অধ্যক্ষ
০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:১১ পূর্বাহ্ণ
আপনার রিজিক কি সত্যিই অন্য কারও হাতে?
আপনার রিজিক কি সত্যিই অন্য কারও হাতে?
জীবনের কোনো এক পর্যায়ে আমরা প্রায় সবাই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যখন মনে হয় আমাদের ভবিষ্যৎ যেন অন্য কারও হাতে। চাকরি হবে কি না, ব্যবসায় লাভ হবে কি না, কেউ সাহায্য করবে কি না, বেতন বাড়বে কি না, কোনো সুযোগ পাব কি না, কিংবা কারও সুপারিশ ছাড়া জীবনে এগোনো সম্ভব হবে কি না, এসব চিন্তা আমাদের ভেতরে ভয় তৈরি করে।
তখন আমরা অনেক সময় ভুলে যাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য: মানুষ চেষ্টা করতে পারে, সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু রিজিকের মালিক মানুষ নয়।
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, রিজিক আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। কুরআনে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই যার রিজিক আল্লাহর দায়িত্বে নেই। এই বিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে মানুষ বসে থাকবে আর কোনো চেষ্টা করবে না। বরং এর অর্থ হলো, চেষ্টা করার পর ফলাফল নিয়ে অযথা ভেঙে পড়ার প্রয়োজন নেই।
মানুষ কি আপনার রিজিক আটকে দিতে পারে?
অনেক সময় আমরা ভাবি, “আমার বস আমাকে পছন্দ করেন না, তাই আমার উন্নতি হবে না”, “অমুক ব্যক্তি আমাকে সুযোগ দিচ্ছে না, তাই আমার জীবন থেমে গেছে” অথবা “ওই মানুষটি পাশে না থাকলে আমি কিছুই করতে পারব না।”
এখানেই আমাদের চিন্তার একটি বড় ভুল হয়ে যায়।
কোনো ব্যক্তি আপনার চাকরি দিতে পারেন, কিন্তু তিনি আপনার রিজিকের মালিক নন। কেউ আপনার ব্যবসার অর্ডার দিতে পারেন, কিন্তু তিনি আপনার রিজিকের স্রষ্টা নন। কেউ আপনার জন্য একটি দরজা খুলে দিতে পারেন, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে আপনার জন্য কতটা কল্যাণ আসবে, তা তার হাতে নয়।
মানুষ মাধ্যম হতে পারে। রিজিকদাতা নয়।
এই পার্থক্যটি বুঝতে পারলে জীবনের অনেক ভয় কমে যায়।
তাহলে চেষ্টা করার প্রয়োজন কী?
কেউ কেউ রিজিকের ওপর বিশ্বাসের বিষয়টি ভুলভাবে বুঝে বলেন, “যেহেতু রিজিক আল্লাহর হাতে, তাই চেষ্টা করার দরকার নেই।”
এটি সঠিক ধারণা নয়।
একজন কৃষক জমিতে বীজ বপন করেন, পানি দেন, আগাছা পরিষ্কার করেন। কিন্তু বীজের ভেতর থেকে জীবন বের করে দেওয়ার ক্ষমতা তার হাতে নেই। তবুও তিনি নিজের দায়িত্বটুকু পালন করেন।
একইভাবে একজন মানুষ চাকরি খোঁজেন, দক্ষতা বাড়ান, ব্যবসা করেন, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, নতুন কিছু শেখেন এবং পরিশ্রম করেন। এগুলো তার দায়িত্ব। কিন্তু ফলাফল কখন, কীভাবে এবং কতটা আসবে, তা আল্লাহর হিকমতের বিষয়।
অর্থাৎ তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়; চেষ্টা করার পর আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
যে মানুষটি আজ আপনার পথ বন্ধ করছে
হয়তো কোনো ব্যক্তি আপনার সঙ্গে অন্যায় করেছে। হয়তো কেউ আপনার প্রাপ্য সুযোগটি নিয়ে নিয়েছে। হয়তো কোনো কর্মকর্তা আপনাকে পদোন্নতি দেননি। হয়তো কোনো আত্মীয় আপনাকে সাহায্য করেননি।
