Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০৯ অপরাহ্ণ

শিক্ষকতার অবসর জীবন কেমন কাটবে

সিনিয়র সিটিজেনদের অবসর জীবন কাটে সাধারণত আজরাইল বা পরকাল কেমন কাটবে, এ আতংকে। আর শিশুরা তাদের শৈশব কাটাতে চায়, আনন্দময় পরিবেশে খেলাধুলা ও বিনোদনের মাঝে। নিষ্ঠুর অভিভাবক, সমাজ তথা রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রে তা করতে বাঁধা দেয়। পরিবারের আয় -রোজগারের প্রধান ব্যক্তি তার কর্মজীবনে চায় সকলের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য আয় বৃদ্ধি করতে। অবসর সময়ে বেশিরভাগেরই জীবনে নানা সংকট দানা বাঁধে। প্রবীণদের কেহ কেহ সাথীদের রেখে পরলোক গমন করেছেন। ব্যথিত হৃদয়ে তাদের সারা জীবনের সাথীদের চলে যাওয়ার এ কষ্ট মেনে নিতে হয়। প্রবীণেরা অনেকে চিকিৎসার অভাবে চলাফেরা করতে না পেরে স্বাভাবিক জীবনে অচল হয়ে দিন কাটাচ্ছে। কেহ কেহ পরকালের জন্য এবাদত বন্দেগি করে জীবন কাটাচ্ছে। আমি শিক্ষকতা ও শিক্ষক সংগঠন থেকে অবসর নিয়ে কিছুটা হলেও প্রাথমিক শিক্ষা তথা শিক্ষকদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।অবসর জীবন আল্লাহর খানিকটা ইবাদতের চেষ্টার পাশাপাশি শিশু শিক্ষা তথা শিক্ষকদের সমস্যা নিরসন কল্পে সরকার, দেশবাসী তথা শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকি। জাতীয় পত্রিকায়, বর্তমানে সর্বাধিক প্রচারিত শিক্ষা বিষয়ক দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পত্রিকা দৈনিক শিক্ষাডটকম ও আমাদের বার্তা পত্রিকায় কলাম লিখে থাকি। এর জন্য আমার যে যোগ্যতা সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে, তা হলো আমার দীর্ঘ সময়ে শিশু শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠন সাথে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা। এছাড়াও প্রতিনিয়ত মাসে ৪/৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে শিশু তথা শিক্ষকদের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হই। শিক্ষক, শিশু তথা অভিভাবকদের সাথে মতবিনিময় করে সমস্যা নিরসনের উপায় খুঁজে পত্রিকায় নিবন্ধ লিখে থাকি। আমাদের সময়ে অধিকাংশ শিক্ষক ছিল ম্যাট্রিক, এস.এস.সি, ইন্টারমিডিয়েট। সংখ্যায় খুবই কম সংখ্যক ছিল গ্র্যাজুয়েট। বর্তমানে অধিকাংশই অনার্স, মাস্টার্স। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখন উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষকের সমারোহ। অথচ রাষ্ট্রের কতিপয় নীতিনির্ধারণী, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদের মাঝে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সেকালের ভাবনা কাজ করে। তাদের মাঝে তৃণমূলের সাধারণ মানুষের শিক্ষার উন্নতি নিয়ে ভাবনা খুব কমই দৃশ্যমান হচ্ছে। তাদের ভাবনা শুধু নিজেদের সন্তানদের শিক্ষা নিয়ে। সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষার সম্প্রসারণ হোক, এ ভাবনা তাদের মধ্যে দৃশ্যমান নয়। তারা চায় না প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক থাকুক। পাশাপাশি গরীব মানুষের সন্তানরা ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষার অধিকার অর্জন করুক। শিক্ষার জন্য রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা নেই। এ সুরে তারা বাদ্য বাজায়। তারা প্রাথমিক শিক্ষকদের আজও সেকালের শিক্ষিত ভাবেন। তাদের মানসিকতায় এ বদ্ধমূল চিন্তা বিদ্যমান। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষকেরা বি এড, এম এড, সি ইন এড, ডিপ ইন এড প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। উচ্চ শিক্ষিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক হয়েও ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের সক্ষমতা তাদের নেই, এ ভাবনা কেন তাদের মধ্যে বিদ্যমান তা বোধগম্য নয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রায় সকলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। উচ্চ বিদ্যালয়ের খুব কম সংখ্যক শিক্ষক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

আমি বিদ্যালয়ের গমনের পাশাপাশি শিক্ষক সংগঠনগুলোর মিটিং গিয়ে বা পত্রিকা, বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের সমস্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে সমস্যা দূরীকরণের জন্য সরকার , দেশবাসী ও শিক্ষকদের সচেতন করে থাকি। আমি মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে, আমি কমর্রত শিক্ষক তথা সংগঠনের সাথে বর্তমানে যুক্ত নই। এ মনে না থাকা বা ভুলে যাওয়া প্রাথমিক শিক্ষার সাথে আমার হৃদয়ের বন্ধন দায়ী। এবারে আসা যাক শিশুদের অবসর সময় প্রসঙ্গে। শিশুর অবসর সময় নিরাপদে কাটে মাতৃগর্ভে। পৃথিবীর আলো দেখার পর থেকে তাদের ওপর শুরু হয় যন্ত্রনা। তাদের এই পৃথিবীতে অবসর কাটানো উচিত খেলা, কার্টুন দেখা, ঘুরে বেড়ানো, ছড়া গান শোনার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু এই এসময় যন্ত্রণাময় ক,খ,অ,আ,অ,ই,ঈ পড়া ও লিখার মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে হয়। খুব কম সংখ্যক অভিভাবক শিশুদের এ যন্ত্রনার কথা উপলব্ধি করে থাকেন। শিশুরা বয়স বৃদ্ধির সাথে পরিবেশ, প্রকৃতি থেকে জ্ঞান অর্জন করার পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ে প্রবেশ করবে, এটা হওয়া স্বাভাবিক। অথচ উল্টো পথে চলছে শিশুর শৈশবের অবসর জীবন।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা বিধান চন্দ রায় পোদ্দার একজন বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী। তিনি বুঝবেন অবসর সময় আনন্দের মাঝে সময় কাটাতে পারলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক হবে।

অন্যদিকে, প্রাথমিক শিক্ষকদের বিশেষ করে ডাক্তারদের মতো হাসপাতাল চাকরি করে, বাহিরে রোগী দেখে লাখ লাখ টাকা উপার্জন করার সুযোগ নেই। দীর্ঘ সময় শিশুদের হৈচৈ, চিল্লা-চিল্লি, অশান্ত পরিবেশে পাঠদান করার কারণে প্রাথমিক শিক্ষকদের অবসর সময়ে বাড়তি কাজ করার সামর্থ্য থাকেনা। এ অবস্থায় আর্থিক সংকটে নিদারুণ কষ্টের সম্মুখীন হতে হয় তাদের। এ সংকট থেকে তাদের মুক্ত করার ভাবনা থাকুক রাষ্ট্রের। সকলের অবসর জীবন হোক আনন্দের। ভরে যাক সুখ, শান্তিতে।

লেখক : 

মো. সিদ্দিকুর রহমান, দৈনিক শিক্ষাডটকম

 শিক্ষাবিদ।

মন্তব্য করুন

ব্লগ