয়ার সাপ্লাই ফ্যান — সবখানে কম্প্রেসড এয়ার দিয়ে ধুলা বের করুন। বাইরে বা খোলা জায়গায় করলে ভালো, নাহলে ঘরের ভেতরে ধুলা ছড়িয়ে যাবে।

৪. RAM ও কার্ড স্লট মুছুন RAM খুলে স্লটে হাওয়া দিন। আঙুল দিয়ে RAM-এর গোল্ডেন অংশ ধরবেন না।

৫. ফ্যানের পাখা মুছুন ফ্যানের ব্লেডে যদি অনেক ময়লা জমে, তাহলে আস্তে আস্তে কাপড় দিয়ে মুছে দিন।

৬. সব লাগিয়ে পরীক্ষা করুন সব ঠিকঠাক লাগিয়ে পিসি চালু করুন। দেখবেন আগের চেয়ে একটু বেশি শান্তভাবে চলছে।

মনিটর ও মাউস পরিষ্কার

শুধু কিবোর্ড আর পিসি নয়, মনিটর এবং মাউসও নিয়মিত পরিষ্কার করা দরকার।

মনিটর: মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে আলতো করে মুছুন। অ্যালকোহল বা সাধারণ ক্লিনার ব্যবহার করবেন না — স্ক্রিনের কোটিং নষ্ট হয়ে যেতে পারে। শুধু পানিতে একটু ভেজা নরম কাপড়ই যথেষ্ট।

মাউস: নিচের দিকের অপটিক্যাল সেন্সরে ধুলা জমলে মাউস ঠিকমতো কাজ করে না। কটন বাড দিয়ে আলতো মুছে দিন। মাউসের বাইরের অংশ অ্যালকোহল দিয়ে মুছতে পারেন।

পিসি স্লো হয়ে গেলে শুধু পরিষ্কার করলেই হয় না, আরও কিছু করণীয় আছে। জানুন এখানে: কম্পিউটার স্লো হলে কী করবেন – ১০টি সহজ সমাধান

যে ভুলগুলো কখনো করবেন না

এই কাজগুলো করতে গিয়ে অনেকে ভুলে ভেতরে তরল ঢুকিয়ে ফেলেন বা অন্য সমস্যা তৈরি করেন। কিছু সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলুন:

  1. সরাসরি কিবোর্ড বা মনিটরে স্প্রে করবেন না
  2. পানি দিয়ে পিসির ভেতর মুছবেন না
  3. ভেজা অবস্থায় কিবোর্ড লাগাবেন না
  4. পিসি চালু রেখে ভেতরে হাত দেবেন না
  5. ভ্যাকুয়াম ক্লিনার সরাসরি মাদারবোর্ডের উপর ব্যবহার করবেন না — স্ট্যাটিক বিদ্যুৎ তৈরি হতে পারে

নিয়মিত পরিচর্যার একটা সহজ রুটিন

সময়কাজ
প্রতিদিনকিবোর্ড ও মাউস শুকনো কাপড়ে মুছুন
প্রতি সপ্তাহেমনিটর ও ডেস্ক পরিষ্কার করুন
প্রতি মাসেকিবোর্ড ডিপ ক্লিন করুন
প্রতি ৩-৬ মাসেপিসির কেসিং খুলে ভেতর পরিষ্কার করুন

এই ছোট্ট রুটিনটা মেনে চললে আপনার কম্পিউটার অনেক বছর ভালো থাকবে।

কম্পিউটারের সার্বিক যত্ন নিয়ে আরও বিস্তারিত পড়ুন: কম্পিউটারের যত্ন কীভাবে নেবেন

সচরাচর জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন ১: কতদিন পরপর কিবোর্ড পরিষ্কার করা উচিত?

মাসে একবার সাধারণ পরিষ্কার করুন। যদি প্রতিদিন অনেকক্ষণ ব্যবহার করেন বা কিবোর্ডের পাশে খাওয়াদাওয়া করেন, তাহলে সপ্তাহে একবার করলে ভালো।

প্রশ্ন ২: কিবোর্ডে পানি পড়লে কী করব?

সঙ্গে সঙ্গে প্লাগ খুলুন এবং উল্টো করে রাখুন যাতে পানি বেরিয়ে যায়। কমপক্ষে ২৪-৪৮ ঘণ্টা না শুকিয়ে চালু করবেন না।

প্রশ্ন ৩: আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল কোথায় পাব?

বাংলাদেশে ফার্মেসিতে বা ইলেকট্রনিক্সের দোকানে পাওয়া যায়। ৭০% বা ৯০% — দুটোই কিবোর্ড পরিষ্কারে ব্যবহার করা যায়।

প্রশ্ন ৪: পিসির ভেতর ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করা কি ঠিক?

সরাসরি মাদারবোর্ড বা কার্ডের উপর না করাই ভালো। স্ট্যাটিক ইলেকট্রিসিটি তৈরি হতে পারে যা হার্ডওয়্যার নষ্ট করতে পারে। কম্প্রেসড এয়ার বেশি নিরাপদ।

প্রশ্ন ৫: ল্যাপটপের কিবোর্ড কি একইভাবে পরিষ্কার করব?

প্রায় একইভাবে, তবে একটু বেশি সাবধানে। চাবি খোলা যাবে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। কম্প্রেসড এয়ার এবং কটন বাড দিয়ে সাবধানে পরিষ্কার করুন।

প্রশ্ন ৬: মেকানিক্যাল নাকি মেমব্রেন — কোনটা পরিষ্কার করা সহজ?

মেকানিক্যাল কিবোর্ড ডিপ ক্লিন করা সহজ, কারণ চাবি খোলা যায়। মেমব্রেন কিবোর্ডে সেই সুবিধা নেই, তাই বাইরের পরিষ্কারই বেশি কার্যকর।





মন্তব্য করুন

ব্লগ