এসব ঘটনা কষ্ট দিতে পারে। কিন্তু মনে রাখুন, একটি বন্ধ দরজা মানেই সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।
কখনো কখনো আমরা একটি নির্দিষ্ট সুযোগকে আমাদের পুরো ভবিষ্যৎ মনে করি। অথচ আল্লাহ হয়তো এমন একটি পথের ব্যবস্থা করছেন, যার কথা আমরা এখনো জানি না।
জীবনে এমন অনেক ঘটনা আছে, যেগুলো ঘটার সময় আমরা কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু পরে বুঝেছি, সেটিই হয়তো আমাদের জন্য ভালো ছিল।
তাই কারও হাতে নিজের পুরো ভবিষ্যৎ তুলে দেবেন না।
মানুষের সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞ থাকুন, কিন্তু মানুষের ওপর এমনভাবে নির্ভর করবেন না যে সে সাহায্য না করলে আপনার বিশ্বাসই ভেঙে যায়।
রিজিক শুধু টাকা নয়
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। রিজিক বলতে আমরা অনেক সময় শুধু টাকা-পয়সাকে বুঝি। কিন্তু রিজিকের পরিধি অনেক বড়।
সুস্থতা রিজিক। শান্তি রিজিক। ভালো পরিবার রিজিক। সৎ বন্ধু রিজিক। জ্ঞান রিজিক। নিরাপদ জীবন রিজিক। সময় রিজিক। এমনকি এমন একটি সুযোগ, যা আপনাকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনে, সেটিও এক ধরনের রিজিক।
কখনো আপনার আয় কম হতে পারে, কিন্তু জীবনে শান্তি থাকতে পারে। আবার কারও আয় অনেক বেশি হলেও তার জীবনে অশান্তি থাকতে পারে।
তাই শুধু ব্যাংক ব্যালান্স দিয়ে নিজের রিজিকের পরিমাণ বিচার করা ঠিক নয়।
আপনার কাজ কী?
আপনার কাজ হলো হালাল পথে চেষ্টা করা, নিজের দক্ষতা বাড়ানো, সুযোগের দরজায় কড়া নাড়া, ভুল থেকে শেখা এবং অন্যায় পথে না যাওয়া।
আপনার কাজ হলো দোয়া করা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশ্রম করা।
আর যখন ফলাফল আপনার প্রত্যাশামতো আসে না, তখন নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া:
“আমি আমার দায়িত্ব পালন করব। ফলাফল আমার হাতে নয়।”
এই বিশ্বাস মানুষকে অলস নয়, বরং মানসিকভাবে শক্ত করে।
কারণ তখন ব্যর্থতা মানে জীবন শেষ নয়। একটি চাকরি না পাওয়া মানে রিজিক শেষ নয়। একটি ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া মানে ভবিষ্যৎ শেষ নয়। কারও প্রত্যাখ্যান মানে আপনার মূল্য কমে যাওয়া নয়।
হয়তো আপনার জন্য অন্য কোথাও, অন্য কোনো সময়ে, অন্য কোনো দরজা অপেক্ষা করছে।
শেষ কথা
আপনার জীবনে অনেক মানুষ আসবে। কেউ সাহায্য করবে, কেউ বাধা দেবে, কেউ উৎসাহ দেবে, আবার কেউ আপনাকে হতাশ করবে।
কিন্তু তাদের কাউকেই আপনার রিজিকের মালিক বানাবেন না।
মানুষকে সম্মান করুন, মানুষের সহযোগিতা গ্রহণ করুন, নিজের দায়িত্ব পালন করুন। কিন্তু অন্তরে বিশ্বাস রাখুন, রিজিকের চূড়ান্ত মালিক আল্লাহ।
তাই আগামীকাল নিয়ে অতিরিক্ত ভয় না করে আজকের দায়িত্বটুকু ঠিকভাবে পালন করুন। যা আপনার জন্য নির্ধারিত, তা আপনার কাছে পৌঁছাবেই। আর যা আপনার জন্য নয়, তা ধরে রাখার জন্য পৃথিবীর সব দরজায় কড়া নাড়লেও তা আপনার হবে না।
আপনার কাজ চেষ্টা করা।
আপনার কাজ হালাল পথে থাকা।
আপনার কাজ দোয়া করা।
আর আপনার হৃদয়ের শান্তি রাখুন সেই সত্তার ওপর, যিনি আপনার প্রয়োজন আপনার নিজের চেয়েও ভালো জানেন।
২
২ মন্তব্য